
একবিংশ শতাব্দীর উত্তর-আধুনিক বিশ্বব্যবস্থা এখন আর কোনো একক পরাশক্তির ইশারা বা ‘ইউনিপোলার’ (Unipolar) বৃত্তে সীমাবদ্ধ নেই। বৈশ্বিক রাজনীতির এই কাঠামো এখন বহু-মেরুকেন্দ্রিক বা ‘মাল্টিপোলার’ (Multipolar) এক জটিল আবর্তে প্রবেশ করেছে। এই তীব্র মেরুকরণের যুগে ইউরেশিয়া থেকে ইন্দো-প্যাসিফিক তথা সামগ্রিক উপ-মহাদেশীয় অঞ্চলে আন্তর্জাতিক রাজনীতির চিরাচরিত সমীকরণ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এই সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান অর্থনৈতিক অনুঘটক বাংলাদেশ এবং এশিয়া ও ইউরোপের ভূকৌশলগত সংযোগস্থলে অবস্থিত মধ্যম সারির পরাশক্তি (Middle Power) তুরস্কের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক অক্ষটি প্রথাগত কূটনীতির খোলস ছেড়ে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ‘কৌশলগত অংশীদারত্বে’ (Strategic Partnership) রূপান্তরিত হয়েছে। দক্ষিণ এশীয় ভূরাজনীতি ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তা সমীকরণকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করতে এই দ্বিপাক্ষিক অক্ষটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
কাঠামোগত বাস্তববাদ ও বৈচিত্র্যময় ‘হেজিং’ কৌশলঃ
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের থিওরিটিক্যাল লেন্স থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ-তুরস্কের সমসাময়িক সম্পর্কটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি মূলত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তন এবং রাষ্ট্র দুটির জাতীয় স্বার্থের যৌক্তিক বহিঃপ্রকাশ।
ক্ষমতার ভারসাম্য (Balance of Power):
কেনেথ ওয়াল্টজের ‘নব্য-বাস্তববাদ’ বা কাঠামোগত বাস্তববাদ (Neo-realism) অনুযায়ী, রাষ্ট্রগুলো একক কোনো আঞ্চলিক বা বৈশ্বিক পরাশক্তির আধিপত্য ঠেকিয়ে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে নিজেদের নিরাপত্তা বলয় সুসংহত করার চেষ্টা করে। উপ-মহাদেশীয় পরিমণ্ডলে বিশাল প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের সামরিক আধিপত্য এবং বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে পরাশক্তিদের তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে নিজস্ব সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখা ঢাকার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ তার সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়নের জন্য ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ গ্রহণ করেছে। তুরস্কের মতো একটি উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিসম্পন্ন ও ন্যাটোভুক্ত রাষ্ট্রের সাথে সামরিক অংশীদারত্ব স্থাপন করে মূলত নিজস্ব ‘হার্ড পাওয়ার’ (Hard Power) বৃদ্ধি করা হচ্ছে, যা আঞ্চলিক রাজনীতিতে একটি স্থিতিশীল ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করবে।
হেজিং কৌশল (Hedging Strategy):
উন্নয়নশীল ও মধ্যম সারির রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে ‘হেজিং’ একটি অত্যন্ত কার্যকর রাজনৈতিক দর্শন। এখানে একটি রাষ্ট্র কোনো বৃহৎ শক্তির সঙ্গে সরাসরি দ্বন্দ্বে না গিয়ে বা কোনো একক পরাশক্তির জোটে পূর্ণভাবে যুক্ত না হয়ে, একাধিক বিকল্প শক্তির সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে নিজের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকি হ্রাস করে। বাংলাদেশ ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক কারণে বিভিন্ন আঞ্চলিক পরাশক্তির সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখলেও, একক কোনো শক্তির ওপর কৌশলগতভাবে সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হতে চায়না। আঙ্কারার সাথে ঢাকার প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক অক্ষ গড়ে তোলার সিদ্ধান্তটি মূলত একটি ক্লাসিক ‘হেজিং’ কৌশল। এর ফলে কোনো নির্দিষ্ট পরাশক্তির আকস্মিক নীতি পরিবর্তন বা ভূরাজনৈতিক চাপের মুখেও দেশের জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে না।
