কখনো কোচিং করেননি বিসিএস প্রশাসনে প্রথম রুহুল | Daily AjKaler Kontho

কখনো কোচিং করেননি বিসিএস প্রশাসনে প্রথম রুহুল


আজকালের কণ্ঠ প্রকাশের সময় : জুলাই ৫, ২০২০, ১:৫৮ অপরাহ্ন
কখনো কোচিং করেননি বিসিএস প্রশাসনে প্রথম রুহুল

আজকালের কন্ঠ ডেস্ক : ৩০ জুন, মঙ্গলবার। রুহুল আমিন শরিফ তাঁর কর্মস্থল নোয়াখালীর হাতিয়া শাখা কৃষি ব্যাংকে বসে কাজ করছিলেন। এক সহকর্মী এসে জানালেন, বিসিএস পরীক্ষার ফল বেরিয়েছে। পরীক্ষার রোল তাঁর মনেই ছিল। তবু প্রবেশপত্র দেখতে দ্রুত বাসায় গেলেন রুহুল আমিন। ফিরে এসে ফল দেখতে লাগলেন। প্রথমে নিচের দিক থেকে দেখতে শুরু করলেন। কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিলেন না নিজের রোল। হঠাৎ ওপরের দিকে তাকাতেই দেখলেন, প্রশাসনের তালিকার একদম ওপরের রোলটা তাঁর। বুঝে গেলেন ৩৮তম বিসিএসের ফলাফলে প্রশাসন ক্যাডারে তিনিই প্রথম হয়েছেন।

পরীক্ষার ফল দেখার পর ধাতস্থ হতে একটু সময় নিয়েছিলেন। এরপর প্রথমেই রুহুল আমিনের মনে পড়ে বাবার কথা। ‘কারণ, উচ্চমাধ্যমিকের পর পড়াশোনায় কিছুটা খারাপ করায় বাবা আমার ওপর অভিমান করেছিলেন। তখন বাবা বলেছিলেন, কোনো কিছুতে কখনো যদি দেশসেরা হয়ে দেখাতে পারো, তাহলে অভিমান যাবে। তাই সব থেকে খুশির এই সংবাদটি প্রথমেই বাবাকে জানাই।

বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য কখনো কোচিং করেননি রুহুল আমিন। কিন্তু আত্মবিশ্বাস ছিল। ৩৮তম বিসিএসের ফল প্রকাশের পর দেখা গেল, প্রত্যাশা ছাপিয়ে তিনিই প্রথম।রুহুল আমিন নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার বিশনন্দী ইউনিয়নের দয়াকান্দা গ্রামের ছেলে। বাবা ৩০ বছর ধরে তাঁতে বোনা কাপড়ের ব্যবসা করতেন। বছর খানেক আগে সেই ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। এখন তিনি নিজের কৃষিজমি দেখাশোনা করেন। মা রেহেনা আক্তার গৃহিণী।

বিসিএসের প্রস্তুতির কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি শুধু দুটি চাকরির কথা ভেবেছি। একটি বিসিএস, আরেকটি ব্যাংক। এর বাইরে চাকরির পরীক্ষা দিইনি।’ তবে প্রচলিত নিয়মে বিসিএসের পড়া পড়েননি রুহুল আমিন। বললেন, ‘সবাইকে দেখেছি বিসিএসের জন্য কোচিং করতে। নিয়মিত নোট করে প্রস্তুতি নিতে। আমি এগুলোর কোনোটিই করিনি।’

৩৮তম বিসিএসই তাঁর প্রথম বিসিএস। এই বিসিএস দেওয়ার আগে তিনি বিগত ১০ বছরের প্রশ্ন দেখে পরীক্ষা সম্পর্কে ধারণা নিয়েছেন। ছাত্র অবস্থায় টিউশনি করতেন। এই টিউশনি তাঁর সবচেয়ে বেশি কাজে লেগেছে। তাঁর ভাষায়, ‘বিসিএসের সিলেবাস দেখে মনে হলো যেসব বিষয়ে আমি টিউশনি করাতাম, সেসব বিষয়ের অনেক কিছুই আছে বিসিএসের সিলেবাসে। এসব পড়তে অনেকে কোচিংয়ে যায়। কিন্তু আমি নিজেই এগুলো টিউশনিতে ছাত্রদের পড়াতাম।’

রুহুল আমিন জানালেন, কয়েকজন সহপাঠীকে দেখেছেন বিসিএস পরীক্ষা নিয়ে ঘাবড়ে যেতে। তাঁর বেলায় এমনটা হয়নি। তাঁর সব সময় মনে হতো ঠিকমতো পরীক্ষা দিলে বিসিএসে প্রত্যাশিত ফল পাবেন তিনি।

