
কুড়িগ্রাম জেলাধীন উলিপুর উপজেলার পান্ডুল ইউনিয়নে রুকাইয়া আক্তার নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনার ৩ বৎসর দিন পেরিয়ে গেলে আজও বধি সেই ভয়াবহ নৃশংস হত্যা কান্ডের ঘটনার পুরো রহস্য কি এখনো উন্মোচিত হয়নি —এ প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে নিহতদের স্বজন ও স্থানীয় মানুষের মনে।
উলিপুর উপজেলা পান্ডুল ইউনিয়নের তেলী পাড়া গ্রামে বাবার বাসায় ২০২৩ সালের ১৩ই আগস্ট সকালে রুকাইয়া আক্তার রিংকীকে শয়ন কক্ষে রক্তাক্ত অবস্থায় মৃত পাওয়া যায়,তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে দাঁড়ালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন ছিল। এই ঘটনার পর নিহতের বাবা বাদী হয়ে উলিপুর থানায় অজ্ঞাত নামা মামলা রুজু করেন। উলিপুর থানা মামলা নং ২০/২৩ইং তারিখ ১৩/০৮/২০২৩ইং । কোর্ট মামরা নং জিআর নং ২৩৯/২৩।
দীর্ঘ প্রায় সাত মাস উলিপুর থানায় মামলা টি তদন্তের অপেক্ষায় থেকে ও রিংকি হত্যার কোন ক্লু বের না হওয়ায় পরে ৬/২/২০২৪ইং তারিখে মামলা টি পিবিআই তে পাঠানো হয় সেখানেও কোন সুনির্দিষ্ট আসামির নাম বের না হওয়াও সেখান থেকে ৫/৩/২০২৬ইং তারিখে মামলা টি সিআইডি তে ন্যস্ত হয়। সিআইডি তে মামলাটি প্রকৃত আসামি সনাক্ত করার জন্য তদন্ত চলছে।
এমতাবস্থায় দীর্ঘ ৩ টি বছর পেরিয়ে গেলেও পরিবার ও স্বজনরা ন্যায় বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে।
কিন্তু গত ১০/৩/২০২৩ইং তারিখে রুকাইয়া আক্তার রিংকির সহিত উলিপুর উপজেলাধীন ৭নং ধরনীবাড়ী ইউনিয়নের কেকতীর পার মাঝবিল গ্রামের মৃত কছরউদ্দিন এর ছেলে মোহাম্মদ মেহেদী হাসান এর সহিত বিবাহ হয়।
বিবাহের পর থেকে রিংকির স্বামীর সহিত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিভিন্ন সময় মনমালিন্য হয়।
ঘটনার পর সন্দেহভাজন হিসেবে রুকাইয়া আক্তার রিংকির স্বামীকে দায়ী করেন রিংকির বাবা মা। কিন্তু একজন সন্দেহভাজনের উপর কি রিংকির মৃত্যুর পরও থেকে যায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—রিংকির স্বামী কি এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন? নাকী হত্যার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল? নাকি ঘটনার নেপথ্যে আরও কোনো ব্যক্তি রয়েছে?
