ছাউনি নেই, সেলুন নেই—রোদ-বৃষ্টিই যাদের কর্মস্থল | Daily AjKaler Kontho

ছাউনি নেই, সেলুন নেই—রোদ-বৃষ্টিই যাদের কর্মস্থল


ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) প্রতিনিধি প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬, ৬:৪২ অপরাহ্ন
ছাউনি নেই, সেলুন নেই—রোদ-বৃষ্টিই যাদের কর্মস্থল

মাথার ওপর নেই কোনো ছাউনি, নেই সেলুনের ঝকঝকে আয়না-চেয়ার। নেই বিদ্যুৎ, নেই আধুনিক সরঞ্জামের আয়োজন। আছে শুধু কাঁচি, চিরুনি, ক্ষুর আর জীবিকার তাগিদ। কখনো প্রখর রোদ, কখনো বৃষ্টি—সবকিছুকে সঙ্গী করেই খোলা আকাশের নিচে চলছে কয়েকজন নরসুন্দরের কর্মজীবন।

একজনের চুল-দাড়ি কাটছেন, পাশে বসে আছেন আরেকজন—পরবর্তী খদ্দেরের অপেক্ষায়। দূর থেকে দৃশ্যটি সাধারণ মনে হলেও কাছে গেলে বোঝা যায়, এর পেছনে রয়েছে বংশপরম্পরায় একটি পেশাকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প।

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার ১ নম্বর বুলাকিপুর ইউনিয়নের বলোগাড়ি বাজারে প্রতি শনিবার ও বুধবার এবং রাণীগঞ্জ বাজারে প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার দেখা মেলে এমনই চিত্রের। সরেজমিনে দেখা যায়, বাজারের পথের ধারে অল্প কিছু সরঞ্জাম নিয়ে বসে চুল ও দাড়ি কাটার কাজ করছেন কয়েকজন নরসুন্দর।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সেখানে চুল কাটার জন্য নেওয়া হয় ২০ টাকা এবং দাড়ি সেভ করতে নেওয়া হয় ১০ টাকা। স্বল্প আয়ের এই কাজ থেকেই কোনোভাবে চলে তাদের সংসার।

তবে তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা—একটি নির্দিষ্ট ও নিরাপদ কর্মস্থলের অভাব। দীর্ঘদিন ধরে খোলা আকাশের নিচেই কাজ করতে হচ্ছে তাদের। রোদ তাদের মাথার ওপর, আর বৃষ্টি নামলে সেটিও হয়ে ওঠে কাজের বাধা।

বিশেষ করে বৃষ্টির দিনে দুর্ভোগ বেড়ে যায় কয়েকগুণ। মাথার ওপর ছাউনি না থাকায় কখনো বৃষ্টিতে ভিজেই কাজ চালিয়ে যেতে হয়, আবার কখনো বৃষ্টি শুরু হলে কাজ বন্ধ রাখতে হয়। এতে একদিকে যেমন শারীরিক কষ্ট বাড়ে, অন্যদিকে কমে যায় দিনের আয়।

নরসুন্দর পান কৃষ্ণ শীল বলেন, তাদের পূর্বপুরুষরাও নরসুন্দর পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বংশপরম্পরায় তারাও একই পেশা ধরে রেখেছেন। এই কাজ করেই সংসারের খরচ চালাতে হয়। কিন্তু সময় বদলালেও তাদের কর্মপরিবেশের তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি।

তিনি বলেন, তারা কারও অনুগ্রহ চান না। কাজ করার জন্য শুধু একটি নিরাপদ ও উপযুক্ত জায়গা চান, যেখানে রোদ-বৃষ্টির হাত থেকে কিছুটা সুরক্ষা নিয়ে মানুষের সেবা দিতে পারবেন।

স্থানীয় এক মুরুব্বি বলেন, বলোগাড়ি ও রাণীগঞ্জ বাজারে এসব নরসুন্দরের জন্য ছোট একটি নির্দিষ্ট জায়গা ও ছাউনির ব্যবস্থা করা হলে তাদের দুর্ভোগ অনেকটাই কমে যাবে। পাশাপাশি বাজারের মানুষও সহজে তাদের কাছ থেকে সেবা নিতে পারবেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, যুগের পর যুগ মানুষের চুল-দাড়ি কাটার মতো প্রয়োজনীয় সেবা দিয়ে আসছেন এসব নরসুন্দর। অথচ আজও তাদের কর্মস্থল খোলা আকাশের নিচে—বিষয়টি সত্যিই দুঃখজনক। তাদের জন্য একটি ছোট্ট নিরাপদ কর্মস্থল তৈরি করা খুব বড় কোনো দাবি নয়।

সচেতন মহল মনে করছে, স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিলে বাজারের সুবিধাজনক স্থানে এসব নরসুন্দরের জন্য একটি নির্দিষ্ট কর্মস্থল ও ছাউনি তৈরি করা সম্ভব। এতে একদিকে যেমন তাদের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ কমবে, অন্যদিকে বংশপরম্পরায় চলে আসা এই পেশাটিও পাবে কিছুটা স্বীকৃতি ও নিরাপত্তা।

এক টুকরো ছাউনি হয়তো খুব বড় কোনো স্থাপনা নয়। কিন্তু সেই ছাউনির নিচেই হয়তো একটু স্বস্তিতে বসতে পারবেন তারা—যারা বছরের পর বছর মানুষের চুল-দাড়ি কাটতে কাটতে নিজেদের জীবনটাকেই রোদ-বৃষ্টির হাতে সঁপে দিয়েছেন।

আজকালের কন্ঠ/আর বি