কালীগঞ্জে আধুনিকতার ছোয়ায় তাল ও খেজুর গাছে ঝুলছে বাবুই পাখির বাসা | Daily AjKaler Kontho

কালীগঞ্জে আধুনিকতার ছোয়ায় তাল ও খেজুর গাছে ঝুলছে বাবুই পাখির বাসা


মোঃ সোহাগ আলী, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি: প্রকাশের সময় : অগাস্ট ১৬, ২০২৬, ৩:৫৯ অপরাহ্ন
কালীগঞ্জে আধুনিকতার ছোয়ায় তাল ও খেজুর গাছে ঝুলছে বাবুই পাখির বাসা

প্রকৃতির কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে বৈচিত্য রক্ষার মাধ্যমে স্থায়িত্বশীল পৃথিবী গড়া সম্ভব। বৈচিত্যের রক্ষার মাধ্যমেই আমরা সকলে ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারি। প্রতিটি প্রান বৈচিত্য কোননা কোন উপকারে আসে।বৈচিত্য নির্ভর গ্রামের দিকে তাকালেই দেখা যায় তাল গাছ। তাল গাছ বাবুই পাখির খুবই পছন্দ, কারণ হিসাবে মুশফিকুর রহমান বলেন,বাবুই পাখি তাল গাছের পাতায় সহজে বাসা বাধতে পারে।

তালের পাতা শক্ত হওয়ায় সুন্দর ভাবে বাসা বানায়, বাতাসে হেলে দুলে ও বৃষ্টিতে ভিজে বাসা মাটিতে সহজে মাটিতে পড়ে না। বাবুই পাখি তাল গাছে বাসা তৈরি করেছে খেজুর পাতা, নারিকেল পাতা দিয়ে। গাছ থেকে সুন্দর করে পাতা ছিড়ে নিয়ে নিখুতভাবে বাবুই পাখি বাসা তৈরি করে। বাসা দেখতে অপূর্ব সুন্দর ও ঝড়, বৃষ্টিতে টিকে থাকার মত শক্ত। এত সুন্দর বাসা বাবুই পাখিই বানাতে পারে, অন্য কারো দ্বারা কখনও সম্ভব নয়।

বাবুই পাখির বাসা অধিকাংশই এক তালা ও দুই তালা করে তৈরি করে, বাচ্চাসহ বাস করে থাকে। পুরুষ বাবুই পাখি থাকার বাসা আলাদা ভাবে তৈরি করে। বাবুই পাখি ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা ফুটিয়ে থাকে। প্রতিটি বাবুই পাখির বাসায় ও বাচ্চাকে রাত্রের আধারে দেখার জন্য জোনাকি পোকার মিটি মিটি আলো ব্যবহার করে থাকে। বাবুই পাখি আলোর জন্য বাসার এক কোনায় কাঁদা মাটি (এটেল মাটি) এনে রাখে। বাবুই পাখি জোনাকি পোকা ধরে বাসার কাঁদা মাটিতে বসিয়ে রাখে। কাঁদা মাটিতে জোনাকি পোকা এমনভাবে রাখে যেন না যেতে পারে। বাবুই পাখির বাসায় রাত্রের আধারে বাচ্চাকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য জোনাকির খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

চমৎকার বুনটের ঝুড়ির মতো বাসা তৈরির জন্য পাখিটি সুপরিচিত। এজন্য বাবুই পাখিকে অনেকে তাঁতি পাখি বলে। ঝুলন্ত বাসার প্রবেশের সৃড়ঙ্গপথ বেশ আঁকাবাঁকা। বাংলাদেশে আছে তিন প্রজাতির বাবুই পাখি বাবুই/বাওই প্রজননরঋতু ছাড়া অন্য সময় পুরুষ ও স্ত্রী পাখির কালো কালো দাগসহ পিঠ হয় তামাটে বর্ণের, নিচের দিকে দাগ নেই, শুধুই তামাটে। ঠোঁট পুরু, মোচাকার, লেজ চৌকা, প্রজনন ঋতুতে পুরুষ পাখির পিঠ হয় গাড় বাদামি। হলুদ বুকের উপরের দিক ফ্যাকাশে।

দেশের সর্বত্র বিস্তৃত।প্রজনন ঋতুতে পুরুষ পাখির মাথার চাঁদি উজ্জ্বল সোনালি-হলুদ, গলা সাদা এবং তা একটি কালো ডোরা দ্বারা নিচের তামাটে-সাদা রঙের অংশ থেকে পৃথক। অন্য সময় স্ত্রী ও পুরুষ পাখির চাঁদি পিঠের পালকের মতোই বাদামি।বুকের কালো ডোরা ততটা স্পষ্ট নয় ও প্রকট ভ্রæরেখা, কানের পেছনে একটি ফোঁটা।এরা দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বিস্তৃত। বুক তামাটে, তাতে স্পষ্ট দাগ। ঝিনাইদহ কালীগঞ্জ উপজেলার কোলা ইউনিয়নের কামালহাট গ্রামের জনপদে সারিবদ্ধ তালগাছের পাতায় পাতায় দোল খাচ্ছে বাবুই পাখির বাসা।