এদিকে হত্যাকাণ্ডের পর তদন্তের জন্য উলিপুর থানা পুলিশ মো. আশাদুজ্জামান আসিফ সহ দুজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করে। মামলার তদন্ত-সংক্রান্ত নথিতে রিংকির সঙ্গে আসিফের পূর্বপরিচয়, প্রেমের প্রস্তাব নিয়ে বিরোধ এবং পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে সতর্ক করার বিষয় উল্লেখ রয়েছে।
পরবর্তীতে দীর্ঘ ৫ মাস পেরিয়ে গেলেও কুড়িগ্রাম জেলা সিআইডি কর্মকর্তা গন এখনো কোন রিংকি হত্যার মামলার কোন সুরাহা তথা কোন আসামী সনাক্ত করা হয়নি বলে প্রবেদন কারী জানান নিহত রিংকির বাবা মা।
অনেক গোয়েন্দা সংস্থা তদন্তের দায়িত্ব ভার গ্রহন করে হত্যা কান্ডের ৩ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরেও কোন রহস্য উদ্ঘাটন সহ হত্যা কান্ডের মুল হোতাকে সনাক্ত, তথা কোন দৃশ্যমান অগ্রগতি করতে পারেন নি, ফলে এলাকার সাধারণ মানুষের আগ্রহ এখন তদন্তের দৃশ্যমান অগ্রগতি ঘিরে। তদন্তে কী কী আলামত পাওয়া গেছে, হত্যার কারণ সম্পর্কে কী তথ্য মিলেছে এবং কেউ জড়িত কি না—এসব বিষয়ে পরিষ্কার তথ্য জানতে চান স্থানীয় এলাকা বাসী।
স্থানীয় এলাকা বাসীর ভাষ্য, এত আলোচিত একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে মানুষের সামনে স্বচ্ছ তথ্য আসা জরুরি। গুজব নয়, অনুমান নয়—তারা চান প্রমাণভিত্তিক সত্য ও দৃশ্যমান ন্যায়বিচার।
গত ২০২৩ সালের ১৩ আগষ্ট থেকে —– সেপ্টেম্বর—পেরিয়ে গেছে ৩বৎসর ১ মাস। সময়ের সঙ্গে হয়তো ঘটনার অনেক স্মৃতি ম্লান হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু এই নৃশংস হত্যাকান্ডের শোক এবং মানুষের প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে।
তাই গত ২৩ আগস্ট,২০২৬ইং তারিখ সকাল ১১টায় উলিপুর উপজেলার বড় মসজিদ মোড় (গবার মোড়) এলাকায় পাণ্ডুল ইউনিয়নবাসীর উদ্যোগে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে স্থানীয় বাসিন্দারা অংশ নেন। রুকাইয়া আক্তার রিংকি হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও দ্রুত পুনঃতদন্ত এবং প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে ন্যায়বিচার নিশ্চিতের দাবিতে এ মানববন্ধন করেছেন এলাকাবাসী। মানববন্ধন শেষে উলিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়।
স্মারকলিপিতে দাবি করা হয়, হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ মো. আশাদুজ্জামান আসিফসহ দুজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করে। মামলার তদন্ত-সংক্রান্ত নথিতে রিংকির সঙ্গে আসিফের পূর্বপরিচয়, প্রেমের প্রস্তাব নিয়ে বিরোধ এবং পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে সতর্ক করার বিষয় উল্লেখ রয়েছে বলেও স্মারকলিপিতে দাবি করা হয়।
পরবর্তীতে মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদনে আসিফসহ সংশ্লিষ্টদের অব্যাহতির আবেদন করা হলে বাদীপক্ষ এতে আপত্তি জানিয়ে আদালতে নারাজি আবেদন করেন। পরে আদালত ওই আবেদন মঞ্জুর করে মামলাটি পুনঃতদন্তের জন্য সিআইডি, কুড়িগ্রামকে দায়িত্ব দেওয়ার আদেশ দেন বলে স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ অবস্থায় এলাকাবাসীর দাবি, পুনঃতদন্ত যেন কোনো ধরনের প্রভাব বা চাপমুক্ত পরিবেশে সম্পন্ন করা হয়। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন, প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং নিহতের পরিবারকে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক সহায়তা দেওয়ার দাবি জানান তারা।
উলিপুর উপজেলার পান্ডুল ইউনিয়নের তেলীপাড়া বাসীর প্রত্যাশা—তদন্ত দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে এগিয়ে নিয়ে রিংকী হত্যার প্রকৃত কারণ এবং নেপথ্যের সত্যটি জাতির সামনে তুলে ধরা সহ প্রকৃত অপরাধী যে-ই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনা ও দৃশ্য মান শাস্তির ব্যবস্থা করা।
রুকাইয়া আক্তার রিংকির কবর আজ নীরব।কিন্তু সেই নীরবতার ভেতরেই যেন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে একটি প্রশ্ন—“রিংকীর মৃত্যুতেই কি শেষ রহস্য, নাকি হত্যার আসল সত্য এখনো অন্ধকারে?”
আজকালের কন্ঠ/আর বি
আপনার মতামত লিখুন :