
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ধ্রুপদী ব্যাকরণ ও ‘সুনামধন্য প্রতিবেশী নীতি’র (Good Neighbor Policy) মূল নির্যাস নিহিত থাকে পারস্পরিক মর্যাদাবোধ, সার্বভৌমত্বের অভিন্ন স্বীকৃতি এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনস্তক্ষেপের আকাতর অঙ্গীকারের ওপর। অথচ দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক দৃশ্যপটটি বহুকালেই অপ্রতিসম ক্ষমতা-কাঠামো (Asymmetric Power Structure) এবং একপাক্ষিক মনস্তাত্ত্বিক বলয়ের দোলাচলে আবর্তিত। সাম্প্রতিক সময়ে—বিশেষ করে ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নতুন সরকার দায়িত্ব পরিগ্রহের পরবর্তী পর্বে—নয়াদিল্লির কিছু সমীকরণভিত্তিক অবস্থান ঢাকার নীতি-নির্ধারণী মহল ও জনমানসে গভীর ক্ষোভ ও অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে। কূটনীতির অভিধানে যা ‘কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ (Strategic Partnership) বলে উদযাপিত হয়, বাস্তবতার জমিনে তা প্রায়শই ভূ-রাজনৈতিক বিশ্বাসভঙ্গ কিংবা চাণক্যীয় ‘পিছন থেকে আঘাত’-এর সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন, বৈশ্বিক অপরাধতত্ত্ব এবং ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণের আলোকে সম্পর্কের এই দীর্ঘায়িত চিড় ও সংবেদনশীল ঘটনাপ্রবাহের ব্যবচ্ছেদ নিম্নে উপস্থাপিত হলো:
১. ৫ আগস্ট ২০২৬-এর ধৃষ্টতা: পলাতক আসামিকে ভূ-রাজনৈতিক মঞ্চ প্রদান ও বাংলাদেশের কড়া প্রতিবাদ
আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন ও ২০১৩ সালের দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তির (Extradition Treaty) আইনি দায়বদ্ধতাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে, গণহত্যামূলক অপরাধে ট্রাইব্যুনালে দণ্ডপ্রাপ্ত ও পলাতক আসামি শেখ হাসিনাকে ভারতের মাটিতে কেবল দীর্ঘমেয়াদি আশ্রয়ই দেওয়া হয়নি; বরং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ছড়ানোর সরাসরি সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে।
৫ আগস্ট ২০২৬—গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে—নয়াদিল্লির ‘ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব’ (FCC) ব্যবহার করে শেখ হাসিনাকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের উদ্দেশে বিশেষ অডিও বার্তা ও ভার্চয়াল সংবাদ সম্মেলন করার মঞ্চ তৈরি করে দেওয়া হয়। উক্ত সম্মেলনে তিনি বাংলাদেশের আইনি রাষ্ট্রকাঠামোকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে গণঅভ্যুত্থানকে “পরিকল্পিত শাসন পরিবর্তন” বা রেজিম চেঞ্জ হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার হুমকি প্রদান করেন।
এর তীব্র প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অত্যন্ত কঠোর ও অনমনীয় কূটনৈতিক প্রতিবাদপত্র (Lodged a strong protest) পাঠিয়েছে। ঢাকা এই ঘটনাকে “সার্বভৌমত্বের ওপর গুরুতর আঘাত” (Grievous insult to sovereignty) এবং কূটনৈতিক শিষ্টাচারের চরম লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (ICT) যে আইনি নিষেধাজ্ঞা শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ও উসকানিমূলক বক্তব্য প্রচারে স্থগিতাদেশ দিয়েছে, ভারতীয় ভূখণ্ডে বসে আয়োজিত এই প্রেস কনফারেন্স সেই আইনি কাঠামোর সরাসরি অবমাননা। ভারত সরকার একে ‘ব্যক্তিগত বা বেসরকারি আয়োজন’ (As a private media event) বলে দায় এড়াতে চাইলেও, সাউথ ব্লকের এই ভূমিকা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে এক প্রকার শত্রুভাবাপন্ন প্রচ্ছন্ন মদদ বা ‘Hostile passive compliance’ হিসেবেই গণ্য।
