কুয়াকাটায় সুখের আশায় গড়া আশ্রয়ন প্রকল্প এখন জেলেদের দুঃস্বপ্ন | Daily AjKaler Kontho

কুয়াকাটায় সুখের আশায় গড়া আশ্রয়ন প্রকল্প এখন জেলেদের দুঃস্বপ্ন


আজকালের কণ্ঠ প্রকাশের সময় : অগাস্ট ১৭, ২০২৫, ৬:৩৯ অপরাহ্ন
কুয়াকাটায় সুখের আশায় গড়া আশ্রয়ন প্রকল্প এখন জেলেদের দুঃস্বপ্ন

কুয়াকাটা (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি : কুয়াকাটার লতাচাপলী ইউনিয়নের পশ্চিম খাজুরা গোড়া খাল এলাকায় ২০০৫ সালে খাপড়াভাঙ্গা নদীর কোল ঘেঁষে জেলেদের জন্য গড়ে তোলা হয় একটি আশ্রয়ন প্রকল্প। ৮০ পরিবারের বসবাসের জন্য নির্মিত এ আশ্রয়ন প্রকল্পটি সময়ের পরিক্রমায় জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। সিডরের তাণ্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনো সংস্কার হয়নি। তদুপরি নদীভাঙনের কবলে পড়ে এখন পুরো প্রকল্পই বিলীন হওয়ার শঙ্কায় রয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ৮০ পরিবারের জন্য নির্মিত এই আশ্রয়ন প্রকল্পে বর্তমানে প্রায় ৩০০ মানুষ বসবাস করছে। ঘরগুলোর টিন মরিচায় ক্ষয়ে গেছে, বেড়া নেই বেশিরভাগ ঘরে। ভেতরে বসে আকাশ দেখা যায়। সামান্য বৃষ্টিতেই পানি ঢুকে পড়ে ঘরে। সুপেয় পানি নেই, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারের ব্যবস্থা নেই, নেই শিশুদের জন্য শিক্ষালয়ও। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করায় নারী ও শিশুরা প্রায়ই পানি বাহিত রোগসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

এদিকে, খাপড়াভাঙ্গা নদী দিয়ে দ্রুতগতির ট্রলার চলাচলের কারণে নদীতে তরঙ্গ সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে বড় বড় ঢেউ আছড়ে পড়ছে প্রকল্পের পাশে, এতে ভাঙন দ্রুততর হচ্ছে। যে কোনো সময় আশ্রয়ন প্রকল্পটি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে এখানকার বাসিন্দারা। ইতিমধ্যে নয়টি পরিবার অন্যত্র চলে গেছে। তবে বেশিরভাগ বাসিন্দার অন্য কোথাও যাওয়ার জায়গা না থাকায় তারা বাধ্য হয়ে জরাজীর্ণ ঘরেই মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

আশ্রয়ন প্রকল্পের বাসিন্দা জালাল হাওলাদার (৫৫) বলেন, “আমাদের ঘরে মানুষ তো দূরের কথা, গরু-ছাগলও থাকার মতো পরিবেশ নেই। গরু-ছাগলও এর চেয়ে ভালো জায়গায় রাখা হয়। বাধ্য হয়ে আমরা এখানে থাকছি।”

আরেক বাসিন্দা নুর ইসলাম (৪০) বলেন, “ঘরের টিন ক্ষয়ে গেছে। দরজা-জানালা নেই। সামান্য বৃষ্টিতেই ঘরে পানি পড়ে। আমরা প্রতিদিন আতঙ্কে বসবাস করছি, যে কোনো সময় নদীতে ভেসে যেতে পারি।”

আশ্রয়ন প্রকল্পের ১ নম্বর সিরিয়ালের ১ নম্বর ঘরের বাসিন্দা আবুল কালাম হাওলাদার (৪৩) বলেন, “সিডরের পর বহু সাংবাদিক, এনজিও প্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তা এসে আমাদের দুর্দশা দেখে গেছেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউ কোনো প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। এই আশ্রয়ন প্রকল্প আমাদের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

এ বিষয়ে কলাপাড়া উপজেলা ফিশিং ট্রলার মাঝি ও মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি রুহুল আমিন মাঝি বলেন, “স্থানীয় ট্রলারগুলো ধীরে চলে, কিন্তু দূর-দূরান্ত থেকে আসা ট্রলারগুলো দ্রুত চলায় নদী ভাঙন কমছে না।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিএনপি সরকারের আমলে আশ্রয়ন প্রকল্প নির্মাণ হলেও পরবর্তী সরকার ঘরগুলো সংস্কারে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ফলে দীর্ঘ ২০ বছরেও আশ্রয়নবাসীদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। এখন নদীভাঙনের আতঙ্কে প্রতিনিয়ত অনিশ্চিত জীবন কাটাচ্ছেন তারা।

অভিযোগ, অভাব-অনটনে জর্জরিত এসব জেলে পরিবার দু’বেলা খাবারের ব্যবস্থা করতেই হিমশিম খাচ্ছে। সেখানে ঘর মেরামতের খরচ বহন করা তাদের পক্ষে অসম্ভব। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ ছাড়া এ আশ্রয়ন প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অন্ধকার বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

লতাচাপলী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোঃ মিজানুর রহমান জানান, “আশ্রয়নবাসীরা বিষয়টি আমাদের অবহিত করেছেন। আমি দ্রুত সরেজমিনে গিয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবো। আশা করছি শিগগিরই ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. ইয়াসীন সাদেক বলেন, “বিষয়টি অবহিত হওয়ার পর জেলা প্রশাসকের সাথে আলোচনা করে ঘরগুলো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর সাথে বসে নদী ভাঙন রোধে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

 

আজকালের কন্ঠ/আর এস/মিজানুর