
পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার সদর ইউনিয়নের কায়না গ্রামের বজলু হাওলাদারকে দেখলে প্রথমেই চোখে পড়ে তাঁর মাত্র তিন ফুট উচ্চতা। বয়স ৫৫ ছুঁলেও জীবনের প্রতিটি দিনই তাঁর কাছে যুদ্ধের মতো। দারিদ্র্য, অবহেলা আর শারীরিক অক্ষমতা—এই তিনের ভার তিনি ছোট শরীরে বহন করে চলেছেন দীর্ঘদিন ধরে।
শৈশব থেকেই অপমানের সঙ্গী জন্মগতভাবে খাটো গড়নের হওয়ায় শৈশব থেকেই কটূক্তি আর ব্যঙ্গ–বিদ্রুপ ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। সহপাঠীদের উপহাস সহ্য করতে না পেরে অল্প বয়সেই স্কুল ছেড়ে দিতে হয় তাকে। বড় হতে হতে সমাজের চোখে ‘অযোগ্য’ এক মানুষে পরিণত হন তিনি। কোনো বাড়িতে কাজ চাইতে গেলে প্রায়ই শুনতে হয়—“এত ছোট মানুষ কি কাজ করতে পারবে?”
কিন্তু বাস্তবতা অন্য। ব্যক্তিগত সংগ্রাম তাঁকে পরিশ্রমী করে তুলেছে ঠিকই, কিন্তু সুযোগের দরজা খুলে দেয়নি কেউই।চিকিৎসার অভাবে বাড়ছে কষ্ট উচ্চতা কম থাকার কারণে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে শারীরিক ব্যথা, হাঁটাচলায় কষ্ট আর অস্বস্তি। নিয়মিত চিকিৎসার প্রয়োজন থাকলেও দৈনন্দিন খাবার জোটাতে হিমশিম খাওয়া বজলুর পক্ষে চিকিৎসা তো দূরের কথা, সাধারণ ব্যথার ওষুধ কেনাটাই বিলাসিতা।
বজলু বলেন, “ডাক্তারের কাছে যাবো কী দিয়ে? ওষুধের টাকাই তো হাতে থাকে না।” সমাজের অবহেলাই সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা জীবনের কঠিন লড়াইয়ের চেয়েও বড় দুর্ভো মানুষের আচরণ—এটাই তাঁর দাবি। রাস্তায় বের হলেই অনেকেই তাকায় অস্বস্তিকর দৃষ্টিতে। কেউ উপহাস করে, কেউ মজা নেয়। অনেকেই তাঁকে মানুষ হিসেবেও বিবেচনা করতে চায় না।
বজলুর কথায়, “মানুষের অবহেলাই আমাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়।” অদম্য মনোবলের মানুষ বজলু অবহেলা আর অভাবের মাঝেও থেমে থাকেননি বজলু। নিজের ছোট্ট টং দোকানটিকে আঁকড়ে ধরে জীবন চালিয়ে নিচ্ছেন কোনো মতে। তাঁর ইচ্ছা—সমাজ একদিন তাঁকে ‘ছোট মানুষ’ নয়, একজন ‘মানুষ’ হিসেবে দেখবে। কাজের সুযোগ পেলে আরও ভালোভাবে দাঁড়িয়ে যেতে পারবেন—এই আশাই বুকে লালন করেন তিনি।
মানবিক সহায়তার অপেক্ষায় বজলু হাওলাদারের জীবনযুদ্ধ এখনো চলমান। সামান্য সহায়তা, মানুষিকতা আর সামাজিক দায়িত্ববোধ—এই তিনটি জিনিসই বদলে দিতে পারে তাঁর বাস্তবতা। সমাজ এগিয়ে এলে নতুন করে বাঁচার শক্তি পেতে পারেন এই প্রান্তিক মানুষটি।কায়না গ্রামের এই খাটো গড়নের মানুষ—মানুষের ভালোবাসা আর সহায়তার অপেক্ষায় আজও তাকিয়ে আছেন।
আজকালের কন্ঠ/ আর এস/এ
আপনার মতামত লিখুন :