রাত পোহালেই ঢাকার দুই সিটিতে ভোট। ২১ দিনের বিরামহীন প্রচার-প্রচারণা শেষে এখন ভোটের অপেক্ষায় প্রার্থী এবং ভোটাররা। প্রায় ৫৫ লাখ ভোটারের দুই সিটিতে চোখ পুরো দেশবাসীর। ঢাকায় চোখ পুরো দুনিয়ার। কেমন হবে নির্বাচন? কেমন থাকবে ভোটের দিনের পরিবেশ এমন আলোচনা এখন চারপাশে। পাল্টাপাল্টি নানা অভিযোগ এসেছে। শনিবার (১ ফেব্রুয়ারি) সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলবে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস ভোট দেবেন ধানমন্ডির ডক্টর মালিকা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ কেন্দ্রে। আর এই সিটি করপোরেশনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন ভোট দেবেন দেবেন মিশন রোডের শহীদ শাহজাহান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। শনিবার (১ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৯টার মধ্যে তারা ভোট দেবেন বলে জানা গেছে। আর জাতীয় পার্টির মেয়র পদপ্রার্থী হাজি সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন লালবাগের আমলিগোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সকাল ৯-১০টার মধ্যে ভোট দেবেন।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী আতিকুল ইসলাম ইসলাম উত্তরার নওয়াব হাবিবুল্লাহ স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভোট দেবেন। আর এই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী তাবিথ আউয়াল ভোট দেবেন গুলশানের মানারাত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে।
এছাড়া আরেক মেয়র পদপ্রার্থী সিপিবির আহাম্মদ সাজেদুল হক রুবেল মিরপুরে আদর্শ স্কুলে বেলা ১১টায় ভোট দেবেন। রামপুরা একরামুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়ে সকাল সাড়ে ৮-৯টার মধ্যে ভোট দেবেন ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের মেয়র পদপ্রার্থী মাওলানা শেখ ফজলে বারী মাসউদ।
দুই সিটি করপোরেশনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চার প্রার্থীর মিডিয়া উইং সূত্রে জানা গেছে, প্রার্থীরা সকাল আটটায় ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার পরপরই তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। পরে তারা ভোটের সামগ্রিক পরিবেশ নিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথাও বলবেন।
এছাড়া ঢাকা সিটি কলেজ কেন্দ্রে নিজের ভোট দেবেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। শনিবার (১ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮টায় তিনি ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। শুক্রবার (৩১ জানুয়ারি) প্রধানমন্ত্রীর প্রেসং উইংয়ের পক্ষ থেকে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
অন্যান্য রাজনীতিক ব্যাক্তিদের মধ্যে সিদ্ধেশ্বরীতে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দেবেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সভাপতি ড. কামাল হোসেন। ফ্রন্টের আরেক শীর্ষ নেতা গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ধানমন্ডির কাকলি স্কুল কেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।
এছাড়াও ঐক্যফ্রন্টের নাগরিক ঐক্যের মাহামুদুর রহমান মান্না বনানী বিদ্যানিকেতনে, বিকল্প ধারা বাংলাদেশের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নুরুল আমিন বেপারী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবরেটরি স্কুল কেন্দ্রে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।
এদিকে কেন্দ্র দখল, কেন্দ্র পাহারার কথাও এসেছে প্রার্থী এবং তাদের দলের নেতাদের মুখ থেকে। কেন্দ্র দখল করতে ভাড়াটে সশস্ত্র সন্ত্রাসী ঢাকায় আনা হয়েছে এই অভিযোগ এসেছে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীদের তরফে। এবারই প্রথম দুই সিটিতে ইভিএমে পুরো ভোট গ্রহণ করা হবে। ঢাকাবাসীর জন্য এটি হবে নতুন অভিজ্ঞতা। আগের ভোটগুলোতে রাতেই ভোট দেয়া, কেন্দ্র দখল, ব্যালট ছিনতাইয়ের অভিযোগ ছিল। কিন্তু এবার ইভিএমে ভোট কাস্ট করতে হলে ভোট লাগবে। তাই ভোটারদেরও কেন্দ্রে যেতে হবে।
ঢাকার ভোটাররা ভোট কেন্দ্রে নির্বিঘ্নে যেতে পারবেন কিনা, যেতে চাইবেন কিনা এমন প্রশ্ন খোদ প্রার্থীদেরও। তারা বলছেন, অতীতের অভিজ্ঞতা ভোটাদের জন্য সুখকর নয়। তাই তাদের কেন্দ্রমুখি করতে ভোটের দিনের পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ। বাতাসে নানা কিসিমের গুজব-গুঞ্জন ভেসে বেড়াচ্ছে। বলা হচ্ছে-যে বোতামেই টিপ দেন না কেন ভোট একটা নির্দিষ্ট প্রতীকেই পড়বে। দিনের শেষে যতো ভোটই পড়ুক যন্ত্রে গণনাটা হবে গুরুত্বপূর্ণ। সেই গণনা কিভাবে হবে সেটিও হবে দেখার বিষয়। আলোচনায় আছে আগের ভোটগুলোর মতো কেন্দ্রের বাইরে প্রভাবশালী প্রার্থীদের পক্ষে ‘জটলা কৌশল’। বলা হচ্ছে, ইভিএমের এক বোতামে টিপ দেয়ার পর ভোট হয়ে গেছে বলে ভোটের সুযোগটি নিতে পারে তৃতীয় কেউ।
বাতাসে ভেসে বেড়ানো এসব গুজব আর গুঞ্জনকে মিথ্যা প্রমাণ করে শান্তিুপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য ভোট অনুষ্ঠানের বিশাল এক চ্যালেঞ্জ নির্বাচন কমিশনের সামনে। ভোট সুষ্ঠু করার চ্যালেঞ্জ আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনেও। নির্বাচন শান্তিপূর্ণ করতে পুলিশ, বিজিবি, র্যাবসহ বিভিন্ন সংস্থার অন্তত ৪০ হাজার কর্মী কাজ করবেন। বৃহস্পতিবার থেকে বিজিবি টহলে নেমেছে। ভোট সামনে রেখে নগরজুড়ে কাজ করবে র্যাবের দেড়শ টিম। কিছু ঘটনাছাড়া শান্তিপূর্ণ প্রচার শেষ হওয়ায় নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচন কমিশন ও আইন শৃঙ্কলা রক্ষাকারী বাহিনী চাইলে একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন উপহার দেয়া সম্ভব।
ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনসহ (ইভিএম) অন্যান্য নির্বাচনি সামগ্রী কেন্দ্রে কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। ইভিএম পরিচালনার জন্য প্রতিটি কেন্দ্রে ইসির প্রশিক্ষিত কর্মতর্কা ছাড়াও দুই জন করে সেনা সদস্য রাখা হবে। সিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যানবাহন চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে ইসি। ৩০শে জানুয়ারি মধ্যরাত (রাত ১২টা) থেকে ২রা ফেব্রুয়ারি ভোর ৬টা পর্যন্ত মোট ৫৪ ঘণ্টা মোটরসাইকেল চলাচল নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, এছাড়া ৩১ জানুয়ারি মধ্যরাত (১২টা) থেকে ১ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের দিন সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সব ধরনের যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ইসি। তবে দুই সিটির রিটার্নিং কর্মকর্তার অনুমতি সাপেক্ষে এবং নির্বাচন কমিশন থেকে সরবরাহ করা স্টিকার ও পরিচয়পত্র ব্যবহার করে মোটরসাইকল ও বিভিন্ন যানবাহন ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিলতা রাখা হয়েছে। বিশেষ করে, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও তাদের এজেন্ট, দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক, নির্বাচনে সংবাদ সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত দেশি-বিদেশি সাংবাদিক এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবেন। সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের পরিচয়পত্রের পাশাপাশি ইসি থেকে সরবরাহ করা স্টিকার ও তাদের নিজেদের অফিসের পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখার কথা বলা হয়েছে। নির্বাচন উপলক্ষে শুক্রবার মধ্যরাত থেকে শনিবার ভোটেরদিন মধ্যরাত পর্যন্ত (২৪ ঘন্টা) লঞ্চ, স্পীড বোটসহ সকল ধরণের ইঞ্জিন চালিত নৌযান বন্ধ থাকবে।
এদিকে, ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দুই সিটির ২ হাজার ৪৬৮টি কেন্দ্রের মধ্যে ১ হাজার ৫৯৭ টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ (গুরুত্বপূর্ণ) ঘোষণা করেছে ইসি। এরমধ্যে দক্ষিণে ১ হাজার ১৫০ টি কেন্দ্রের মধ্যে ৭২১ টি ও উত্তর সিটিতে ১ হাজার ৩১৮টি কেন্দ্রে মধ্যে ৮৭৬ টি কেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছে নির্বাচন কমিশন। ঝুঁকির্পণূ কেন্দ্রগুলোতে নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে ২জন বেশি পুলিশ সদস্য রাখা হয়েছে। সাধারণ ওয়ার্ডে ১৬জন ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র ১৮ জন আইন শৃংঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়ন থাকবে।
আপনার মতামত লিখুন :