নানা অপরাধে প্রতি বছর গড়ে প্রায় দুই হাজার পুলিশ সদস্যের চাকরি যাচ্ছে। চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টা, অপহরণ, খুন, ছিনতাই, নির্যাতন, ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া, যৌন হয়রানিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় পুলিশ সদস্যদের চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে। অনেককে নানা লঘুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে।
প্রায় সোয়া দুই লাখ সদস্য নিয়ে পুলিশ বাহিনী গঠিত। এর মধ্যে প্রতি বছর গড়ে ২৫ হাজার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ আসে। তদন্ত শেষে অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অপরাধের ধরণ বুঝেই নির্ধারিত হয় সাজা। পুলিশ সদর দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গুটিকয়েক জনের কারণে পুরো পুলিশ বাহিনীর সুনাম ক্ষুণ্ণ হতে দেওয়া হবে না। পুলিশ সদস্যরা অপরাধ করলে শাস্তি পেতেই হবে। এক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে-বিদেশে পুলিশের অনেক ভাল কাজ রয়েছে। করোনা সঙ্কট মোকাবেলায় পুলিশের বৈচিত্র্যময় মানবিক ভূমিকাকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, শ্রেণি, পেশা, লিঙ্গ, সংস্কৃতি ইত্যাদি বিবেচনায় না নিয়ে নিরপেক্ষভাবে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা জনমুখী দায়িত্ব পালন করে। করোনার সময়ে সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে লড়াই করছে দেশের পুলিশ বাহিনী। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ও বিভিন্ন নিরাপত্তা কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি নাগরিকদের পাশে থেকে মানবিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে এ বাহিনীর সদস্যরা। ত্রাণসামগ্রী বিতরণ, অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া, করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির পরিবার ও প্রতিবেশীর সুরক্ষায় কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করা, এমনকি মারা যাওয়া ব্যক্তির লাশ দাফনও করছে পুলিশ। দরিদ্র ও অসহায় মধ্যবিত্তের ঘরে খাবারও পৌঁছে দিচ্ছে পুলিশ। মানবিকতার হাত বাড়িয়ে এ ধরনের কাজ করায় পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা দেশের মানুষের প্রশংসাও কুড়িয়েছেন।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে প্রথম রাজারবাগে আক্রমণ হয়। রাইফেল নিয়ে রুখে দাঁড়ায় পুলিশ। লাইব্রেরিয়ান যে পুলিশ অবকাঠামো সেটা বাংলাদেশ পুলিশের পরিকল্পনায় গঠিত। এজন্য জাতিসংঘের প্রশংসাও পেয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। এত সুনাম অর্জন হলেও দেশের কিছু পুলিশ সদস্য নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। নিয়োগ-বদলি নিয়ে পুলিশে কিছু সমস্যাও আছে। বিভাগীয় রেঞ্জের প্রধান হলেন একজন ডিআইজি। জেলায় থাকেন পুলিশ সুপার। ডিআইজি ও পুলিশ সুপাররা যদি সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন তাহলে দেশের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। কিন্তু কোন কোন এসপি মনিটরিং করেন না। তারা থানা থেকে ‘প্যাকেট’ পাওয়ার আশায় বসে থাকেন। আবার কিছু আছে দলবাজ। বিভিন্ন রাজনৈতিক মতের লোকও আছেন পুলিশে। আবার যখন যে দল ক্ষমতায় আসে, সেই দলের লেজুড়বৃত্তি করে অপরাধে জড়িয়ে পড়েন এক শ্রেণির পুলিশ সদস্য। পুলিশ পারে না এমন কোন কাজ নেই। কিন্তু কিছু সংখ্যক পুলিশের কারণে দোষ পড়ে বিশাল এই প্রতিষ্ঠানের ওপর।
সম্প্রতি চিত্রনায়িকা পরীমনিকে নিয়ে নিজ বাসায় অবস্থান করার অভিযোগে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) গুলশান বিভাগের এডিসি গোলাম মোহাম্মদ সাকলায়েনকে ডিবি থেকে সরিয়ে মিরপুরের পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্টে (পিওএম) সংযুক্ত দেওয়া হয়েছে। স্বামীর নির্যাতনের শিকার হয়ে সরকারি জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করেছিলেন রাজশাহী নগরীর এক গৃহবধূ। কিন্তু বিচারপ্রার্থী গৃহবধূকে উল্টো যৌন নির্যাতন করেছেন পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা। ঘটনাটি ঘটেছে গত রবিবার দুপুরে নগরীর বোসপাড়া পুলিশ ফাঁড়িতে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) মো. শামীমকে সোমবার প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফেনীতে বুধবার স্বর্ণ ডাকাতির মামলার আসামি ডিবির ওসি সাইফুল ইসলাম ভূঁঞা ও তার সহযোগী পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তাকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
পুলিশের আলোচিত অপরাধের মধ্যে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের ঘুষ কেলেঙ্কারি, টাঙ্গাইলে প্রতিবাদী জনতার ওপর পুলিশের নির্বিচারে গুলি, চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীকে ফাঁসানোর চেষ্টা উল্লেখযোগ্য। এছাড়া চট্টগ্রাম, যশোর ও খিলগাঁওসহ বিভিন্ন স্থানে চোরাচালানির স্বর্ণ উদ্ধারে গিয়ে নিজেরাই স্বর্ণ আত্মসাৎ করেছে। ইয়াবা ও মানবপাচারসহ নানা অপরাধে এক শ্রেণির পুলিশ সদস্য জড়িয়ে পড়েছে।
প্রসঙ্গত, পিআরবি-১৮৬১ (পুলিশ প্রবিধান) অনুযায়ী, কোনও পুলিশ সদস্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ালে তার বিরুদ্ধে দুই ধরনের বিভাগীয় শাস্তির (লঘু ও গুরু) বিধান আছে। গুরুদণ্ডের আওতায় চাকরি থেকে বরখাস্ত, পদাবনতি, পদোন্নতি স্থগিত, বেতন বৃদ্ধি স্থগিত ও বিভাগীয় মামলা হয়। মামলায় অপরাধ প্রমাণিত হলে বরখাস্ত করা হয়। গুরুদণ্ডের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ আছে। আর ছোট অনিয়ম বা অপরাধের জন্য দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার, অপারেশনাল ইউনিট থেকে পুলিশ লাইনস বা রেঞ্জে সংযুক্ত করে লঘুদণ্ড দেওয়ার বিধান আছে।
আপনার মতামত লিখুন :