ঐতিহাসিক বিবর্তন ও কূটনৈতিক সম্পর্কের পুনর্গঠনঃ
ঢাকা ও আঙ্কারার সমসাময়িক কৌশলগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কের সুদৃঢ় ভিত্তিটি রাতারাতি গড়ে ওঠেনি। এর পেছনে রয়েছে এক শতাব্দীরও বেশি পুরনো গভীর ঐতিহাসিক এবং মনস্তাত্ত্বিক সংযোগ।
ঐতিহাসিক ধারা
১৯১৯-২৪: খিলাফত আন্দোলন ও আর্থিক সংহতি
১৯৭৪: ওআইসি শীর্ষ সম্মেলন ও কূটনৈতিক স্বীকৃতি
২০১২-১৬: অভ্যন্তরীণ বিচার কেন্দ্রিক শীতলতা
২০২৬: পূর্ণাঙ্গ কৌশলগত অংশীদারত্ব
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে অবিভক্ত বাংলায় পরিচালিত খিলাফত আন্দোলন (১৯১৯-১৯২৪) এবং তুরস্কের স্বাধীনতা যুদ্ধের (১৯১৯-১৯২৩) সময় ভৌগোলিক দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও এই দুই ভূখণ্ডের মানুষের মধ্যে প্রথম উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক সংহতি প্রকাশ পায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্যের পতন এবং ইউরোপীয় শক্তিগুলোর দ্বারা তুর্কি মূল ভূখণ্ড ব্যবচ্ছেদের খসড়া তৈরি হলে, তৎকালীন বাংলার মানুষ এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে পরিচালিত তুর্কি জাতীয়তাবাদী প্রতিরোধ যুদ্ধ তৎকালীন বাংলায় বিপুল উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছিল। বাঙালিরা নিজেদের সীমিত সামর্থ্যের মধ্য থেকেও অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার সংগ্রহ করে আঙ্কারার জাতীয়তাবাদী সরকারের তহবিলে পাঠিয়েছিল। এই ঐতিহাসিক অবদানের কথা আধুনিক তুরস্কের history-তেও কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করা হয়।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সময় তুরস্কের অবস্থান ছিল তৎকালীন ঠান্ডা যুদ্ধের (Cold War) জটিল ভূরাজনৈতিক সমীকরণ এবং আঞ্চলিক সামরিক জোটের (যেমন: CENTO ও RCD) বাধ্যবাধকতা দ্বারা চালিত। ফলে কৌশলগত কারণে আঙ্কারার অবস্থান তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের পক্ষে থাকলেও, বিজয়ের পর দ্রুতই এই নীতিতে বাস্তবসম্মত পরিবর্তন ঘটে। ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে लाहোরে অনুষ্ঠিত ওআইসি (OIC) শীর্ষ সম্মেলনের ঠিক পরপরই তুরস্ক স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করে। ১৯৯৭ সালে ডি-৮ (D-8) ফোরামের মাধ্যমে এই সম্পর্ক বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক রূপ লাভ করে।
২০১২ থেকে ২০১৬ সময়পর্বে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধাপরাধের বিচারকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কে তীব্র শীতলতা তৈরি হয় এবং আঙ্কারা কর্তৃক রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহারের মাধ্যমে তা নজিরবিহীন সংকটে পতিত হয়। তবে ২০১৬ সালের জুলাই মাসে তুরস্কে ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের সময় ঢাকা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে এরদোগানের গণতান্ত্রিক সরকারের প্রতি পূর্ণ diplomatic সমর্থন ও সংহতি প্রকাশ করে। এই ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আঙ্কারার ক্ষোভ প্রশমনে অত্যন্ত কার্যকরী অনুঘটক হিসেবে কাজ করে এবং তুরস্কের ‘এশিয়া অ্যানিউ’ (Asia Anew) নীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক নতুন অভূতপূর্ব অধ্যায়ের সূচনা হয়।
