বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হই, জনসচেতনতা গড়ে তুলি : আওলাদ হোসেন

নিউজটি শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক : মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার দক্ষ নেতৃত্বের কল্যাণে দক্ষিণ এশিয়ায় শতভাগ বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত একমাত্র দেশ, বাংলাদেশ। ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুতি শতভাগ বাস্তবায়িত হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, কিছু দুর্গম পার্বত্য এলাকা বাদে এরই মধ্যে দেশের ৯৯.৮৫% এলাকা বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে। বিদ্যুতের আলো এরই মধ্যে চলে গেছে দেশের প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে, দ্বীপ ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকায়। বিদ্যুৎবিহীন ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এই এলাকাগুলোর বাসিন্দারা দীর্ঘ দিন অন্ধকারে কাটালেও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এসে বিদ্যুতের আলোয় তারা আলোকিত। অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে যেসব এলাকায় যুগের পর যুগ বিদ্যুতের আলো পৌঁছায়নি, এবার বিদ্যুৎ বঞ্চিত সেই এলাকার বাসিন্দাদের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে।

বিদ্যুৎ সুবিধার কারণে এসব প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষা, কৃষি, দৈনন্দিন কাজে প্রাণ চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন হয়েছে, হাসি ফুটেছে সকলস্তরের মানুষের মুখে। সবাই নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা ভোগ করছে। কিন্তু সম্প্রতি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক সংকটে আন্তর্জাতিক বাজারে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান উপকরণ গ্যাস ও জ্বালানী তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিভিন্ন উন্নত দেশে বিদ্যুতের জন্য হাহাকার চলছে। বাংলাদেশেও বিদ্যুৎ বিভাগকে বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। চলমান বৈশ্বিক সংকটের ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশে সৃষ্ট লোডশেডিং মোকাবেলায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রীদের গাড়ি নিয়ে ছুটাছুটি না করার নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং জ্বালানি সাশ্রয় করার লক্ষ্যে মন্ত্রনালয় বা অধিদপ্তরে বা সংস্থার প্রধান কার্যালয়ে মিটিং করার জন্য ঢাকার বাইরে বা মিটিংস্থল থেকে দূরে অবস্থানরত কর্মকর্তাকে ঢাকায় ডেকে না পাঠিয়ে অফিস পরিচালনায় ভার্চুয়াল মিটিং উৎসাহিত করা প্রয়োজন।

দৈনিক পত্রিকাসমূহে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, (সূত্র: বাংলাদেশ ইজিবাইক আমদানি ও সরবরাহকারী ব্যবসায়ী সমিতি) বিভাগীয় শহর, জেলা শহর, উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ে প্রায় ১৫ লাখ ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও রিকশা-ভ্যান চলাচল করছে। প্রতিটি ইজিবাইক চলাচলের জন্য ৪-৫ টি ১২ ভোল্টের ব্যাটারি প্রয়োজন। এসব ব্যাাটারী চার্জ করতে দৈনিক ১৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হয়। বিদ্যুতের এই অবৈধ ব্যবহার শুধুমাত্র বেআইনি নয়, রাষ্ট্রের ক্ষতিসাধনও করছে, যা জাতীয় সম্পদ বিদ্যুতের অপচয়। এই অপচয় রোধে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

সরকারি, বেসরকারি ভবন, অফিস-আদালত, ব্যক্তিগত বাসভবনে যথেচ্ছ বিদ্যুৎ অপচয়ের উদাহরণ রয়েছে। আমি সেদিকে না গিয়ে জাপানের অভিজ্ঞতা থেকে একটি দৃষ্টান্ত দিতে চাই। জাপানের Nagoya University -তে অধ্যয়নকালে Professor Murata একদিন আমাকে বলেছিলেন, ‘Mr. Hossain, electricity is our national property. Please use electricity properly. Don’t misuse’. আমি লক্ষ্য করেছি বিভাগীয় অধ্যাপক মহোদয়সহ ছাত্র, শিক্ষক সকলেই সবসময়ই নিজ নিজ কক্ষ থেকে বের হওয়ার সময় দরজার ডান পাশে থাকা সুইচটা বন্ধ করে বের হতেন। নামিদামি আবাসিক হোটেলে যেমনি Door Key card ব্যবহার করে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করে, ঠিক তেমনিভাবে জাপানের সকল সরকারি-বেসরকারি ভবনসমূহের সকল কক্ষ থেকে বের হওয়ার দরজার ভিতর দিকে একটি সুইচ ব্যবহার করে কক্ষের সকল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মাধ্যমে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করে। আমাদের দেশেও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা সংশোধন করে ভবনের নকশায় তেমনি সুইচ ব্যবহার নিশ্চিত করে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করার পদ্ধতি চালু করা যায়।

একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় জ্বালানি সাশ্রয়ে রাস্তায় গাড়ির গতি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। রাস্তায় বেরুলেই দেখা যায় হাজার হাজার গাড়ি ঘন্টার পর ঘন্টা ট্র্যাফিক জ্যামে আটকা পড়ে আছে। সবগুলো গাড়ির ইঞ্জিন চালু করে রেখেছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণযন্ত্র (Air-conditioning system) সংযুক্ত গাড়িগুলো AC system চালু করে রেখেছে যা জ্বালানীর অপচয়। এই অপচয় রোধে রাস্তায় গাড়ির গতি বাড়ানোর ব্যাপারে জরুরি পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। গাড়ির গতিভেদে রাস্তায় লেন নির্দিষ্ট করে দিয়ে কম গতি সম্পন্ন গাড়ি সর্ববামে, বেশি গতি সম্পন্ন গাড়ি ডানে চলাচল করার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। রাস্তায় গাড়ি চলাচলে শৃংখলা নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নিয়োগ দেয়া যায়। জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সহায়তাও নেয়া যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আমাদের নাগরিকদের- ‘আমি বিদ্যুৎ ব্যবহার করবো, আমি বিল পরিশোধ করবো’ এমন মানসিকতা পরিহার করতে হবে। বরং এমন মানসিকতা পোষণ করতে হবে যে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি জাতীয় সম্পদ যা প্রবাসীদের কষ্টার্জিত রেমিটেন্স ও দেশে শ্রমিকের ঘামের বিনিময়ে উৎপাদিত পণ্য রপ্তানী করে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে আমদানি করতে হয়।

জাপানসহ পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশে বিদ্যুত সাশ্রয় করার জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে থাকে। আমি জাপানে অবস্থানকালে দেখেছি টোকিও শহরে একটি পাঁচ তারকা হোটেলের বিছানার উপরে রাখা একটা বড় কাগজে লেখা রয়েছে: ‘বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পৃথিবীর কোথাও না কোথাও পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। সুতরাং বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হই’।

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. মহ. শের আলী বিদ্যুৎ সাশ্রয় নিয়ে আলাপচারিতায় বললেন, দক্ষিণ কোরিয়া সফরকালে তিনি দেখেছেন, লিফটের সামনে লেখা আছে: ‘Burn calories not electricity’।

দেশের বিদ্যুৎ বিভাগ লোডশেডিং এর ঘোষণা দিয়েছে এ কথা ঠিক, কিন্তু জ্বালানী বিশেষজ্ঞদের মতে ‘সেপ্টেম্বর ২০২২ অতিক্রান্ত হওয়ার পর গরমের প্রভাব কমতে থাকবে, সাথে সাথে বিদ্যুৎ এর সংকটও কমতে থাকবে। এছাড়া আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে কয়লা দিয়ে পরিচালিত রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদনে শুরু হবে। পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ শেষ হয়েছে, সঞ্চালন লাইনের কাজ চলছে, ঐ সঞ্চালন লাইন ব্যবহার করে রামপাল তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কয়লা ব্যবহারে উৎপাদিত ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঢাকায় এনে সংযোগ করা হলে আগামী মার্চ মাস নাগাদ লোডশেডিং কমবে। সেখানে তেল, গ্যাস প্রয়োজন হবে না। কয়লা ব্যবহারে রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়ে চলমান সংকট মোকাবেলা করতে পারবে বিদ্যুৎ বিভাগ। লোডশেডিং থাকবে না’।

চলমান সংকট মোকাবেলায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়া এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে বিশ্বে সম্ভাব্য খাদ্য সংকট মোকাবেলায় উৎপাদন বাড়ানোর জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নে তৃণমূল পর্যায়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতাদের নিয়ে কর্মীসভা ও গসণসংযোগ কর্মসূচির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে চলমান সংকটের কারণসমূহ ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। সংকট মোকাবেলায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানী ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার জন্য জনপ্রতিনিধি, সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী, মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিন সাহেবগন এবং স্কুলের শিক্ষকমন্ডলী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। মসজিদের ইমাম সাহেবের বয়ান (বক্তব্য) এবং ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি শিক্ষকদের নির্দেশনা সামাজিক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে।

এছাড়া স্বাধীনতা বিরোধী ও তাদের দোসররা যেন এই বৈশ্বিক সংকটকে পুঁজি করে, ভুল ব্যাখ্যা প্রচার করে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করার সুযোগ না পায় সে বিষয়েও সজাগ থাকা প্রয়োজন। আমাদের মনে রাখতে হবে পবিত্র কোরানের সেই মহান বাণী-‘তোমরা সম্পত্তির অপচয় করবে না। নিশ্চয় অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার প্রতিপালকের প্রতি চূড়ান্ত অকৃতজ্ঞ।‘ – (সূরা বনী ইসরাঈল- আয়াত ২৭)।

 

শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »