মাত্রাতিরিক্ত ভাড়ার চাপে ক্ষুব্ধ যাত্রীরা | Daily AjKaler Kontho

মাত্রাতিরিক্ত ভাড়ার চাপে ক্ষুব্ধ যাত্রীরা


আজকালের কণ্ঠ প্রকাশের সময় : জুন ২, ২০২০, ২:১২ অপরাহ্ন
মাত্রাতিরিক্ত ভাড়ার চাপে ক্ষুব্ধ যাত্রীরা

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে গত ২৬ মার্চ থেকে দেশব্যাপী সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার। এ ছুটির আওতায় গণপরিবহনও ছিল বন্ধ। সরকারের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী টানা ৬৬ দিন পর গতকাল থেকে রাজধানীসহ সারা দেশে স্বাস্থ্যবিধি মেনে নেওয়ার শর্তে ফের শুরু হয়েছে বাস-মিনিবাস চলাচল। এরও একদিন আগে থেকে শুরু হয়েছে ট্রেন ও লঞ্চ চলাচল।

এমন একটি সময়ে সড়ক, রেল ও নৌপথে সাধারণ যান চলাচল শুরু হলো, যখন দেশে করোনা পরিস্থিতির উন্নতি নয় বরং আরও অবনতি ঘটছে। এ নিয়ে সৃষ্ট উদ্বেগের ক্ষেত্রে সরকার বলছে, সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা তথা সার্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি করোনার বিস্তার রোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার শর্তেই গণপরিবহন চলবে। কিন্তু সেই স্বাস্থ্যবিধি কতটা মানা হচ্ছে? এ ক্ষেত্রে নৌপথের বাস্তব চিত্র খুবই উদ্বেগজনক। সড়কপথে রাজধানীর চিত্র অপেক্ষাকৃত স্বস্তিদায়ক হলেও এর বাইরের অবস্থা নাজুক। ফলে বেড়ে যাচ্ছে ঝুঁকি। একমাত্র ট্রেনই চলছে স্বাস্থ্যবিধি যথাসম্ভব মেনে।

এদিকে সর্বত্রই দেখা যাচ্ছে বাড়তি ভাড়ার চাপ। এ চাপে পিষ্ট হতে হচ্ছে পথে বের হওয়া সাধারণ মানুষকে। উপার্জন বন্ধ থাকা মানুষগুলোর অনেকেই জীবিকার তাগিদে ঘর থেকে বেরিয়ে গুনেছেন অতিরিক্ত এমনকি দ্বিগুণ বা তারও বেশি ভাড়া। দূরপাল্লার যানবাহনেও একই দশা।

এ নিয়ে যাত্রীদের বিস্তর অভিযোগ। এ ক্ষেত্রে পরিবহনকর্মীদের যুক্তি, আগে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও কম আদায় করা হতো। এখন সরকার নির্ধারিত ভাড়ার সঙ্গে ৬০ শতাংশ যোগ করায় বলা হচ্ছে দ্বিগুণ আদায় করা হয়।

অন্যদিকে, গণপরিবহনে ৬০ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধি করে সরকারের জারি করা প্রজ্ঞাপনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে গতকাল হাইকোর্টের ভার্চুয়াল বেঞ্চে রিট করা হয়েছে। এতে ভাড়া বৃদ্ধির ওই প্রজ্ঞাপনের কার্যকারিতা স্থগিত চাওয়া হয়েছে।

সাধারণ মানুষের স্বার্থে গণপরিবহনে ৬০ শতাংশ বর্ধিত ভাড়া বাতিলের দাবি জানিয়ে গতকাল বিবৃতি দিয়েছে সেবামূলক সংস্থা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনও।

ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্টপেজ ও বাস টার্মিনাল ঘুরে সামাজিক দূরত্ব রক্ষার চেষ্টা চোখে পড়েছে। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন অঞ্চলে কম সতর্কতা ছিল। তবে সর্বত্র বাড়তি ভাড়ার চাপ ছিল। উপার্জন বন্ধ থাকা মানুষগুলো জীবিকার তাগিদে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ছেন বিপাকে। গুনেছেন অতিরিক্ত ভাড়া।

গতকাল সকাল থেকেই রাজধানীর মিরপুর, ফার্মগেট, কারওয়ানবাজার, বনানীসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে যাত্রী চাপ তুলনামূলক কম। কোনো স্টপেজে বাস থামার পর সতর্কতার সঙ্গেই যাত্রী তোলা হচ্ছিল। বাসের চালক, কন্ডাক্টর ও হেলপারের কাছে মাস্ক, গ্লাভস ছিল। যাত্রীরাও মুখে মাস্ক ব্যবহার করে । যাত্রীরা গাড়িতে ওঠার সময় তাদের হাতে জীবানুনাশক স্প্রে করতে দেখা যায় অনেক শ্রমিককে। গতকালের যান চলাচলের হার ছিল তুলামূলক কম। যাত্রী সংখ্যাও স্বাভাবিক সময়ের মতো দেখা যায়নি। একাধিক বাসে চড়ে দেখা যায়, এক সিট ফাঁকা রেখেই যাত্রীদের বসানো হয়েছে। সে হিসাবে সামাজিক সুরক্ষা সংক্রান্ত অভিযোগ ছিল কম। তবে টিকিট সংগ্রহের সময় কাউন্টারে গাদাগাদি করে দাঁড়ানোর দৃশ্য চোখে পড়ে। স্বল্প দূরত্বের যাত্রায় অনেক স্টপেজে দেখা গেছে সেই পুরনো দৃশ্যÑ ছেড়ে যাওয়া বাসের পেছনে ছুটছেন যাত্রীদের কেউ কেউ; স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘন করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লাফিয়ে উঠছেন চলতি বাসে।

গণপরিবহন চালুর প্রথম দিন বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ ছিল বিস্তর। নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির অনেক যাত্রী বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন। ঢাকার শেওড়াপাড়া থেকে মিরপুরে শাহআলী মাকের্টের সামনে অন্য সময়ের ৫ টাকার ভাড়া এবার নেওয়া হচ্ছে ১০ টাকা। মিরপুর থেকে ফার্মগেট আগে ছিল ১৫ টাকা এখন তা ২৫ টাকা। আবার মোহাম্মদপুর থেকে গুলিস্তানের ভাড়া এখন নেওয়া হচ্ছে ৩২ টাকা আগে ছিল ২০ টাকা। আবার বাসে যে একই হারে ভাড়া নেওয়া হচ্ছে এমনটি নয়। একই গন্তব্যে ভাড়া ৮০ থেকে ১০০ ভাগ বেশি নেওয়ার দৃষ্টান্তও আছে। মিরপুর থেকে গুলশান ৪০ টাকা নেওয়া হয় আগে ছিল তা ২৫ টাকা। কিছু বাসে এ ভাড়া ৫০ টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ মেলে। মিরপুর ১৩ নম্বর থেকে ১ নম্বরে অন্য সময়ে যেতেন ১০ টাকায়। এবার সেই ভাড়া হয়ে গেছে ৩০ টাকা। হানিফ নামের ৪০ বছরের এই শ্রমিক মিরপুরে মূলত কুলির কাজ করেন। বাজারের পণ্য ওঠানামার কাজ করেই চলে তার সংসার। বাড়তি ভাড়ায় তার ওপর বাড়তি চাপ বলে কষ্টের বর্ণনা দিচ্ছিলেন তিনি। অবশ্য এ নিয়ে পরিবহন শ্রমিকদেরও বক্তব্য আছে নিজেদের মতো করে। প্রথম কথা, ভাড়ার কোনো চার্ট তৈরি হয়নি। ফলে ইচ্ছামতো আদায় করা যাচ্ছে। তা ছাড়া তুলনামূলক যাত্রী কম হওয়ায় ভাড়া বেশি আদায়ের যুক্তি দেখান বিকল্প পরিবহনের কন্ডাক্টর আনিস।

গতকাল বিআরটিএর চেয়ারম্যান ইউসুব আলী মোল্লার সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিআরটিএর চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন কর্মকর্তা পৃথকভাবে রাজধানীর বিভিন্ন স্পট ঘুরে দেখেছেন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে গাড়ি চলছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি জানান, বিআরটিএর মোবাইলকোর্ট ছিল মাঠে। তারা পুরো কার্যক্রম মনিটরিং করছেন এবং ব্যবস্থা নিচ্ছেন। মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সবাই চেষ্টা করছে।

সরেজমিনে গতকাল নগরীর ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, আসাদগেট, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, ফার্মগেট, এলাকায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে গণপরিবহন চলতে দেখা গেছে। এ সময় গাড়ির চালক ও সহকারীদের জীবাণু প্রতিরোধক হেড কাভার, গ্লাভস, মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে দেখা গেছে। পরিবহনগুলোতে ওঠানামা এবং ভাড়া আদান-প্রদানের আগে ও পরে বাস সহকারীর হাতে থাকা হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত জীবাণুমুক্ত করতেও দেখা গেছে যাত্রী, চালক ও সহকারীদের। ভাড়া বেশি হলেও যাত্রাপথে কোনো ধরনের অতিরিক্ত যাত্রী তুলতে দেখা যায়নি। ফার্মগেট এলাকায় কথা হয় ট্রাস্ট পরিবহনের বাস চালকের সঙ্গে। তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিজেদের সাধ্যমতো স্বাস্থ্যবিধি ও আরোপিত নির্দেশনা মেনেই রাস্তায় বাস নামিয়েছেন তারা। এ ছাড়া শহরে যথারিতি ব্যক্তিগত গাড়ি, রিকশা, অটোরিকশা ও মোটরবাইক চলাচল করতে দেখা গেছে।

