উত্তরাধিকার কর: বৈষম্য কমানোর হাতিয়ার, নাকি নতুন আর্থিক চাপ? | Daily AjKaler Kontho

উত্তরাধিকার কর: বৈষম্য কমানোর হাতিয়ার, নাকি নতুন আর্থিক চাপ?


নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশের সময় : এপ্রিল ২৪, ২০২৬, ২:৫৭ অপরাহ্ন
উত্তরাধিকার কর: বৈষম্য কমানোর হাতিয়ার, নাকি নতুন আর্থিক চাপ?

বাংলাদেশের আসন্ন ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটকে ঘিরে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব আলোচনায় এসেছে—উত্তরাধিকার কর (Inheritance Tax) প্রবর্তন।

সহজভাবে বললে, কোনো ব্যক্তি মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া সম্পদ উত্তরাধিকারীরা গ্রহণের সময় যে কর প্রদান করবেন, সেটিই উত্তরাধিকার কর। উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে এই কর চালু থাকলেও, বাংলাদেশে এটি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। তবে এবার এটি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নতুন করে আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতার ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন হারে এই কর আরোপের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে কার্যকর হতে পারে।

প্রস্তাবিত কর কাঠামো-নিকটাত্মীয় (বাবা-মা, ভাইবোন):
* ১ কোটি টাকা পর্যন্ত: ১%
* পরবর্তী ৫ কোটি (মোট ৬ কোটি): ২%
* পরবর্তী ৫ কোটি (মোট ১১ কোটি): ৩%
* ১১ কোটির বেশি: ৫%

দূরবর্তী আত্মীয় (দাদা-দাদি, নানা-নানি, শ্বশুর-শাশুড়ি):
* ১ কোটি পর্যন্ত: ৩%
* পরবর্তী ৫ কোটি: ৫%
* পরবর্তী ৫ কোটি: ৭%
* ১১ কোটির বেশি: ১০%

সরকারের উদ্দেশ্য ও সম্ভাব্য সুফল-

সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকে এই করের মূল লক্ষ্য দুটি—রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং সম্পদের বৈষম্য হ্রাস। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের একটি বড় অংশের সম্পদ প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই পরিবারের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে, যা অর্থনৈতিক অসমতা বাড়ায়। উত্তরাধিকার কর সেই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে একটি কার্যকর নীতিগত হাতিয়ার হতে পারে।

এছাড়া, মৃত ব্যক্তির নামে সম্পদ রেখে কর ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা কমানো এবং অর্থনীতিকে আরও স্বচ্ছ করার ক্ষেত্রেও এটি সহায়ক হতে পারে। কমিটির হিসাব অনুযায়ী, এই কর চালু হলে মোট আয়কর আদায় ১% থেকে ৩% পর্যন্ত বাড়তে পারে এবং অতিরিক্ত ১৪ থেকে ৪২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে।

চ্যালেঞ্জ ও বিতর্ক-

তবে এই প্রস্তাবের বিপরীত দিকও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

প্রথমত, দ্বৈত করারোপের প্রশ্ন—যে সম্পদের ওপর জীবদ্দশায় আয়কর দেওয়া হয়েছে, সেটির ওপর আবার উত্তরাধিকারসূত্রে কর আরোপ কতটা ন্যায্য, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
দ্বিতীয়ত, অনেক উত্তরাধিকারীর জন্য এটি হঠাৎ একটি বড় আর্থিক চাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে। কর পরিশোধ করতে গিয়ে কেউ কেউ পারিবারিক সম্পত্তি বিক্রিতে বাধ্য হতে পারেন, যা সামাজিক ও পারিবারিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।তৃতীয়ত, বাংলাদেশের বর্তমান ভূমি ও সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা—রেকর্ডের বাস্তবায়নকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

নীতিগত ভারসাম্যের প্রয়োজন-

এখানে মূল প্রশ্নটি “কর আরোপ করা হবে কি না”—এতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং “কীভাবে করা হবে”—সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
যদি এই কর প্রবর্তন করা হয়, তাহলে কিছু বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি—
* একটি নির্দিষ্ট সীমার নিচে সম্পদ করমুক্ত রাখা
* ধাপে ধাপে করহার (progressive taxation) নির্ধারণ
* পারিবারিক বসতভিটা ও ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য সুরক্ষা ব্যবস্থা
* স্বচ্ছ ও ডিজিটাল সম্পদ রেকর্ড ব্যবস্থা নিশ্চিত করা

আজকালের কন্ঠ/আর বি