
চুয়াডাঙ্গায় প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি) আয়োজিত ‘নির্বাচনকালীন সাংবাদিকতা’ বিষয়ক দুই দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালাকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন বৈষম্য, চরম অব্যবস্থাপনা ও নগ্ন রাজনীতিকরণের অভিযোগ উঠেছে। মূলধারার সক্রিয় সাংবাদিক ও একটি বৃহৎ সংগঠনের সদস্যদের পরিকল্পিতভাবে বাদ দিয়ে চিহ্নিত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ‘সাংবাদিক’ সাজিয়ে প্রশিক্ষণে অন্তর্ভুক্ত করায় জেলার সংবাদকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
গত ৪ ফেব্রুয়ারি চুয়াডাঙ্গা সার্কিট হাউজ অডিটোরিয়ামে এই প্রশিক্ষণের উদ্বোধন করা হয়। অভিযোগ উঠেছে, পিআইবি অত্যন্ত গোপনে কেবল ‘চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাব’ নামক একটি সংগঠনের সদস্যদের নিয়ে এই আয়োজন সাজিয়েছে। পক্ষান্তরে, ‘চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রেসক্লাব’ এবং জাতীয় গণমাধ্যমে কর্মরত অনেক সক্রিয় সংবাদকর্মীকে এই আয়োজন সম্পর্কে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখা হয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পেশাদার সাংবাদিকদের সুযোগ না দিয়ে প্রশিক্ষণে ঠাঁই দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সক্রিয় নেতাকর্মীদের। প্রশিক্ষণার্থীদের তালিকায় রয়েছেন জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি, আওয়ামী লীগের সক্রিয় কর্মী ও সমর্থক হিসেবে পরিচিত বেশ কয়েকজন। এমনকি জেলা জামায়াতের প্রচার সম্পাদকও সাংবাদিক কোটায় এই প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছেন। সরকারি অর্থ ব্যয় করে অ-সাংবাদিক ও রাজনৈতিক কর্মীদের এমন প্রশিক্ষণের সুযোগ করে দেওয়া নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
যমুনা টিভির জেলা প্রতিনিধি জিসান আহমেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “স্থানীয় পত্রিকায় দেখলাম পিআইবি এ ধরনের একটি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু আমরা কিছুই জানি না। সেখানে মূলধারার কতজন একটিভ সাংবাদিক ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।”
চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও ডিবিসি টেলিভিশনের জেলা প্রতিনিধি কামরুজ্জামান সেলিম বলেন, “জেলায় দুইটা প্রেসক্লাব। ক্লাবের বাইরেও অনেক সক্রিয় এবং মূলধারার পত্রিকা ও টেলিভিশনের সাংবাদিক আছে। তাদেরকে বাদ দিয়ে এই ধরনের সরকারি আয়োজন কীভাবে সম্ভব? এটা মেনে নেওয়া যায় না। এ বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত ও স্বার্থান্বেষী যারা এই কাজটি করেছে তাদের শাস্তি চাই।”
উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকরাও এই বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। জীবননগর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক রিপন হোসেন বলেন, “এটা স্পষ্ট বৈষম্য। আমাদেরকে কিছুই জানানো হয়নি। আমরা এই অনিয়মের তদন্ত চাই।” দর্শনা প্রেসক্লাবের মনিরুজ্জামান ধীরু আক্ষেপ করে বলেন, “আমাদেরকে বারবার কেন আলাদা করা হয়? ৫ আগস্টের আগেও যা ছিল, এখনো তাই করা হচ্ছে। আমরা এই বৈষম্য থেকে মুক্তি পাব কবে?”
আজকের পত্রিকার চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি মেহেরাব্বিন সানভী পিআইবি মহাপরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগে প্রশ্ন তুলেছেন, “ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পরও কি আপনি আমাদের ওপর এই রাজনীতিকরণ সাংবাদিকতা চাপিয়ে দিচ্ছেন? সরকারি অর্থ ব্যয় করে রাজনৈতিক কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার দায় পিআইবি-কে অবশ্যই নিতে হবে।”
চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি মানিক আকবর ও সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান সেলিম এক যৌথ বিবৃতিতে জানান, পিআইবি একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হয়েও সুনির্দিষ্ট একটি সংগঠনের ‘লেজুরবৃত্তি’ করছে। তারা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরের সাংবাদিক সমাজ মনে করছে, পিআইবি-র মতো প্রতিষ্ঠানকে বিতর্কিত করার পেছনে স্থানীয় কিছু স্বার্থান্বেষী মহল ও পিআইবি-র কিছু কর্মকর্তা জড়িত। এই বৈষম্য নিরসন না হলে পেশাদার সাংবাদিকরা কঠোর কর্মসূচির ডাক দেবেন বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
আজকালের কন্ঠ/ আর এস/পি
আপনার মতামত লিখুন :