
লক্ষ্মীপুরের রামগতি ও কমলনগর উপজেলায় প্রায় ৭০টি অবৈধ ইটভাটার কার্যক্রম বন্ধে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের হুইপসহ দুই সংসদ সদস্য। কৃষিজমির উর্বরতা নষ্ট, বায়ুদূষণ, জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি ও গ্রামীণ সড়কের ক্ষয়ক্ষতি রোধে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টুর কাছে পৃথক চিঠি দিয়েছেন লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য বীথিকা বিনতে হোসাইন।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) দুই সংসদ সদস্যের পাঠানো চিঠিগুলো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়। চিঠিতে অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান, কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি কাটা বন্ধ, অননুমোদিত বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, নিষিদ্ধ জ্বালানির ব্যবহার বন্ধ এবং অতিরিক্ত ভারবাহী যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণের দাবি জানানো হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রামগতি ও কমলনগর উপজেলায় অবৈধ ইটভাটা বন্ধের দাবিতে ২০২৪ সালে উচ্চ আদালতে একটি মামলা করা হয়। একই বিষয়ে ২০২৬ সালেও আরেকটি মামলা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে মামলা ও স্থানীয়দের প্রতিরোধের পরও ইটভাটাগুলোর কার্যক্রম বন্ধ করা যায়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এ পরিস্থিতিতে দুই সংসদ সদস্যের জরুরি চিঠি নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি করেছে।
কৃষিজমি ও সড়ক নিয়ে উদ্বেগ
পরিবেশমন্ত্রীকে দেওয়া চিঠিতে হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান উল্লেখ করেন, রামগতি ও কমলনগর উপজেলার অধিকাংশ মানুষ কৃষিনির্ভর। কৃষিজমি স্থানীয় মানুষের জীবিকা, খাদ্য উৎপাদন ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। কিন্তু কিছু অসাধু ব্যক্তি আইন ও পরিবেশগত বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি কেটে ইট তৈরির কাজে ব্যবহার করছেন। এতে জমির উর্বরতা ও উৎপাদনক্ষমতা কমছে এবং কৃষকেরা দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
চিঠিতে আরও বলা হয়, অবৈধ ইটভাটা থেকে নির্গত ধোঁয়া, ধুলাবালি ও অন্যান্য দূষণকারী উপাদান বায়ুদূষণ বাড়াচ্ছে। এতে জনস্বাস্থ্য, স্থানীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকলে কৃষি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাও কঠিন হয়ে পড়বে।
ভারী যানবাহনের কারণে গ্রামীণ সড়কের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টিও তুলে ধরেন হুইপ নিজান। তাঁর চিঠিতে বলা হয়, কৃষিজমি থেকে মাটি কেটে ইটভাটায় নেওয়া এবং তৈরি ইট পরিবহনে অতিরিক্ত মালামালবোঝাই ট্রাক্টর-টলি, ট্রাক ও অন্যান্য ভারী যানবাহন ব্যবহারের ফলে সড়কে ভাঙন, খানাখন্দ ও গর্ত তৈরি হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে সরকারি ব্যয় বাড়ছে। একই সঙ্গে ধুলাবালি, শব্দদূষণ ও সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।
জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ক্ষতির আশঙ্কা
অন্যদিকে, সংসদ সদস্য বীথিকা বিনতে হোসাইন তাঁর চিঠিতে রামগতি ও কমলনগরে প্রায় ৭০টি অবৈধ ইটভাটার কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এসব ইটভাটার কালো ধোঁয়া ও ক্ষতিকর বায়ুদূষকের কারণে স্থানীয় মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
চিঠিতে বলা হয়, গর্ভবতী নারী, নবজাতক, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা বায়ুদূষণের কারণে বিশেষভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। ইটভাটার ধোঁয়া ও ধুলাবালিতে ফলজ গাছের ফুল, কচি ফল ও পরিপক্ব ফল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি ইট তৈরিতে ব্যবহার এবং জ্বালানি হিসেবে গাছ ও কাঠ পোড়ানোর ফলে কৃষি উৎপাদন ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে বলে দাবি করেন তিনি। পাশাপাশি মাটি ও ইট পরিবহনে ব্যবহৃত ভারী যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল স্থানীয় সড়কব্যবস্থার ক্ষতি করছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নের দাবি
বীথিকা বিনতে হোসাইন অবৈধ ইটভাটায় ব্যবহৃত বিদ্যুৎ সংযোগ যাচাই করে অননুমোদিত সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার অনুরোধও করেছেন তিনি।
এ ছাড়া মাটি ও ইট পরিবহনে স্থানীয় সড়কের অননুমোদিত ব্যবহার বন্ধ, অতিরিক্ত ভারবাহী যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ, নিষিদ্ধ জ্বালানির ব্যবহার প্রতিরোধ এবং দূষণের প্রভাব নিরূপণে পরিবেশগত পরিদর্শন পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন এই সংসদ সদস্য।
দুই সংসদ সদস্যই অবৈধ ইটভাটার তালিকা তৈরি করে সরেজমিন তদন্ত, পরিবেশগত ছাড়পত্র ও আইনগত অনুমোদন যাচাই এবং আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি বন্ধ করা ইটভাটা পুনরায় চালু হওয়া ও নতুন করে অবৈধ ইটভাটা স্থাপন ঠেকাতে পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের সমন্বিত নজরদারির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা।
এখন নজর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপে
হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন। বীথিকা বিনতে হোসাইনও কৃষিজমি, সড়ক, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় উত্থাপিত বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার অনুরোধ জানান।
দুই সংসদ সদস্যের চিঠির অনুলিপি পরিবেশ অধিদপ্তর, লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসক এবং রামগতি ও কমলনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে। বীথিকা বিনতে হোসাইনের চিঠির অনুলিপি চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার, সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা এবং সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছেও পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সরেজমিন তদন্ত করে ইটভাটাগুলোর বৈধতা যাচাই এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয় কি না, সেটিই দেখার বিষয়। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শুধু চিঠি বা আশ্বাসে সীমাবদ্ধ না থেকে কৃষিজমি, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
আপনার মতামত লিখুন :