কাজী এমদাদ বলেন, বর্তমানে হাতেগোনা কিছু এলাকায় দু-একটি বাসা চোখে পড়লেও তা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। আধুনিকায়নের নামে নির্বিচারে তালগাছ ও উঁচু গাছ কেটে ফেলার কারণে এই পাখিরা তাদের আদিম আবাসস্থল হারাচ্ছে।পরিবেশবিদদের মতে, বাবুই পাখি বিলুপ্ত হওয়ার পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে। গ্রামাঞ্চলে বড় বড় তালগাছ, নারিকেল গাছ ও খেজুর গাছ আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়া।জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে পাখিদের প্রধান খাদ্য শস্যকণা ও ছোট পতঙ্গ বিষাক্ত হয়ে পড়ছে।অসময়ে ঝড় ও অতিবৃষ্টির ফলে অনেক সময় বাসা তৈরির আগেই তা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। কিছু অসাধু মানুষের পাখি শিকার এবং শিশুদের দ্বারা বাসা ভেঙে ফেলা অন্যতম কারণ।

কালীগঞ্জের জনপদ থেকে একটি পাখির হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি প্রজাতির বিলুপ্তি নয়, বরং আমাদের শৈশব, লোকজ সংস্কৃতি আর গ্রামীন ঐতিহ্যের একটি অংশ মুছে যাওয়া। প্রকৃতির এই ভারসাম্য রক্ষা করতে হলে তালগাছ রোপণের বিকল্প নেই।এখনও যদি আমরা সচেতন না হই, তবে অদূর ভবিষ্যতে নতুন প্রজন্মের কাছে বাবুই পাখি আর তার নিপুণ শৈলী কেবল পাঠ্যবইয়ের ছবি হয়েই থাকবে। কালীগঞ্জে আকাশে আবার ফিরে আসুক সেই ডানা মেলা গান আর তালগাছের পাতায় দোল খাক আগামীর সুন্দর আগাম বাত এই প্রসঙ্গে সোনিয়া রহমান বলেন,বাবুই পাখি আলো-বাতাসে সমন্বয়ে থাকে।

বাসায় রাতে জোনাকি পোকার আলোতে থাকে, দেখতে খুব সুন্দর দেখা যায়। বাবুই পাখির বাসা এমনভাবে তৈরি করে যত পরিমানে বৃষ্টিই হোকনা কেন বাসার ভিতরে পানি আসবে না ও বাতাসে ছিড়ে পড়বে না। এমন ঘন করে খেজুর পাতা, নারিকেল পাতা ও বন দিয়ে বাসা তৈরি করার ফলে দিনের বেলায় বাসার ভিতরে অন্ধকার থাকে। ফলে বাবুই পাখি জোনাকি পোকার আলো ব্যবহার করে। সোনিয়া রহমান আর ও বলেন,বাবুই পাখি তাল গাছে বাসা বাধে চৈত্র মাসে।এই বাসায় শ্রাবন মাস পর্যন্ত থেকে বাচ্চা তুলে চলে যাই।এলাকার অনেকেই বাবুই পাখির বাসা দেখে ছবি তুলে নিয়ে যাচ্ছে। অনেকেই বলছেন বর্তমানে বাবুই পাখির বাসা চোখে মেলে না তাই সখ করে ছবি তুলে নিয়ে যাচ্ছি।

এরা দল বেঁধে বসবাস করতে বেশি পছন্দ করে।বাবুই পাখি সাধারণত বিভিন্ন ধরনের ধান, বীজ, পোকা, ঘাস, ছোট উদ্ভিদের পাতা, ফুলের মধু-রেণু ইত্যাদি খেয়ে জীবনধারন করে। গ্রীষ্মকালে এদের প্রজনন ঋতু। তারা সাধারণত কাটা জাতীয় তাল, খেজুর ও বাবলা গাছে বাসা তৈরি করে। বাসা তৈরি ও খাবার সংগ্রহে সুবিধা হয় এমন দেখে স্থান নির্বাচন করে বাবুই।বাবুই পাখির বাসাটা খুবই শিল্প কারুকাজে সমৃদ্ধ বাসা। বাবুই পাখিকে শিল্পী পাখিও বলা হয়। বাসস্থান ও নিরাপত্তার অভাবে শিল্পী পাখিটা দিন দিন উজাড় হয়ে যাচ্ছে। তাল ও খেজুর গাছ গুলো কেটে যেভাবে উজাড় করা হচ্ছে তাতে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই বাবুই পাখি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার ঝুকি রয়েছে। এই প্রজাতির পাখিকে সংরক্ষণের খুবই দরকার।

আজকালের কন্ঠ/আর এস