পাঁচ সাংবাদিক হত্যার বিচার দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছেন ময়মনসিংহ অঞ্চলের সাংবাদিকরা | Daily AjKaler Kontho

পাঁচ সাংবাদিক হত্যার বিচার দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছেন ময়মনসিংহ অঞ্চলের সাংবাদিকরা


মোঃ আমিনূর ইসলাম রাব্বি, ময়মনসিংহ ব্যুরো প্রকাশের সময় : অক্টোবর ২৮, ২০২৬, ১১:২২ পূর্বাহ্ন
পাঁচ সাংবাদিক হত্যার বিচার দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছেন ময়মনসিংহ অঞ্চলের সাংবাদিকরা

ময়মনসিংহ অঞ্চলে গত তিন বছরে পাঁচ সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি এবং গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছেন সাংবাদিকরা। একের পর এক হত্যাকাণ্ড, পেশাগত দায়িত্ব পালনে হুমকি এবং বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে সাত দফা প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশ।

আগামী ২ নভেম্বর সকাল ১১টায় নেত্রকোনা জেলা প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে এ আন্দোলন শুরু হবে। পর্যায়ক্রমে জামালপুর জেলা ও ময়মনসিংহ নগরীতেও কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা রয়েছে সংগঠনটির।

আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছেন পাঁচ নিহত সাংবাদিক—নেত্রকোনার দুর্গাপুরের লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির, জামালপুরের বকশীগঞ্জের গোলাম রব্বানী নাদিম, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শেলু আকন্দ, গাজীপুরে নিহত দৈনিক প্রতিদিনের কাগজের স্টাফ রিপোর্টার আসাদুজ্জামান তুহিন এবং ময়মনসিংহ নগরীতে নিহত সাংবাদিক স্বপন ভট্টাচার্য।

পাঁচ হত্যাকাণ্ডের বিচার ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশের উদ্যোগে পাঁচ সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্‌ঘাটন, মামলাগুলোর সর্বশেষ অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে ধারাবাহিক আন্দোলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ময়মনসিংহ অঞ্চলের চার জেলায় সাংবাদিকদের করা হুমকিসংক্রান্ত সাধারণ ডায়েরি (জিডি), অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে থানা-পুলিশের নেওয়া পদক্ষেপ এবং পাঁচ সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়ার বর্তমান অবস্থা খতিয়ে দেখতে তিনজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিককে নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

কমিটিকে ১৫ দিনের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্তে চার জেলায় সাংবাদিকদের করা হুমকির জিডির সংখ্যা, অভিযোগের ধরন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পুলিশের গৃহীত ব্যবস্থা এবং পাঁচটি হত্যা মামলার অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে। পাশাপাশি সাংবাদিকদের নিরাপত্তা চেয়ে করা অভিযোগের পর যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল কি না, তা-ও খতিয়ে দেখার কথা রয়েছে।

আলিফ ফকির হত্যাকাণ্ড ঘিরে নিরাপত্তার প্রশ্ন
নেত্রকোনার দুর্গাপুরে নিহত সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরের হত্যাকাণ্ড ঘিরে সাংবাদিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, হত্যার আগে তিনি নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন এবং এর আগে হামলার শিকার হয়েছিলেন বলেও জানা গেছে।

পূর্ববর্তী হামলার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র ছিল কি না, তাঁর পেশাগত কর্মকাণ্ডের কারণে তিনি হুমকির মুখে পড়েছিলেন কি না এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী পদক্ষেপ নিয়েছিল—এসব বিষয় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

বিচারহীনতার আশঙ্কা, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ।
সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের বিচার বিলম্বিত হলে অপরাধীদের মধ্যে দায়মুক্তির মনোভাব তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, দুর্নীতি ও অপরাধের সংবাদ প্রকাশ এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য উদ্‌ঘাটনের কাজ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

তবে পাঁচটি হত্যাকাণ্ডের প্রতিটি মামলার তদন্ত, আসামিদের গ্রেপ্তার, অভিযোগপত্র দাখিল এবং বিচার শুরুর সর্বশেষ অবস্থা আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি। এ কারণে মামলাভিত্তিক অগ্রগতি প্রকাশ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি তুলেছে সংগঠনটি।

তিন জেলায় কর্মসূচি, সাত দফা দাবিতে আন্দোলন।
ঘোষিত কর্মসূচির প্রথম ধাপে আগামী ২ নভেম্বর সকাল ১১টায় নেত্রকোনা জেলা প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। অংশগ্রহণকারী সাংবাদিকদের সুবিধার্থে সকাল ১০টায় ময়মনসিংহ নগরীর পাটগুদাম ব্রিজ মোড় থেকে দুটি বাস ছাড়ার কথা জানিয়েছেন আয়োজকেরা। বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকেও সাংবাদিকেরা নিজস্ব পরিবহনে কর্মসূচিতে অংশ নেবেন।

সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মোঃ খায়রুল আলম রফিক বলেন, সাংবাদিক হত্যা ও নির্যাতনের বিচার নিশ্চিত করা না গেলে স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং গণমাধ্যমকর্মীদের পেশাগত নিরাপত্তা আরও হুমকির মুখে পড়বে। প্রতিহিংসা নয়, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাই তাঁদের আন্দোলনের মূল লক্ষ্য।

যেসব দাবিতে আন্দোলন-
আন্দোলন থেকে পাঁচ সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত, জড়িত ও পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার, বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হবে। পাশাপাশি সাংবাদিকদের হুমকিসংক্রান্ত অভিযোগ দ্রুত তদন্ত, চার জেলায় দায়ের করা জিডির পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশের ভূমিকা পর্যালোচনা এবং ঝুঁকিতে থাকা গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে।

সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশ দল-মত ও সাংগঠনিক বিভেদ ভুলে সব সাংবাদিক সংগঠন এবং গণমাধ্যমকর্মীকে ঘোষিত কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

পাঁচ সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে ঘোষিত এ আন্দোলন কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখবে, তা নির্ভর করবে সাংবাদিক সমাজের ঐক্য, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন, সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর অগ্রগতি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার বিভাগের কার্যকর পদক্ষেপের ওপর।