মিলন বিশ্বাস , সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : তার কাছে টাকা কোন ব্যাপার না। কয়েক কোটি টাকা ব্যায় করে শপিং ভ্যালি ফুড প্রোডাক্ট নামের প্রতিষ্টান করেছে সাতক্ষীরার তালা সদরের আটারই গ্রামে। একই প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত সম্পৃক্ততা রেখে গড়ে তুলেছেন চায়ের ব্যবসা, ঘি ব্যবসা, ঘের ব্যবসাসহ অজানা নানাবিধ ব্যবসা।
তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো অর্থের যোগানদাতা কখনো এই এলাকায় আসেননি। কিংবা এখানে তার আত্মীয়-স্বজন কেউ নেই। তবে কিভাবে কোটি টাকা এখানে ইনভেস্ট করছেন তিনি? এমন প্রশ্নও সকলের। কেউ কেউ বলছেন তিনি কালোটাকা সাদা করতেই টাকা ইনভেস্ট করছেন।
এদিকে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে নতুন এক তথ্য। এই সমস্ত ব্যবসার সামগ্রিক টাকা আসে মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব থেকে। সৌদি আরবে অবস্থানরত সবুজ নামের একজন বাংলাদেশী শ্রমিক সমস্ত অর্থের যোগান দেয়। হুন্ডি ব্যবসা, স্বর্ণের বার পাচারসহ অবৈধ নানাবিধ কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে সৌদি প্রবাসী এই যুবকের বিরুদ্ধে। সৌদি প্রবাসী সবুজ হোসেনের গ্রামের বাড়ি ঢাকার বিক্রমপুর।
সাতক্ষীরার তালা সদরের কয়েক ডজন মানুষের সাথে মোবাইল ফোনে পরিচয় রয়েছে প্রবাসী এই যুবকের। রহস্যের বিষয় এই এলাকায় এতগুলো ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করলেও সৌদি প্রবাসী এই যুবকের চেহারা দেখেনি কেউ। ইমু’র মাধ্যমে যোগাযোগ করেন তার সমস্ত কর্মচারীদের সাথে। যদি কেউ কখনো ভিডিও কল করে সেক্ষেত্রে সৌদি প্রবাসী ওই যুবক তার মোবাইলের পেছনের ক্যামেরা ওপেন করে কথা বলেন। এই অঞ্চল জুড়ে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুললেও নিজের চেহারা কেন দেখাতে চায় না এ নিয়ে নানা গুঞ্জন উঠেছে।
অনুসন্ধানে যানা যায়, দুই বছর আগে সাতক্ষীরার তালায় কয়েক কোটি টাকা ইসভেস্ট করে একটি ঘের করেন ওই প্রবাসী । এরপর ধারাবাহিকভাবে ওই এলাকায় বিভিন্ন মাধ্যমে মানুষের সাথে পরিচয় গড়ে উঠে সৌদি প্রবাসী সবুজের। এরপর বিভিন্ন মানুষকে নানান ধরনের সুযোগ সুবিধার কথা বলে সম্পর্ক ভালো করতে থাকেন। শুরু করেন চায়ের ব্যবসা। তালা উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চলে জুড়ে শপিং ভ্যালি টি নামে চায়ের ব্যবসার বিস্তার ঘটে। চায়ের ব্যবসা বছরখানেক চলার পরে এবার নতুন ব্যবসায় মোড় ঘুরিয়েছেন সৌদি প্রবাসী যুবক। তালা সদরের আটারই গ্রামে কয়েক বিঘা জমির উপর কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তুলেছেন শপিং ভ্যালি ফুড প্রোডাক্ট নামের একটি সেমাই ও নুডলুসের প্রতিষ্টান।
গত মাসের (২৬ ফেব্রুয়ারি) জাকজমকপূর্ণ পরিবেশে গরু ও ছাগল জবাই করে শপিং ভ্যালি ফুড প্রোডাক্ট কারখানাটির উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট এলাকার জনপ্রতিনিধি দলীয় নেতাকর্মী ও সরকারি কর্মকর্তাদের উপস্থিতি দেখিয়ে এলাকায় জনসাধারণকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে।
সরোজমিন গিয়ে দেখা গেছে, সাতক্ষীরার তালা সদরের আটারই গ্রাম। এখানকার মানুষের অধিকাংশ সকলে কৃষি নির্ভর। জমিতে ফসল চাষ করা, গবাদি পশু পালন করা ও গাভী ব্যবসা এখানকার মানুষের মূল পেশা। এই অঞ্চলের মধ্য আটারই নামক স্থানে কয়েক বিঘা জমির উপর কয়েক কোটি টাকা ব্যয় গড়ে তুলেছেন একটি সেমাই কারখানা। এই কারখানার সার্বিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে রয়েছেন জহর হাসান সাগর নামে এক ব্যক্তি। লোক মারফতে সৌদি প্রবাসী সবুজের চায়ের ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ততা হয় জহর হাসানের। এরপর জহর হাসানের সাথে ক্রমান্বয়ে পরিচয় হয় সৌদি প্রবাসী সবুজের। দীর্ঘদিন ইমুতে যোগাযোগ হয় তাদের।
