১৭ দেশে ২৫ সফর, ১৭ বছর পেকুতে: ‘পেকু ফিরোজ’কে ঘিরে প্রশ্নের পাহাড় | Daily AjKaler Kontho

১৭ দেশে ২৫ সফর, ১৭ বছর পেকুতে: ‘পেকু ফিরোজ’কে ঘিরে প্রশ্নের পাহাড়


নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশের সময় : অগাস্ট ১৪, ২০২৬, ১২:০৯ অপরাহ্ন
১৭ দেশে ২৫ সফর, ১৭ বছর পেকুতে: ‘পেকু ফিরোজ’কে ঘিরে প্রশ্নের পাহাড়

গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সংস্থাপন) কাজী মো. ফিরোজ হাসানের দীর্ঘ চাকরিজীবন ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রায় ২৮ বছরের চাকরিজীবনে দীর্ঘ সময় একই গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে দায়িত্ব পালন, ধারাবাহিক বিদেশ সফর এবং প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগকে কেন্দ্র করে তাকে ঘিরে উঠেছে নানা প্রশ্ন।

দাপ্তরিক নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, চাকরিজীবনের বড় একটি অংশ তিনি ঢাকায় এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ প্রকিউরমেন্ট, এস্টেট অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন ইউনিট (পেকু)-তে কাটিয়েছেন। একইসঙ্গে সরকারি অর্থায়নে অন্তত ১৭টি দেশে প্রায় ২৫ বার প্রশিক্ষণ ও সফরে অংশ নেওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে।

সহকর্মীদের একাংশের দাবি, দীর্ঘদিন একই গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে দায়িত্ব পালন এবং বারবার বিদেশ সফরের সুযোগ পাওয়ার বিষয়টি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

চাকরিজীবনের বেশিরভাগ সময় ঢাকায়

সরকারি নথি অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালের ২৫ জানুয়ারি খুলনা গণপূর্ত বিভাগ-১-এ স্টাফ অফিসার হিসেবে চাকরিজীবন শুরু করেন কাজী ফিরোজ হাসান। দেড় মাস পরই তাকে সাভার গণপূর্ত বিভাগে বদলি করা হয়।

২০০১ সালে তিনি ঢাকার পিপিসি বিভাগে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন। পরে একই বিভাগে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন দীর্ঘ সময়। ২০০৯ সালে অল্প সময়ের জন্য নেত্রকোনা গণপূর্ত বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও একই বছরের ডিসেম্বরেই আবার ফিরে আসেন পেকু বিভাগে।

এরপর ২০০৯ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৭ সালের নভেম্বর পর্যন্ত নির্বাহী প্রকৌশলী এবং ২০১৭ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে পেকু সার্কেলে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৫ সালে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সংস্থাপন ও সমন্বয়) পদেও দায়িত্ব পান।

সব মিলিয়ে প্রায় ১৭ বছর ধরে একই ক্রয় ও প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত থাকায় গণপূর্তের ভেতরে তিনি ‘পেকু ফিরোজ’ নামেই পরিচিত হয়ে ওঠেন।

কেন গুরুত্বপূর্ণ পেকু?

গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকিউরমেন্ট, এস্টেট অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন ইউনিট (পেকু) সংস্থাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ। সরকারি ক্রয়, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন অবকাঠামোগত কার্যক্রমে এ ইউনিটের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ সময় একই ইউনিটে দায়িত্ব পালনের ফলে প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব বাড়ে, যা ক্ষমতার ভারসাম্য ও বদলি নীতির ক্ষেত্রে প্রশ্ন তৈরি করে।

তবে কাজী ফিরোজ হাসান এসব অভিযোগ নাকচ করে বলেছেন, তিনি মূলত বিভিন্ন প্রকল্পভিত্তিক কাজে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং নিয়মিত ওয়ার্কিং ডিভিশনের দায়িত্বে ছিলেন না। তার দাবি, এসব দায়িত্ব ছিল তুলনামূলকভাবে কম সুবিধাজনক ও কম আকর্ষণীয়।

বিদেশ সফরের দীর্ঘ তালিকা

নথি অনুযায়ী, ২০০৯ সালে মালয়েশিয়ায় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তার বিদেশ সফরের অধ্যায় শুরু হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে সরকারি অর্থায়নে জাপান, মিসর, ইতালি, ডেনমার্ক, সিঙ্গাপুর, নেদারল্যান্ডস, রাশিয়া, স্পেন, ভারত, তুরস্ক, বেলজিয়াম, গ্রিস, ফিনল্যান্ড ও বুলগেরিয়াসহ মোট ১৭টি দেশে সফর ও প্রশিক্ষণে অংশ নেন।

প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তুর মধ্যে ছিল পাবলিক প্রকিউরমেন্ট, মেরিন টেকনোলজি, অকুপেশনাল সেফটি, লাইব্রেরি ম্যানেজমেন্ট, সেফটি ডিভাইস কোয়ালিটি, লিফট পারফরম্যান্স এবং ওয়াটার ফাউন্টেন ব্যবস্থাপনা।

চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে সেন্ট্রাল এসি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণে যাওয়ার কথা থাকলেও বিমানবন্দরে অসুস্থ হয়ে পড়ায় শেষ পর্যন্ত সফরটি বাতিল হয় বলে জানিয়েছেন তিনি।

তবে বিদেশ সফরের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে কাজী ফিরোজ হাসান বলেন, “আমি এতগুলো প্রশিক্ষণে যাইনি। আমার চেয়েও বেশি বিদেশ সফর করেছেন এমন কর্মকর্তা গণপূর্তে আছেন।”

‘ওয়ার্কিং ডিভিশনে অভিজ্ঞতা কম’ অভিযোগ

গণপূর্তের একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, দীর্ঘদিন প্রকিউরমেন্ট ও প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ইউনিটে থাকায় মাঠপর্যায়ের নির্মাণ ও বাস্তবায়ন কার্যক্রমে তার অভিজ্ঞতা তুলনামূলক কম।

তাদের দাবি, বিভিন্ন সময়ে তিনি ওয়ার্কিং ডিভিশনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছেন।

রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক যোগাযোগ ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, সাবেক সচিব মো. নজরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠতার সূত্র ধরে তিনি মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করতেন। এমনকি কর্মকর্তা পদায়নে লটারির পদ্ধতি চালুর পেছনেও তার ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

মূল প্রশ্ন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশ সফর বা প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া নিজেই কোনো অনিয়মের প্রমাণ নয়। সরকারি কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে যখন একই কর্মকর্তার ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় গুরুত্বপূর্ণ ক্রয়সংক্রান্ত ইউনিটে অবস্থান, ধারাবাহিক বিদেশ সফর, প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ এবং বদলি নীতির ব্যতিক্রমী চিত্র একসঙ্গে সামনে আসে, তখন বিষয়গুলো নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এখন প্রশ্ন উঠছে—

  • বিদেশ সফরগুলোর মনোনয়ন কীভাবে হয়েছে?
  • সফরগুলোর মোট সরকারি ব্যয় কত?
  • প্রশিক্ষণ থেকে অর্জিত জ্ঞান কতটা প্রতিষ্ঠানের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে?
  • একই কর্মকর্তা দীর্ঘদিন পেকুতে থাকার অনুমোদন কীভাবে দেওয়া হয়েছে?
  • বদলি ও পদায়ন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে তার কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব ছিল কি না?

এসব প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে কেবল নথিভিত্তিক, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ প্রশাসনিক তদন্তের মাধ্যমে। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণপূর্ত অধিদপ্তরে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার প্রশ্নে কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আজকালের কন্ঠ/আর বি