২. সীমান্ত হত্যা: ‘নন-লেথাল’ নীতির আড়ালে মানবাধিকারের অবমাননা
বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ (৪,১৫৬ কিলোমিটার) ও সংবেদনশীল সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (BSF) কর্তৃক নিরস্ত্র বাংলাদেশি নাগরিকদের বিচারবহির্ভূত হত্যা দ্বিপাক্ষিক বিশ্বাসের ভিতকে প্রতিনিয়ত দুর্বল করছে। বারবার ‘নন-লেথাল উইপন’ বা মারাত্মক নয় এমন অস্ত্র ব্যবহারের দ্বিপাক্ষিক প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও সীমান্তে গুলি করে হত্যা ও নির্যাতন জ্যামিতিক হারে সচল রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন (IHRL) এবং ‘রাইট টু লাইফ’ বা বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারকে খর্ব করে ভারত যে সীমান্ত নীতি বজায় রেখেছে, তা প্রতিবেশীর প্রতি চরম অবজ্ঞা এবং রোম সংবিধির (Rome Statute) বিচারে পদ্ধতিগত অপরাধের (Systemic Crime) পর্যায়ভুক্ত।
৩. ট্রানজিট ও করিডোর নীতিতে অপ্রতিসম সহযোগিতা (Asymmetric Cooperation)
বাংলাদেশ একতরফাভাবে ভারতকে সড়ক, রেল ও নৌপথে মূল ভূখণ্ড থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে ট্রানজিট এবং করিডোর সুবিধা দিলেও, বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের দাবি—নেপাল ও ভুটানের সাথে সরাসরি বাণিজ্যের জন্য কৌশলগত ‘চিকেনস নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডোর ব্যবহারের সুযোগ দিতে ভারত সর্বদা অনীহা দেখিয়ে আসছে। তাত্ত্বিকভাবে একে বলা চলে ‘ডমিনেন্স-ডিপেন্ডেন্সি মডেল’ (Dominance-Dependency Model)। ভারতের এই একচেটিয়া সুবিধা আদায় বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে, যার প্রমাণ হিসেবে অতি সম্প্রতি ট্রানজিটের জন্য শর্তযুক্ত ভারতীয় লাইন অব ক্রেডিট (LoC) বর্জন করে বাংলাদেশের নিজস্ব উদ্যোগে উন্নয়ন সহযোগীদের খোঁজার মতো নীতিগত রূপান্তর দৃশ্যমান হচ্ছে।
৪. অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন ও আকস্মিক বন্যা: হাইড্রোপলিটিক্সের মরণকামড়
আন্তর্জাতিক নদী আইন (International Water Law/Helsinki Rules) অনুযায়ী উজান ও ভাটির দেশের মধ্যে পানির সমবণ্টন এবং আগাম তথ্য আদান-প্রদান বাধ্যতামূলক। তিস্তা চুক্তিকে দীর্ঘ দেড় দশক ধরে ঝুলিয়ে রাখা এবং অভিন্ন ৫৪টি নদীর পানির হিস্যা না দেওয়া বাংলাদেশের কৃষি, অর্থনীতি ও পরিবেশগত নিরাপত্তার জন্য স্থায়ী হুমকি। তদুপরি, বর্ষা মৌসুমে আগাম সতর্কতা ও কোনো প্রকার হাইড্রোলজিক্যাল ডেটা শেয়ার না করে ভারতীয় বাঁধগুলোর (যেমন ফারাক্কা বা ডুম্বুর বাঁধ) গেট হঠাৎ খুলে দেওয়ার ফলে বাংলাদেশে যে আকস্মিক ও ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়, তা ‘হাইড্রোপলিটিক্স’ বা পানিকূটনীতির মাধ্যমে একটি রাষ্ট্রকে ভূ-প্রাকৃতিকভাবে অবদমিত রাখার অনৈতিক কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচিত।
৫. বাণিজ্য ঘাটতি ও অশুল্ক বাধা (Non-Tariff Barriers)
দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে ভারতের সাথে বাংলাদেশের ঘাটতি বর্তমানে শতকোটি ডলারের ওপরে। বাংলাদেশ ভারতকে সাফটা (SAFTA) চুক্তির আওতায় বিশাল বাজার ও শুল্কমুক্ত সুবিধা দিলেও, ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশি পণ্য প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত অশুল্ক ও আধা-শুল্ক বাধা (যেমন: অ্যান্টি-ডাম্পিং ডিউটি, কঠোর ল্যাব টেস্টিং ও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা) তৈরি করা হয়। ভারতের এই অর্থনৈতিক সুরক্ষাবাদ (Economic Protectionism) প্রমাণ করে যে, তারা বাংলাদেশকে সমমানের সার্বভৌম অর্থনৈতিক অংশীদার না ভেবে কেবল একটি নিয়ন্ত্রিত কনজিউমার মার্কেট বা পণ্যের বাজার হিসেবে দেখতে আগ্রহী।
