
ঢাকার ধামরাইয়ে ৭০ লাখ টাকা পাওনা নিয়ে ব্যবসায়িক বিরোধের জেরে আরফান মিয়াকে আওয়ামী লীগের নেতা ও ৫ আগস্টের ছাত্র হত্যা মামলার আসামি সাজিয়ে হয়রানি করার অভিযোগ উঠেছে শরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে।
আরফান মিয়ার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা, ছাত্র হত্যায় জড়িত থাকা এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকার দাবি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দেওয়া হয়। তবে অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশের তদন্তে এসব দাবির কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আরফান মিয়ার আওয়ামী লীগের কোনো পদে থাকার, ছাত্র হত্যায় জড়িত থাকার কিংবা তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকার প্রমাণ মেলেনি। এমনকি অভিযোগের সঙ্গে দেওয়া আওয়ামী লীগের কমিটির তালিকাটিও যাচাই করে জাল বলে প্রমাণিত হয়েছে। তদন্তে উঠে আসে, মূল তালিকায় থাকা এক ব্যক্তির নাম মুছে সেখানে আরফান মিয়ার নাম বসানো হয়েছিল।
ভুক্তভোগী আরফান মিয়া ধামরাই পৌরসভার মলয়ঘাট এলাকার চান মিয়ার ছেলে। শরিফুল ইসলাম একই এলাকার হাবিবুর রহমান হবির ছেলে। তিনি ধামরাই পৌর ছাত্রদল সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও ঢাকা জেলা ছাত্রদলের সাবেক সদস্য।
আরফান মিয়া ও শরিফুল ইসলামের মধ্যে দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক। ব্যবসায়িক লেনদেনের সূত্রে শরিফুল ইসলামের কাছে আরফান মিয়ার পাওনা ছিল ৭০ লাখ টাকা। টাকা পরিশোধের জন্য শরিফুল ইসলাম কমার্স ব্যাংকের ৪০ লাখ ও ৩০ লাখ টাকার দুটি চেক দেন। চেক দুটি ব্যাংকে জমা দেওয়ার পর ডিজঅনার হয়।এর মধ্যে ৪০ লাখ টাকার চেক ডিজঅনারের ঘটনায় ২০১৯ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার একটি আদালতে মামলা করেন আরফান মিয়া। ওই মামলায় ২০২৫ সালের ২ জুন রায় হয়। রায়ে টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে ২১ আগস্ট ২০ লাখ টাকা পরিশোধ করেন শরিফুল ইসলাম।
এর মধ্যে ২০২৫ সালের ২০ আগস্ট উত্তরা পশ্চিম থানায় কামরুজ্জামান রিপনের করা একটি মামলায় আরফান মিয়াকে ৩৬৯ নম্বর আসামি করা হয়।এরপর ১৭ নভেম্বর উত্তরা পশ্চিম থানার ওই মামলার কথা বলে আরফান মিয়াকে ধামরাই থানায় ডেকে নেয় পুলিশ। থানায় গেলে তাঁকে মামলার বিষয়ে জানানো হয়।আরফান মিয়া পুলিশকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেখাতে বললে কোনো পরোয়ানা দেখানো হয়নি বলে তাঁর দাবি।
তার অভিযোগ, তাকে আটক করে ছেড়ে দেওয়ার জন্য পুলিশ ৫ লাখ টাকা দাবি করে। টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় তাঁকে ধামরাই থানার একটি নাশকতা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। যদিও ধামরাই থানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ওই অর্থ দাবির অভিযোগ অস্বীকার করেন।ওই মামলায় দুই মাস ১০ দিন কারাগারে থাকার পর জামিনে মুক্তি পান তিনি।বাদীরাও বললেন, গ্রেপ্তার ঠিক হয়নি
আরফান মিয়া বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের রাজনীতি বা ছাত্র হত্যায় জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ তদন্তে পাওয়া যায়নি। থানার রেকর্ডেও কোনো ওয়ারেন্ট ছিল না। এরপরও আমাকে একটি মামলায় গ্রেপ্তার করা হলো। মূলত চেকের মামলার টাকা না দেওয়ার কৌশল হিসেবেই আমাকে হয়রানি ও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”
এদিকে শরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ধর্ষণচেষ্টা, সরকারি জমি দখল এবং বিভিন্নভাবে হয়রানির আরও কয়েকটি অভিযোগ রয়েছে। চলতি বছরের ২১ এপ্রিল ধর্ষণচেষ্টা, চুরি ও হত্যা চেষ্টার মামলায়, যার মামলা নম্বর ১০৮/২০২৫, তিনি গ্রেপ্তার হন। মামলার এজাহারে এক অন্তঃসত্ত্বা নারীকে মারধর এবং পেটে লাথি দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। এতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে গর্ভের সন্তান মারা যায় বলেও এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
এছাড়া ২০২৫ সালের নভেম্বরে শরীফুলের বিরুদ্ধে ধামরাই পৌরসভার মলয়ঘাট এলাকায় সরকারি জলাশয় দখল ও বালু দিয়ে ভরাটের অভিযোগ ওঠে এবং ধামরাইয়ের মলয়ঘাট এলাকায় সরকারি জমির প্রায় ৯ শতক দখল করে বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগও রয়েছে শরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে। জমিটির সঙ্গে ভিপি কেস নং-৩৮/৮১, এসএ খতিয়ান নং-৩৪১, এসএ দাগ নং-৫২১, আরএস খতিয়ান নং-৪১ এবং আরএস দাগ নং-৪০৮, সাং ডি/১৩৪-এর তথ্য রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বাংলা ১৪২০ সাল থেকে ১৪৩৩ সাল পর্যন্ত ওই জমির লিজও নবায়ন করা হয়নি এবং
সরকারি নথি অনুযায়ী, ২০১৩ সালে ওই স্থানে একতলা সেমিপাকা ঘর নির্মাণের জন্য সীমিত অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।শরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে শ্রমিক দল নেতা সাইফুল ইসলাম টিটো ও তাঁর পরিবারসহ আরও কয়েকজনকে ভুয়া মামলা এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে অভিযোগ দিয়ে হয়রানি করার অভিযোগও রয়েছে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের ভুয়া কমিটির প্যাড তৈরি করে এসব অভিযোগ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শরিফুল ইসলাম। তিনি বলেন, আরফানের হয়রানির বিচার না পেয়ে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করেছিলেন। পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে তাঁর দেওয়া তথ্য যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
এ বিষয়ে ঢাকা জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তাঁরা অবগত হয়েছেন। ধামরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত জেনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আজকালের কন্ঠ/আর এস
আপনার মতামত লিখুন :