
লক্ষ্মীপুর জেলায় মোবাইল ব্যাংকিং সেবার অবাধ ব্যবহার ও দুর্বল নজরদারির সুযোগে আশঙ্কাজনক হারে ছড়িয়ে পড়ছে অনলাইন জুয়া। বিকাশ, নগদ ও রকেটের মতো মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে সহজে টাকা লেনদেনের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণির অসাধু চক্র তরুণদের বিভিন্ন অনলাইন বেটিং ও ক্যাসিনো প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করছে। এতে সর্বস্ব হারাচ্ছেন অনেক যুবক, ভাঙছে পরিবার, বাড়ছে সামাজিক অস্থিরতা। এমনকি আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
জেলা সদরসহ রায়পুর, রামগঞ্জ, কমলনগর ও রামগতি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অনুসন্ধানে জানা গেছে, একটি স্মার্টফোন ও মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট থাকলেই সহজে অনলাইন ক্যাসিনো, ক্রিকেট বেটিং, তাস ও লুডুভিত্তিক বিভিন্ন জুয়ার সাইটে অংশ নেওয়া যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গোপন গ্রুপ, মেসেঞ্জার ও টেলিগ্রাম চ্যানেলের মাধ্যমে এসব সাইটের লিংক ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। শুরুতে অল্প টাকায় লাভের প্রলোভন দেখানো হলেও পরে বড় অঙ্কের অর্থ হারিয়ে অনেকে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন।
অভিভাবকদের অভিযোগ, অনলাইন জুয়ার নেশায় পড়ে অনেক শিক্ষার্থী ও তরুণ পরিবার থেকে টাকা চুরি করছে, বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে ধার নিচ্ছে, এমনকি সুদের ওপর টাকা এনে খেলছে। টাকা হারানোর পর তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে। অনেক পরিবারে সৃষ্টি হচ্ছে কলহ, নষ্ট হচ্ছে পড়াশোনা, ভেঙে যাচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
রায়পুর উপজেলার এক শোকাহত পিতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমার ছেলে অনলাইন জুয়ার কারণে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে। ঋণের চাপে ও মানসিক যন্ত্রণায় শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে। এখন আমি এর বিচার কার কাছে চাইবো?”
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, এই একটি বক্তব্যই অনলাইন জুয়ার ভয়াবহতার বাস্তব চিত্র তুলে ধরার জন্য যথেষ্ট। দ্রুত অর্থ উপার্জনের আশায় অনেক তরুণ এই ফাঁদে পা দিয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করছে।
লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “অনলাইন জুয়া এখন নীরব সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সহজ লেনদেনের কারণে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এ বিষয়ে আরও সচেতন হতে হবে।”
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কিছু অসাধু মধ্যস্থতাকারী কমিশনের বিনিময়ে জুয়ার সাইটে টাকা জমা ও উত্তোলনে সহায়তা করছে। ফলে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে অবাধে পরিচালিত হচ্ছে এ অবৈধ ব্যবসা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্তে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সচেতন নাগরিকদের দাবি, অনলাইন জুয়ার বিস্তার রোধে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এবং প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে তরুণদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, সন্দেহজনক লেনদেনের ওপর কঠোর নজরদারি এবং জুয়ার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। তা না হলে প্রযুক্তির সুবিধাই সমাজের জন্য ভয়াবহ সামাজিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আজকালের কন্ঠ/আর বি
আপনার মতামত লিখুন :