যোগাযোগের একটি পর্যায় ওই এলাকায় একটি সেমাই কারখানা ও নুডুলসের কারখানা করার প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাব অনুযায়ী জহর হাসান সাগর সার্বিক দায়িত্ব নিয়ে কার্যক্রম শুরু করেন। মধ্যপ্রাচ্য থেকে কখনো বিকাশে কখনো লোক মারফতে কিংবা কখনো অন্য কোন পন্থায় টাকা আসতে শুরু করে জহর হাসান সাগরের কাছে।
তাড়াহুড়া করে মাসখানেকের মধ্যেই খাড়া করেন একটি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে সেমাই তৈরি চলমান রয়েছে। কর্মচারীদের মাধ্যমে সাতক্ষীরা জেলা, খুলনা জেলা ও যশোর জেলার বিভিন্ন বাজারে সাপ্লাই হচ্ছে শপিং ভ্যালি লাচ্চা সেমাই। সেমাইয়ের প্যাকেটের গায়ে বি এস টি আই এর লোগো সম্বলিত একটি নিবন্ধন নাম্বার রয়েছে। বিএসটিআই কর্মকর্তা বলছেন শপিং ভ্যালী ফুড প্রোডাক্ট নামে এখনো কোনো নিবন্ধন দেয়নি তারা।
বিএসটিআই খুলনা বিভাগীয় অফিসের সহকারি পরিচালক গোবিন্দ কুমার ঘোষ জানান, তারা নিবন্ধনের জন্য একটি আবেদন দিয়েছে। বিষয়টি বিচার-বিশ্লেষণ করে তাদের খাদ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তারপরে নিবন্ধন দেওয়া হবে। এটি সময় সাপেক্ষ এবং একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। তারা চাইলে সেমাই তৈরি করতে পারবে নিজেদের দেখার জন্য। তবে সেক্ষেত্রে বাজারজাত করার কোন সুযোগ নেই বাজারজাত করলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সামগ্রিক দায়িত্ব রয়েছেন জহর হাসান জানান, আমি নিজেও কখনো আমার বসকে দেখিনি তিনি ভিডিও কল করেন তবে সেক্ষেত্রে নিজের চেহারা কখনো দেখায় না। তিনি আমাকে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা দিয়ে একটি সুজুকি জিক্সার মোটরসাইকেল উপহার দিয়েছে। একই সাথে শপিং ভ্যালি চা ব্যবসার সাথে জড়িত কয়েকজন এসআরকে মোটরসাইকেল উপহার দিয়েছেন।
একটি ব্যক্তিকে কখনো না দেখে কিভাবে এই ব্যবসার সাথে জড়িত হলেন এবং এত দামী উপহার গ্রহণ করলেন এই প্রসঙ্গে কোন সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেনি জহর হাসান সাগর।
সাতক্ষীরার তালা সদরের বাসিন্দা কবির হোসেন জানান, একটি মানুষকে কখনো না দেখে কিভাবে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান করতে পারে এর উত্তর জানা নেই। লোক মারফতে শুনেছি মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরবে অবস্থানরত এই যুবক হুন্ডি ব্যবসা স্বর্ণ পাচার সহ নানাবিধ অপকর্মের সাথে জড়িত তার এই কালো টাকা সাদা করার জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে এমন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান খুলে বসেছেন। বগুড়ায় তার একই ধরনের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে শুনেছি।
সাতক্ষীরার তালা সদরের আটারই গ্রামের একাধিক বাসিন্দা জানান, শুনেছি মালিক সৌদি আরবে থাকেন। সৌদি আরব থেকে কিভাবে কোটি টাকা ব্যয় করে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন এটা আমরা জানি না । বর্তমান সময়ের আলোচিত ব্যক্তি আরব খানের সাথে যোগাযোগ রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদি আরাব খানের সাথে সৌদি প্রবাসী এই যুবকের কোন সম্পর্ক না থাকে তবে এ নিজেও তো কোন এক আরাফ খান প্রশাসনের তদন্তে বেরিয়ে আসবে আসল তথ্য।
এদিকে সরোজমিনে শপিং ভ্যালি ফুড প্রোডাক্টের কারখানায় গেলে কারখানার দায়িত্বে থাকা জোর হাসান সাগরের মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সংবাদকর্মীদের সাথে কথা বলেন সৌদি প্রবাসী যুবক সবুজ হোসেন। এসময় গণমাধ্যমকর্মীরা প্রবাসী এই যুবকের চেহারা দেখতে চাইলে তিনি কোনভাবে সম্মতি প্রকাশ করে না। সৌদি আরবে তিনি একজন নির্মাণ পেশা শ্রমিক হয়ে কিভাবে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান করছেন এমন প্রশ্নের কোন সদুত্তর দিতে পেরে ফোন কেটে দেব।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর এক কর্মকর্তা বলেন, সৌদি প্রবাসী যুবক সবুজ হোসেনর বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করছে। খুব দ্রুত তদন্তপূর্বক পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
আপনার মতামত লিখুন :