এই কূটনৈতিক পুনর্গঠনের সাম্প্রতিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরটি ঘটে ২০২৬ সালের ৪-৬ জুন, যখন তুরস্কের প্রভাবশালী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল নিয়ে ঢাকা সফর করেন। এই সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের ‘যৌথ অর্থনৈতিক কমিশন’ (JEC) এবং নিয়মিত ‘ফরেন অফিস কনসালটেশন’ (FOC) কাঠামোকে আরও বেগবান করার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, মানবিক কূটনীতি এবং আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জঃ
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান-এর ২০২৬ সালের জুনের সাম্প্রতিক ঢাকা সফরের সুদূরপ্রসারী ভূরাজনৈতিক প্রভাব সরাসরি প্রতিফলিত হচ্ছে দুই দেশের মধ্যকার অভূতপূর্ব সামরিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে। ন্যাটোভুক্ত দেশ হিসেবে তুর্কি সামরিক প্রযুক্তি অত্যন্ত উন্নত, অথচ আঙ্কারা পশ্চিমা দেশগুলোর মতো সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা কৌশলগত শর্তারোপ (Political Strings) করে না।
প্রতিরক্ষা ক্রয়ের পরিধিঃ
এই হার্ড পাওয়ার সহযোগিতার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ইতিপূর্বেই তুরস্কের কাছ থেকে সমসাময়িক যুদ্ধক্ষেত্রের গেম-চেঞ্জার হিসেবে পরিচিত ‘বায়রাক্তার টিবি-২’ (Bayraktar TB2) ড্রোন, ‘টিআরজি-৩০০ টাইগার’ (TRG-300 Tiger) মাল্টিপল লঞ্চ রকেট সিস্টেম, রাডার ব্যবস্থা, মাইন-প্রতিরোধী সাঁজোয়া যান এবং স্বল্পপাল্লার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয় করেছে। ২০২৬ সালের এই সাম্প্রতিক বৈঠকের পর প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পরিধি আরও বৃদ্ধি পেয়ে নৌ ও বিমান বাহিনীর আধুনিকায়নের দিকে প্রসারিত হচ্ছে, যা বেইজিং বা অন্যান্য প্রচলিত উৎসের ওপর ঢাকার একক সামরিক নির্ভরতা হ্রাস করছে।
প্রতিরক্ষা সামগ্রী ও কৌশলগত ভূমিকাঃ
প্রতিরক্ষা সামগ্রী (তুর্কি উৎস) | কৌশলগত ভূমিকা (বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী) |
বায়রাক্তার টিবি-২ ড্রোন | আকাশসীমা পর্যবেক্ষণ ও সুনির্দিষ্ট আক্রমণ সক্ষমতা বৃদ্ধি। |
টিআরজি-৩০০ টাইগার রকেট সিস্টেম | দূরপাল্লার আর্টিলারি প্রতিবন্ধকতা ও ভূকৌশলগত ভারসাম্য তৈরি। |
অत्याধুনিক রাডার ও সাঁজোয়া যান | উপকূলীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও স্থলবাহিনীর আধুনিকায়ন।
সামরিক সহযোগিতার পাশাপাশি সফট পাওয়ার (Soft Power) এবং মানবিক কূটনীতির ক্ষেত্রেও এই অংশীদারিত্বের গভীরতা স্পষ্ট হয় রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের ক্ষেত্রে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে—বিশেষ করে ওআইসি, জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের পক্ষে তুরস্কের লবিং ও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক-আর্থিক সমর্থনের প্রতিশ্রুতি বৈশ্বিক মেরুকরণের এই অস্থির সময়ে ঢাকার জন্য অত্যন্ত বড় একটি কূটনৈতিক ও কৌশলগত স্বস্তি।
তবে এই ক্রমবর্ধমান অক্ষটি কোনো শূন্যস্থানে সংঘটিত হচ্ছে না, বরং তা উপ-মহাদেশীয় অঞ্চলে সক্রিয় বৃহৎ পরাশক্তিগুলোর নিজস্ব ভূরাজনৈতিক রাডারে প্রতিনিয়ত পর্যালোচিত হচ্ছে:
আঞ্চলিক দৃষ্টিকোণ:
উপ-মহাদেশের প্রধান শক্তিগুলোর নীতি নির্ধারকেরা ঐতিহ্যগতভাবেই তাদের নিকটবর্তী প্রতিবেশি রাষ্ট্রসমূহে বহিরাগত কোনো শক্তির অতিরিক্ত সামরিক ও কৌশলগত প্রবেশকে সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করে। তবে তুরস্কের মূল ভূরাজনৈতিক ফোকাস মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরেশিকায় হওয়ায় এটি সরাসরি কোনো নিরাপত্তা হুমকি তৈরি না করলেও, আঙ্কারা-ইসলামাবাদ গভীর সামরিক সম্পর্কের কারণে ঢাকার এই অতি-ঘনিষ্ঠতা আঞ্চলিক থিঙ্ক-ট্যাঙ্কগুলোর কাছে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।