দূরপাল্লার রুটেও বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ আছে। রাজধানীর সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে কুমিল্লা, কোম্পানিগঞ্জ রুটের ভাড়া ছিল ১৮০-২০০ টাকা। এখন আদায় করা হচ্ছে ৪০০ টাকা। কল্যাণপুর থেকে কুষ্টিয়া রুটে আগে ভাড়া ছিল ৪০০-৪৫০ টাকা, এখন ৮০০ টাকা। একইভাবে সব রুটের ভাড়া বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। পরিবহন কর্মীদের যুক্তি, আগে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও কম আদায় করা হতো। এখন সরকার নির্ধারিত ভাড়ার সঙ্গে ৬০ শতাংশ যোগ করায় বলা হচ্ছে দ্বিগুণ আদায় করা হয়। তবে যানবাহনে অফিসমুখী যাত্রী ছাড়া সাধারণ যাত্রীদের চাপ নেই বলে জানিয়েছেন পরিবহনের চালক ও হেলপাররা (সহকারী)।

বিআরটিএর সাবেক চেয়ারম্যান আইয়ুবুর রহমান খান বলেন, ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্তটি অনেকের জন্য অসুবিধার। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত মানুষের বাসে চড়াও এখন কঠিন হয়ে গেল। যেসব যাত্রী বাসে চড়ে কর্মস্থলে যায়, তাদের একটা অংশ শ্রমিক। বাড়তি ভাড়ার চাপ নেওয়া তাদের জন্য কঠিন। এমনিতেই করোনার কারণে তাদের সংসারে অনটন বেড়েছে।

স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার সর্বাগ্রে ট্রেন, উল্টোপথে লঞ্চ

গতকাল ছিল ট্রেন চলাচলের দ্বিতীয় দিন। অনলাইনে টিকিট প্রাপ্তিতে দুর্ভোগের অভিযোগ ছিল। তবে সামাজিক সুরক্ষা মানার ব্যাপারে রেল ছিল সর্বাগ্রে। বনলতা এক্সপ্রেস, চিত্রা এক্সপ্রেস, পঞ্চগড়, লালমনি এক্সপ্রেস, সোনারবাংলা, সুবর্ণ, কালনী উদয়ন এক্সপ্রেস চলছে। ৩ জুন থেকে ট্রেন আরও বাড়বে। যাত্রীদের ট্রেনে ওঠা থেকে শুরু করে স্টেশনে প্রবেশ, প্লাটফরমে অপেক্ষা সর্বত্র চিল সতর্কতা। জীবানুনাশক ছিটানো, মাস্ক, গ্লাভস ব্যবহারে সবাইকে আগ্রহী করতে তৎপর ছিলেন রেল কর্মকর্তারা। ট্রেনের পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারেও সজাগ থাকতে দেখা যায়। তবে কিছু যাত্রীকে দেখা যায় মাস্ক থাকা সত্ত্বেও খুলে রাখতে।

গতকাল দুপুরে সদরঘাটে গিয়ে দেখা যায় বিকালের লঞ্চ ধরতে মানুষ দলে দলে টার্মিনালের দিকে হেঁটে চলেছে। তাদের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব দূরে থাক করোনা আক্রান্ত হওয়া থেকে নিজেদের রক্ষা করতে কোনো বিধিই মানা হচ্ছে না। বেশিরভাগেরই মাস্ক থাকলেও সেটি সঠিকভাবে ব্যবহার করতে দেখা যায়নি। যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড়। লঞ্চের ভেতরে গাদাগাদি করে মানুষ। ভেতরের অবস্থা দেখলে মনে হবে ঈদযাত্রা। সাধারণ যাত্রীরা বলছেন, চাহিদার তুলনায় লঞ্চ কম, তাই ভিড়। কিন্তু তারা এটি বলছেন না; যাত্রীদের জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কোথাও যেতে নিষেধ করা হচ্ছে। সরকারের সতর্কবার্তা এসব মানুষ গা করছেন বলে মনে হয়নি।

যাত্রীভাড়া ঠিকই আদায় করা হয়েছে। আগামীতেও এর ব্যতিক্রম হওয়ার সম্ভাবনা নেই।