৬. চাণক্য নীতি ও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী হস্তক্ষেপ
বিগত দেড় দশক ধরে বাংলাদেশের জনগণের ভোটাধিকার হরণ এবং একটি নির্দিষ্ট গণহত্যাকারী রেজিমকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে দিল্লির প্রকাশ্য ও পরোক্ষ কূটনৈতিক সমর্থন ছিল দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসের অন্যতম বড় ভূ-রাজনৈতিক অপরাধ। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে নস্যাৎ করে একটি স্বৈরাচারী রেজিমের পক্ষে ভারতের লবিং করার নীতি ‘কৌশলগত অন্ধত্ব’ (Strategic Blindness) তৈরি করেছিল, যা ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর এবং ২০২৬-এর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দিল্লির জন্য একটি বড় ভূ-কূটনৈতিক পরাজয় হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
তাত্ত্বিক মূল্যায়ন ও সম্পর্কের হালচাল
বাস্তববাদী তত্ত্বের (Realism) ‘হেজিমোনিক স্ট্যাবিলিটি থিওরি’ (Hegemonic Stability Theory) আলোকে বিচার করলে দেখা যায়, ভারত দক্ষিণ এশিয়ায় তার আঞ্চলিক আধিপত্য বজায় রাখতে প্রতিবেশীদের সার্বভৌম ইচ্ছাকে দমন করতে চায়। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির ‘নব্য-বাস্তববাদ’ (Neo-realism) বলে, কোনো রাষ্ট্রই তার সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় মর্যাদার প্রশ্নে চিরকাল নতজানু থাকে না। ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের পুনর্গঠন এবং ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যের যে নতুন বহুমাত্রিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে, তা দিল্লিকে অনুধাবন করতে হবে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বর্তমান হালচাল অত্যন্ত নাজুক, অবিশ্বাস ও মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনে জর্জরিত। ভারত যদি এখনো বাংলাদেশের মাটিতে পরাজিত শক্তিকে কার্ড হিসেবে ব্যবহার করে জল ঘোলা করার বা অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করে, তবে তা এই অঞ্চলে ভারতের নিজস্ব দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থকেই চরমভাবে ব্যাকফায়ার (Backfire) করবে।
অতএব, নয়াদিল্লিকে চূড়ান্তভাবে বুঝতে হবে যে, বাংলাদেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা পরাস্ত রাজনৈতিক দলের সাথে নয়, বরং স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রটির ১৮ কোটি জাগ্রত জনগণের সাথে। দণ্ডপ্রাপ্ত খুনিদের আশ্রয় দিয়ে তাদের রাজনৈতিক মঞ্চ দেওয়া, সীমান্ত হত্যা সচল রাখা এবং পানিকূটনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশকে চাপে রাখার চাণক্য নীতি পরিহার করতে হবে। পারস্পরিক সার্বভৌমত্বের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা, আন্তর্জাতিক আইনের নিঃশর্ত বাস্তবায়ন এবং সমতার ভিত্তিতেই কেবল একটি টেকসই, মর্যাদাপূর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনর্নির্মাণ সম্ভব। অন্যথায়, ভারতের এই একতরফা ভূ-রাজনৈতিক ফাটল দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার জন্য একটি স্থায়ী হুমকি হিসেবেই পরিগণিত হতে থাকবে।
লেখকঃ — প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, মানবাধিকার ও অপরাধ বিশ্লেষক এবং উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয় (সোমালিয়া)।
আপনার মতামত লিখুন :