ওয়াশিংটনের সমীকরণ:
রাশিয়ার কাছ থেকে তুরস্কের ‘এস-৪০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয়ের পর থেকে আঙ্কারার ওপর ওয়াশিংটনের এক ধরনের কৌশলগত অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। এই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ যখন মার্কিন-বিরোধী অবস্থানে থাকা তুরস্কের কাছ থেকে অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় করে, তখন ওয়াশিংটন একে তাদের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের (IPS) অধীনে কিছুটা স্বাধীন বিচ্যুতি হিসেবে দেখতে পারে।
অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব ও ভবিষ্যতের ভূকৌশলগত গন্তব্যঃ
কৌশলগত সম্পর্কের সামরিক ও কূটনৈতিক ভিত্তি যতটাই শক্তিশালী হোক না কেন, তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করতে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক গভীরতা অপরিহার্য। বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যকে ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) মার্কিন ডলারে উন্নীত করার জন্য সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশই বেশ কিছু বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
> ভবিষ্যতের বড় সম্ভাবনা: এই সম্পর্কের মূল চালিকাশক্তি লুকিয়ে রয়েছে একটি ‘মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি’ (FTA) স্বাক্ষরের মধ্যে, যা নিয়ে দুই দেশের নীতি নির্ধারকদের মধ্যে আলোচনা চলছে। তবে তুরস্ক ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাস্টমস ইউনিয়নের (Customs Union) সদস্য হওয়ায় তাদের এককভাবে এফটিএ করার ক্ষেত্রে কিছু আইনি জটিলতা রয়েছে।
সমসাময়িক বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থায় এই অক্ষের স্থায়িত্ব নির্ভর করবে দুই দেশের যৌথ বিনিয়োগের ওপর। বাংলাদেশ তার বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে (SEZ) তুর্কি বিনিয়োগকারীদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছে, যা সফল হলে এই সম্পর্ক কেবল ক্রেতা-বিক্রেতার গণ্ডি থেকে বেরিয়ে একটি যৌথ উৎপাদনশীল অংশীদারিত্বে রূপ নেবে।
বৈশ্বিক মেরুকরণের এই জটিল ও অস্থির সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ ও তুরস্কের কৌশলগত অংশীদারিত্ব আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিবর্তিত গতিপ্রকৃতির একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই সম্পর্কটি কেবল অতীতের ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক সংহতির আবেগে চালিত নয়, বরং তা সমসাময়িক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি বাস্তবসম্মত অক্ষ (Pragmatic Axis)। ঐতিহাসিক টানাপোড়েন এবং পরাশক্তিদের প্রচ্ছন্ন ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও, ঢাকা ও আঙ্কারা যেভাবে প্রতিরক্ষা ও মানবিক কূটনীতিতে নিজেদের পরিপূরক হিসেবে প্রমাণ করেছে, তা উপ-মহাদেশীয় রাজনীতি ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা সমীকরণে একটি নতুন শক্তির ভারসাম্য তৈরি করেছে। বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার এই নতুন বিন্যাসে বাংলাদেশ-তুরস্কের এই মৈত্রী আগামী দিনে মাঝারি শক্তিগুলোর স্বাধীন কূটনীতি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার একটি অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে টিকে থাকবে।
লেখকঃ প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া ও আন্তার্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।
আজকালের কন্ঠ/আর বি
আপনার মতামত লিখুন :