৩৮তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা দেওয়ার পরপরই লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন রুহুল আমিন। বিগত সালের লিখিত পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, সাধারণ বিজ্ঞান আর ইংরেজিতে বেশির ভাগ প্রার্থী ভালো করতে পারেন না। কিন্তু এ দুই বিষয়ে ভালো দখল ছিল তাঁর। মৌখিক পরীক্ষা দিতে গিয়েও বেশ আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। তিনি বলছিলেন, ভাইভা বোর্ডে প্রথম দুটি প্রশ্নের উত্তর ভালো দেওয়ায় বোর্ডের সদস্যরা বেশ সন্তুষ্ট ছিলেন। পুরো পর্বটি খুব স্বাচ্ছন্দ্যে কেটে গেছে। তাঁর মনে হয়েছে, তিনি ভালো ফলই পাবেন।

বিসিএসের ক্যাডার পছন্দক্রম হিসেবে তাঁর প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পছন্দ ছিল যথাক্রমে প্রশাসন, পুলিশ ও পররাষ্ট্র। আত্মবিশ্বাস ছিল, যেকোনো একটি ক্যাডার পাবেন। পেয়েছেন প্রথমটিই।

ছোট থেকেই লেখাপড়ায় ভালো

২০০২ সালে ২৮ নম্বর দয়াকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিকে ও ২০০৫ সালে শম্ভুপুরা উচ্চবিদ্যালয় থেকে অষ্টম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পান। ২০০৮ সালে মাধ্যমিকে জিপিএ–৫ পাওয়ার পর ভর্তি হন ঢাকা কলেজে। সেখান থেকে ২০১০ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। পরে তিনি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনিস্টিটিউট বাংলাদেশের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান এএমআইই (অ্যাসোসিয়েট মেম্বারশিপ অব ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স) থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর পাস করেন।

শিক্ষকতা রুহুল আমিনকে বেশ টানে। আর তাই সময় পেলেই স্বেচ্ছাশ্রম হিসেবে শম্ভুপুরা উচ্চবিদ্যালয়ে বিজ্ঞান, গণিত ও ইংরেজি শেখাতেন শিক্ষার্থীদের। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ইংরেজি, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত ও জীববিজ্ঞান বিষয়ে পড়াতেন। গরিব শিক্ষার্থীদের পড়াতেন বিনা মূল্যে।

বিজ্ঞানশিক্ষার প্রতি দারুণ আগ্রহ রুহুল আমিনের। প্রতিবছর নিজের গ্রামের বিভিন্ন স্কুলে বিজ্ঞান প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন। এতে প্রতি স্কুল থেকে পাঁচজন করে শিক্ষার্থী অংশ নেয়। ১০০ নম্বরের এমসিকিউ পরীক্ষায় যে ভালো করে, তাকে দেওয়া হয় পুরস্কার। আরও একটি কাজ করে আনন্দ পান রুহুল আমিন। মাঝেমধ্যেই গরিব শিশুদের এক বেলা পেট ভরে খাওয়ান তিনি।

পড়াশোনার বাইরে খেলাধুলা করতে পছন্দ করেন রুহুল আমিন। এ ছাড়া উপস্থিত বক্তৃতা, রচনা ও সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতায় বিভাগীয় পর্যায়ে তিনি নিয়মিত অংশ নিতেন।

মা–বাবা দারুণ খুশি

দুই ভাই ও তিন বোনের পরিবারে রুহুল সবার বড়। তাঁর স্ত্রী মারিয়া ইসরাত শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি অর্থনীতিতে পড়ছেন।ছেলে বিসিএস পরীক্ষায় প্রথম হওয়ায় দারুণ খুশি বাবা ছিদ্দিকুর রহমান। ‘একসময় ছেলের ওপর অভিমান করেছিলাম। কারণ, স্কুল–কলেজে ভালো ফলাফলের ধারাবাহিকতা সেভাবে রাখতে পারেনি। কিন্তু বিসিএসে প্রথম হওয়ার পর অভিমান কেটে গেছে। এখন সৎভাবে দেশের সেবা করুক, তাহলেই আরও বেশি খুশি হব।’মা রেহেনা আক্তার বলেন, ‘ছেলে দেশের সেরা হয়েছে, এতে আমি অনেক খুশি হয়েছি। পাড়া–প্রতিবেশী সবাই আমার ছেলের সুনাম করছে। আমার আর কিছু চাওয়ার নেই।’রুহুল আমিনের এক বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। এক বোন এবার এসএসসি পাস করেছে। আরেক বোন দশম শ্রেণিতে পড়ছে। সবার ছোট ভাই পড়ছে চতুর্থ শ্রেণিতে।

৩৮তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় অংশ নিতে ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৪৬৮ জন আবেদন করেছিলেন। লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন ১৪ হাজার ৫৪৬ জন। লিখিত পরীক্ষায় পাস করেন ৯ হাজার ৮৬২ জন। এই ফলাফলে ২ হাজার ২০৪ জনকে নিয়োগের সুপারিশ করেছে সরকারি কর্ম কমিশন।

আজকালের কন্ঠ/এম