
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শাহরিয়ার খান আনাস ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শহীদ হন। আজ তার মৃত্যুর ৭২৯ তম দিন। তার পিতা শাহরিয়ার খান পলাশ সাংবাদিকদের দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সন্তান হারানোর প্রায় দুই বছরের সব তিক্ত অনুভুতি ও যন্ত্রণার কথা জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার (৩ আগস্ট) বেলা সাড়ে ১১টায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ আনাস হলে জুলাই শহীদ শাহরিয়ার খান আনাস কর্তৃক তার ‘মাকে উদ্দেশ্য করে লেখা’ চিঠির স্মৃতিফলক উন্মোচন শেষে সাংবাদিকদের দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমন অনুভূতির প্রকাশ করেন শহীদ আনাসের পিতা শাহরিয়ার খান পলাশ।
এসময় তিনি বলেন, আনাসকে নিয়ে যখন কথা বলতে যাই, তখন অনেকের সাথেই কথা বলতে হয়। বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে আমাদের খুবই কষ্ট হয়। আনাস ছোটবেলা থেকেই আমাদের খুব আদর্শবান একজন সন্তান ছিল। আমাদের ইচ্ছা ছিল ওকে মাদরাসায় পড়াবো, কোরআনের হাফেজ বানাবো। এক-দেড় বছর পর্যন্ত ওকে মাদরাসায় পড়ানো হয়, কিন্তু এরপর সে আর সেখানে থাকতে চায়নি। পরে ওকে স্কুলে ভর্তি করাই। প্রাইমারি শেষ করার পর ওর ইচ্ছা ছিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বে, বুয়েটে ভর্তি হবে। কিন্তু ওর সেই স্বপ্ন আজ স্বপ্নই রয়ে গেল। আজ কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছি। এখানে আনাসের নামে একটি স্থাপনার নামকরণ করা হয়েছে। আনাসের নামে আজ যে নামকরণ করা হলো—কিন্তু আনাস কেন বের হয়েছিল এই ২৪-এর কোটা সংস্কার আন্দোলনে? তার মূল উদ্দেশ্য কী ছিল?
আনাসদের স্বপ্ন ছিল একটি ইনসাফভিত্তিক বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার। আগামী ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য, তাদের অদেখা ভাই-বোনদের জন্যই তারা ঘর থেকে বের হয়েছিল।
এখন এই বাংলাদেশটা তাদের হাতে, আজ তারাই আনাসদের স্বপ্নগুলো বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু দুই বছর হতে চলল, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার থাকা অবস্থায়ও বিচারের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি আমরা দেখতে পাইনি। যাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদেরকে তিন বছরের মতো নামমাত্র সাজা দেওয়া হয়েছে; আর যারা পালিয়ে গেছে, তাদেরকে দেওয়া হয়েছে মৃত্যুদণ্ড। আমি বর্তমান সরকারের কাছে আহ্বান জানাবো, বর্তমান সরকারে যারা আছেন, তারা সবাই মজলুম এবং এই খুনি হাসিনার অত্যাচারের শিকার। আপনারা আনাসদের স্বপ্নের বাংলাদেশ বিনির্মাণ করুন এবং সুন্দরভাবে দেশটাকে পরিচালনা করুন। এটাই আপনাদের কাছে আমার কাম্য।
এসময় তিনি আরো বলেন, এ দেশে আর কেউ যেন ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠতে না পারে। আমরা আর কোনো অভ্যুত্থান দেখতে চাই না, আর কারো রক্ত ঝরুক সেটাও আমরা চাই না। কারণ, একটি সন্তান হারানোর যে যন্ত্রণা, তা শুধু একজন বাবা-মা-ই জানেন। আজ আনাসকে ছাড়া আমাদের ৭২৯ দিন পার হচ্ছে। ২৪ সালের ৫ আগস্টের কথা অনেকেই হয়তো জানেন। আনাসকে ছাড়া এই সুদীর্ঘ সময় আমাদের ভেতরে যে হাহাকার ও যন্ত্রণা চলছে, পৃথিবীর কোনো কিছুই আমাদের এই যন্ত্রণাকে লাঘব করতে পারবে না। আনাসের পাশাপাশি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে শহীদ সব সন্তানের জন্য সবার কাছে দোয়া চাই। তাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ আপনাদেরই বিনির্মাণ করতে হবে।
সেই সাথে আমাদের ওসমান হাদি ভাই, যিনি ইনসাফের জন্য লড়ে গেছেন, তাকেও ওরা শহীদ করে দিয়েছে। আজ ১৯ বার তার হত্যার তদন্ত পেছাল। বর্তমান সরকারের কাছে আমার আহ্বান, অতি দ্রুত ওসমান হাদি ভাইয়ের বিচারের কাজ সম্পন্ন করা হোক এবং খুনি ফয়সালকে ভারত থেকে ফিরিয়ে এনে এর সাথে জড়িত আর কারা কারা আছে, তা সুনিশ্চিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হোক।
এ সময় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে ফলক উন্মোচন করেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান। শহীদ আনাসের পরিবারের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন শহীদ আনাসের পিতা, নানা ও শিক্ষক। এছাড়াও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড.মো. এমতাজ হোসেন, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. ইদ্রিস আলী, প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহিনুজ্জামান এবং ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ওবায়দুল ইসলাম।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দশম শ্রেণির ছাত্র শাহরিয়ার খান আনাস তাঁর মাকে একটি চিঠি লিখে সকালে রাজধানীর গেণ্ডারিয়ার ভাড়া বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। রাজধানীর চাঁনখারপুলে পুলিশের গুলিতে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
আজকালের কন্ঠ/আর বি
আপনার মতামত লিখুন :