তদারকিতে অনিয়মের অভিযোগ, উদ্বোধনের পরই বিপিসির ৬০ কোটি টাকার ভবনে ফাটল | Daily AjKaler Kontho

তদারকিতে অনিয়মের অভিযোগ, উদ্বোধনের পরই বিপিসির ৬০ কোটি টাকার ভবনে ফাটল


নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশের সময় : অগাস্ট ২৪, ২০২৬, ৫:৩৩ অপরাহ্ন
তদারকিতে অনিয়মের অভিযোগ, উদ্বোধনের পরই বিপিসির ৬০ কোটি টাকার ভবনে ফাটল

চট্টগ্রামে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) নিজস্ব সদর দপ্তর নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পাঁচতলা ভবনটি উদ্বোধনের পর প্রথম বর্ষাতেই বিভিন্ন কক্ষে পানি ঢোকা এবং ভবনের একাধিক স্থানে ফাটল দেখা দেওয়ায় নির্মাণকাজের মান ও প্রকল্প তদারকিতে থাকা কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে প্রকল্প পরিচালক ও বিপিসির উপমহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা) প্রকৌশলী মো. আপেল মামুনের বিরুদ্ধে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা এবং নির্মাণকাজের বিষয়ে ইতিবাচক প্রতিবেদন দেওয়ার বিনিময়ে কমিশন নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

বিপিসি সূত্রের দাবি, ভবন নির্মাণের পুরো প্রক্রিয়ায় প্রকৌশলী মো. আপেল মামুন তদারকির দায়িত্বে ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, নির্মাণকাজের বিভিন্ন ধাপে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক সমঝোতার মাধ্যমে কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ অনিয়মের সঙ্গে আরও কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা থাকতে পারে বলেও দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে প্রকল্পটির আর্থিক ও কারিগরি বিষয়গুলো নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি উঠেছে।

দীর্ঘদিন ভাড়া ভবনে কার্যক্রম পরিচালনার পর বিপিসির নিজস্ব সদর দপ্তর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। চট্টগ্রাম নগরীর জয়পাহাড় এলাকায় পাঁচতলা ইস্পাত কাঠামোর ভবনটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৬০ কোটি টাকা। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর সেখানে বিপিসির সদর দপ্তরের কার্যক্রম স্থানান্তর করা হয়।

গত ১০ জুলাই নতুন ভবনে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। এরপর ১২ জুলাই থেকে সেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে অফিস কার্যক্রম শুরু হয়। তবে অফিস শুরুর প্রথম দিনেই বৃষ্টির পানি ভবনের বিভিন্ন কক্ষে ঢুকে পড়ে। পানি ঠেকাতে ভবনের বিভিন্ন অংশে ত্রিপল ব্যবহার করতে হয়।

প্রায় ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত নতুন সরকারি ভবনে অফিস শুরুর পরপরই এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও অসন্তোষ দেখা দেয়। দীর্ঘদিনের ভাড়া ভবনের বিড়ম্বনা কাটিয়ে নিজস্ব সদর দপ্তরে ওঠার পর এমন ঘটনায় প্রকল্পটির নির্মাণমান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

ভবনে পানি ঢোকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন প্রকল্প পরিচালক মো. আপেল মামুন। তবে তিনি নির্মাণকাজের মান নিয়ে কোনো সমস্যা হয়নি বলে দাবি করেছেন।

তাঁর ভাষ্য, ভবনের কাচে বিশেষ ধরনের আঠা ব্যবহার না করায় বৃষ্টির পানি প্রবেশ করেছে। বিষয়টি সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

পানি প্রবেশের বিষয়টি সামাল দেওয়ার আগেই ভবনের উত্তর পাশের অন্তত তিনটি স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে বলে জানা গেছে। সরেজমিনে এসব ফাটলের অস্তিত্ব দেখা গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এর আগেও ভবনের বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। পরে সেগুলো পুডিং ও প্লাস্টারের মাধ্যমে মেরামত করা হয় বলে জানা গেছে।

তবে প্রকল্প পরিচালক মো. আপেল মামুন এসব ফাটলকে বড় ধরনের ত্রুটি হিসেবে দেখছেন না। তাঁর দাবি, ভবনটি ইস্পাত কাঠামোয় নির্মিত হওয়ায় ইস্পাত কাঠামো ও সিমেন্টের বিভিন্ন অংশের সংযোগস্থলে সূক্ষ্ম ফাটল দেখা দিতে পারে। এগুলো বড় ধরনের ফাটল নয় এবং পুডিং ও প্লাস্টারের মাধ্যমে মেরামত করা হয়েছে।

ভবন নির্মাণের দায়িত্ব পাওয়া ইউনাইটেড করপোরেশনের মালিক মো. আমিনও ফাটলের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, ইস্পাত কাঠামোর কারণে কিছু জায়গায় ফাটলের মতো দেখা দিয়েছে। সেগুলো পুডিং দিয়ে মেরামত করা হচ্ছে এবং এতে মূল ভবনের কোনো ক্ষতি হবে না।

প্রকৌশল ও নির্মাণসংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন একটি সরকারি ভবনে উদ্বোধনের পরপরই পানি প্রবেশ এবং একাধিক স্থানে ফাটল দেখা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

তাদের মতে, ভবনের নকশা, ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রীর মান, কাঠামোগত নিরাপত্তা, কাজের মান এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি।

একই সঙ্গে প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয়, ঠিকাদারি প্রক্রিয়া, বিল পরিশোধ ও প্রকল্প পরিচালকের তদারকির বিষয়গুলোও নিরপেক্ষ কারিগরি ও আর্থিক অডিটের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিপিসি ১৯৯০ সাল থেকে চট্টগ্রামে ভাড়া ভবনে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। প্রথমে আগ্রাবাদের হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন ভবনে এবং পরে ২০০১ সাল থেকে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ভবনে সদর দপ্তরের কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছিল।

দীর্ঘ প্রায় সাড়ে তিন দশক পর চট্টগ্রামের জয়পাহাড় এলাকায় নিজস্ব সদর দপ্তর পায় প্রতিষ্ঠানটি। নতুন ভবনটিতে প্রায় ১৮০ কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাজ করার কথা।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর নিজস্ব ভবন পেলেও প্রথম বর্ষাতেই পানি প্রবেশ এবং দেয়ালে ফাটলের ঘটনায় পুরো প্রকল্পের বাস্তবায়ন ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

বিপিসি দেশের জ্বালানি খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। এমন একটি প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর নির্মাণে পানি প্রবেশ ও ফাটলের মতো ত্রুটি দেখা দেওয়াকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাদের দাবি, প্রকল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নির্মাণকাজ, ব্যয়, ঠিকাদারি প্রক্রিয়া, ব্যবহৃত সামগ্রী, বিল পরিশোধ এবং তদারকির বিষয়গুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক।

পাশাপাশি প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মো. আপেল মামুনের বিরুদ্ধে ওঠা কমিশন-বাণিজ্য ও ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগও তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সরকারি অর্থের অপচয় ও নির্মাণকাজে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

আজকালের কন্ঠ/আর বি