গণপিটুনিতে মৃত্যু নিয়ে মিথ্যা মামলা ও হয়রানির প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন | Daily AjKaler Kontho

গণপিটুনিতে মৃত্যু নিয়ে মিথ্যা মামলা ও হয়রানির প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন


মোঃ আতিয়ার রহমান, সাতক্ষীরা জেলা প্রতিনিধি প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬, ৫:৩২ অপরাহ্ন
গণপিটুনিতে মৃত্যু নিয়ে মিথ্যা মামলা ও হয়রানির প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন

সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে ৯ বছরের শিশু ফারজানা খানমকে নৃশংসভাবে হত্যার পর অভিযুক্ত নারী গণপিটুনিতে নিহতের ঘটনায় মিথ্যা মামলা ও নিরপরাধ মানুষের হয়রানির প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। রোববার দুপুরে সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের অস্থায়ী কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে নিহত শিশু ফারজানার পরিবার ও স্থানীয় নিরাপরাধ লোকজনকে হত্যা মামলায় জড়ানোর তীব্র প্রতিবাদ এবং ঘটনার সাথে জড়িত প্রকৃত দোষীদের শাস্তির দাবি জানানো হয়।

লিখিত বক্তব্যে নিহত শিশু ফারজানার মা নাজমা খাতুন বলেন, তাঁর স্বামী এনামুল হক পেশায় একজন শ্রমিক। তাঁদের সন্তানের মধ্যে ফারজানা খানম স্থানীয় কাজলা কাশিবাটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ত। গত ২০ জুলাই সকালে প্রতিদিনের মতো স্কুলে যায় ফারজানা। দুপুরে টিফিনের বিরতির পর ফারজানা বাড়ি না ফেরায় পরিবারের লোকজন স্কুলে গিয়ে খোঁজাখুঁজি করে দেখেন শ্রেণিকক্ষের টেবিলে তার বই ও ব্যাগ পড়ে রয়েছে, কিন্তু শিশুটি অনুপস্থিত। দীর্ঘ সময় স্কুলে ফারজানা না থাকলেও শিক্ষকরা বিষয়টি পরিবারকে জানাননি বা কোনো খোঁজখবর নেননি। এ ঘটনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের অবহেলাকে কোনোভাবেই এড়ানো যায় না বলে নাজমা খাতুন উল্লেখ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে ফারজানার মা আরও জানান, পরে সহপাঠীদের সূত্রে তাঁরা জানতে পারেন যে ফারজানা পাশ্ববর্তী সুমাইয়া নামের এক নারীর দোকানে ঝালমুড়ি কিনতে গিয়েছিল। এর পর থেকে তাকে আর পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও ফারজানার স্বজনরা সুমাইয়ার কাছে জানতে চাইলে সে অসংলগ্ন আচরণ শুরু করে। এতে উপস্থিত জনতা ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে সুমাইয়ার ঘর তল্লাশি করে ড্রয়ারের ভেতর থেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় শিশু ফারজানার মরদেহ উদ্ধার করে। কানের স্বর্ণের দুল ছিনিয়ে নিতে ফারজানাকে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারনা করা হয় এবং মরদেহ উদ্ধারের পর উপস্থিত শত শত উৎসুক ও উত্তেজিত জনতা ফারজানাকের হত্যর অভিযোগে সুমাইয়াকে গণপিটুনি দেয়। সে সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা না রেখে ‘নীরব দর্শকের’ ভূমিকা পালন করে বলে অভিযোগ করেন শিশুটির মা। ফলে গণপিটুনিতে আহত হয়ে সুমাইয়া মারা যান। একদিকে সন্তানকে হারানোর ভয়াবহ শোক, অন্যদিকে অসুস্থ হয়ে পড়া স্বামীকে সামলাতে গিয়ে সে সময় পরিবারের কারোরই উত্তেজিত জনতাকে ঠেকানোর মতো পরিস্থিতি ছিল না।

এ ঘটনায় নিহত ফারজানার বাবা এনামুল হক বাদী হয়ে সুমাইয়ার ভাই আবদুল্লাহ আল মামুনসহ অজ্ঞাতদের আসামি করে কালিগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। উক্ত মামলায় আবদুল্লাহ আল মামুন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।

তবে ঘটনার পর নিহত সুমাইয়ার স্বামী আমিরুল ইসলাম ও তার বাবা আবদুল লতিফ বাদী হয়ে দুটি পৃথক মামলা দায়ের করেন। এর মধ্যে আবদুল লতিফের মামলায় ফারজানার পরিবারের দুই সদস্যসহ ৮ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও অনেককে আসামি করা হয়েছে। নাজমা খাতুনের অভিযোগ, সন্তানহারা পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মিথ্যা হত্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, একটি স্বার্থান্বেষী মহল ‘মামলা বাণিজ্য’ করার উদ্দেশ্যে ঘটনার দিন এলাকায় উপস্থিত না থাকা এবং ঘটনা সম্পর্কে কিছুই জানে না—এমন নিরপরাধ মানুষকে অজ্ঞাত আসামি দেখিয়ে আটক করাচ্ছে। এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে পুলিশের দায়িত্বজ্ঞানহীন ভূমিকা ও অসৎ সম্পৃক্ততার সন্দেহ প্রকাশ করেছেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে কাঁদতে কাঁদতে নাজমা খাতুন বলেন, “আমার নিষ্পাপ সন্তানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো। এখন আবার আমার স্বামীসহ স্বজনদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। সন্তান হারানোর শোক সামলাব নাকি মিথ্যা মামলার আসামি হয়ে পালিয়ে বেড়াব? এটা কেমন বিচার?”

সংবাদ সম্মেলন থেকে শিশু ফারজানা হত্যার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন, জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং কোনো নিরপরাধ মানুষ বা সন্তানহারা পরিবার যাতে হয়রানির শিকার না হয়, সে জন্য সাতক্ষীরা জেলা পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়।

‎আজকালের কন্ঠ/আর বি