ধর্মের লেবাস ও নৈতিকতার অবক্ষয়: যখন বিশ্বাসই হয় শোষণের অস্ত্র | Daily AjKaler Kontho

ধর্মের লেবাস ও নৈতিকতার অবক্ষয়: যখন বিশ্বাসই হয় শোষণের অস্ত্র


মোঃ লুৎফর রহমান প্রকাশের সময় : অগাস্ট ৫, ২০২২, ১১:০৩ পূর্বাহ্ন
ধর্মের লেবাস ও নৈতিকতার অবক্ষয়: যখন বিশ্বাসই হয় শোষণের অস্ত্র

আমাদের সমাজে ধর্ম হলো মানুষের সবচেয়ে পবিত্র আবেগের জায়গা। কিন্তু সেই পবিত্র আবেগকে যখন একদল মানুষ নিজেদের হীন স্বার্থে ‘লেবাস’ হিসেবে ব্যবহার করে, তখন তা কেবল ধর্মের অপমান নয়, বরং মানবতার বিরুদ্ধে এক চরম অপরাধ। ইদানীং হেফাজতে ইসলামের মতো কট্টরপন্থী গোষ্ঠীর কিছু নেতার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ধর্মের আড়ালে কতটা ভয়ংকর অনৈতিকতা লুকিয়ে থাকতে পারে।

সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, এই কট্টরপন্থীরা ধর্মকে মানুষের মুক্তির পথ না বানিয়ে বানিয়েছে শোষণের হাতিয়ার। তাদের কাছে ‘ইসলাম’ যেন কেবল অন্যদের শাসন করার একটি লাইসেন্স। অভিযোগ রয়েছে, যখন কোনো নারী তাদের অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি হন না, তখনই তারা তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রটি বের করেন, ‘ইসলাম বিরোধী’ তকমা। যে নারী তাদের লালসার শিকার হতে অস্বীকার করেন, তাকে মুহূর্তের মধ্যে ‘ধর্মদ্রোহী’ বা ‘বেপর্দা’ বানিয়ে সামাজিকভাবে একঘরে করে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়।

চিন্তা করে দেখুন, এটি কতটা নিষ্ঠুর! একজন মানুষ তার ব্যক্তিগত সম্মান রক্ষা করতে গিয়ে উল্টো ধর্মীয়ভাবে লাঞ্ছিত হচ্ছেন। এই যে পবিত্র ধর্মকে নিজেদের নোংরা লালসা চরিতার্থ করার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা, এটি কি ধর্ম অবমাননা নয়? যারা দিনের আলোতে নীতি-নৈতিকতার ওয়াজ করেন, রাতের অন্ধকারে বা নিভৃতে তারাই যখন ক্ষমতার দাপটে কোনো নারীকে শারীরিক বা মানসিকভাবে নির্যাতন করেন, তখন বুঝে নিতে হবে তাদের কাছে ধর্ম কেবল একটি বাইরের পোশাক, ভেতরে লুকিয়ে আছে এক একজন সুযোগ সন্ধানী অপরাধী।

এই কট্টরপন্থীরা সাধারণ মানুষের মনে এমন এক ভয়ের রাজত্ব কায়েম করেছে যে, নির্যাতনের শিকার হয়েও অনেকে মুখ খোলার সাহস পান না। তারা ভয় পান, পাছে তাদের ওপর ‘ধর্ম অবমাননার’ তকমা দিয়ে দেওয়া হয়। এই সুযোগটাই নেয় সেই সব ভণ্ডরা। তারা জানে, মানুষকে ধর্মের ভয় দেখিয়ে বন্দি করে রাখা সবচেয়ে সহজ। ফলে অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হলে শারীরিক নির্যাতন কিংবা মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়া তাদের কাছে এক ধরনের ‘অধিকার’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমাদের বুঝতে হবে, দাড়ি, টুপি বা জুব্বা পরা মানেই কেউ পরম ধার্মিক হয়ে যায় না। প্রকৃত ইসলাম শিখিয়েছে নারীর সম্মান রক্ষা করতে, শিখিয়েছে ক্ষমতার অপব্যবহার না করতে। অথচ এই কট্টরপন্থীরা ইসলামের সেই মহান শিক্ষাকে জলাঞ্জলি দিয়ে নিজেদের পকেট আর কামনার পূজা করছে। তাদের কাছে নারী মানেই কেবল ভোগের বস্তু কিংবা চার দেয়ালে বন্দি কোনো দাসী।

সময় এসেছে এই ‘ধর্মীয় মুখোশধারী’দের চেনার। ধর্মের লেবাস পরে যারা নারীকে হয়রানি করে, যারা অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হলে ইসলামের দোহাই দিয়ে জীবন অতিষ্ঠ করে তোলে, তারা আর যাই হোক ধর্মের বন্ধু নয়। তারা সমাজের ক্যান্সার।

বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি যদি চলতে থাকে, তবে সাধারণ মানুষ ধর্মের ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলবে। তাই প্রতিটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা জরুরি। ধর্ম কোনো শোষণের অস্ত্র হতে পারে না; বরং ধর্মের নামে যারা নির্যাতন চালায়, তাদের কঠোরতম শাস্তির আওতায় আনাই হোক আজকের সময়ের দাবি। অশুভ এই অপশক্তির হাত থেকে আমাদের সমাজ ও ধর্মকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের সবার।