
প্রারম্ভিকা: চেতনার উন্মেষ ও আদর্শের মলাটঃ
বরিশাল জেলার ঐতিহ্যবাহী আগৈলঝাড়া উপজেলার রাংতা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত ও স্বচ্ছল মুসলিম পরিবারে ড. শেখ আসিফ এস. মিজান-এর জন্ম। স্কুলশিক্ষক পিতার ছায়ায় এক প্রাণবন্ত ও ডানপিটে শৈশব কাটছিল তাঁর। কিন্তু ১৯৮১ সালের ৩০ মে’র নির্মম হত্যাকাণ্ড তাঁর জীবনের মোড় এবং পারিবারিক আবহকে স্তব্ধ করে দেয়। বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাত বরণে পিতার চোখে-মুখে যে বেদনার ছাপ তিনি দেখেছিলেন, তা তাঁর শিশুমনকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। মৃত্যুর গভীরতা বোঝার আগেই তিনি হৃদয়ে ধারণ করেন শহীদ জিয়ার কালজয়ী আদর্শ। সেই থেকে এক অদম্য জাতীয়তাবাদী চেতনার স্ফুরণ ঘটে তাঁর অন্তরে।
ছাত্ররাজনীতির অঙ্গনে প্রথম পদচ্ছাপঃ
আদর্শ যখন মজ্জাগত, তখন নেতৃত্ব সহজাত হয়ে ওঠে। মাত্র অষ্টম শ্রেণীতে অধ্যয়নকালেই ড. আসিফ মিজানের ভেতরের সেই নেতৃত্বগুণ চিনে নেয় তৎকালীন উপজেলা ছাত্রদল। তাঁকে মনোনীত করা হয় স্কুল শাখা ছাত্রদলের সভাপতি। শুরু হয় রাজপথের মিছিল-মিটিং আর স্লোগানের উত্তাল জীবন। তবে রাজনীতির এই ঝড়ো হাওয়া তাঁর মেধার ওপর কোনো আঁচড় কাটতে পারেনি; স্বকীয় প্রতিভায় তিনি অষ্টম শ্রেণীতে মেধা বৃত্তি লাভের গৌরব অর্জন করেন।
ঢাকার রাজপথ: স্বৈরাচার বিরোধী লড়াইয়ের অগ্নিপরীক্ষাঃ
রাজনীতিতে অতিমাত্রায় সক্রিয় হয়ে ওঠায় একপর্যায়ে মফস্বলের চেনা আঙিনায় তাঁর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। অভিভাবকেরা সুরক্ষার স্বার্থে তাঁকে পাঠিয়ে দেন রাজধানী ঢাকায়। কিন্তু যাঁর রক্তে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, তাঁকে কি আর ঘরে বেঁধে রাখা যায়? ঢাকার রাজপথই হয়ে ওঠে তাঁর ধ্যান-জ্ঞান ও ঠিকানা। কলেজে পড়ার সময়ই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন তুখোড় ছাত্রনেতা ও বর্তমান সুপ্রিম কোর্টের প্রথিতযশা আইনজীবী গাজী কামরুল ইসলাম সজলের সাহচর্যে আসেন। হাজী মুহম্মদ মহসীন হলে নিয়মিত যাতায়াত থাকলেও কখনো পদের লোভ বা পজিশনের মোহ তাঁকে স্পর্শ করেনি। তিনি ছিলেন রাজপথের এক নিঃস্বার্থ ও অকুতোভয় সৈনিক।
সাংগঠনিক দায়িত্ব ও জাতীয় রাজনীতিতে ভূমিকাঃ
২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি দলের পক্ষে এক যুগান্তকারী ও অনন্য ভূমিকা পালন করেন। তাঁর এই ক্লান্তিহীন শ্রম ও নিষ্ঠার স্বীকৃতিস্বরূপ নির্বাচনের পরপরই গঠিত কমিটিতে তাঁকে উপজেলা বিএনপি’র প্রচার সম্পাদক এবং যুবদলের ১নং যুগ্ম আহ্বায়ক-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে ভূষিত করা হয়। তবে ক্ষমতার মধুচন্দ্রিমা বা পাওয়ার পলিটিক্সের হিসেব-নিকেশ থেকে নিজেকে যোজন যোজন দূরে রেখে তিনি মনোযোগ দেন স্বৈরাচারের যাঁতাকলে পিষ্ট নিজের শিক্ষাজীবনকে পুনরায় সচল করতে।
শিক্ষকতা ও অবিনাশী প্রতিরোধঃ
মেধার চূড়ান্ত সদ্ব্যবহার করে ২০০৭ সালে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। কিন্তু শিক্ষকতার মহান পেশায় থেকেও তিনি তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে বিচ্যুত হননি। ক্লাসরুমের লেকচার আর রাজপথের স্লোগান—উভয় ক্ষেত্রেই তিনি সমান সক্রিয় ছিলেন।
নির্বাসন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ‘অনলাইন প্রতিরোধঃ
ফ্যাসিবাদের চরম দমন-পীড়নে জীবন বাঁচাতে তিনি ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। কিন্তু মানচিত্র বদলালেও তাঁর ভেতরের বিপ্লবী সত্ত্বাটি দমে যায়নি। প্রবাসে থেকেও এক মুহূর্তের জন্য তিনি বসে থাকেননি। অনলাইনে ফ্যাসিবাদের কুশাসন বিরোধী ধারালো লেখালেখি এবং দেশের ভেতর অবরুদ্ধ নেতা-কর্মীদের ফোনে সাহস জুগিয়ে গেছেন নিরন্তর। সাধ্যমতো বিলিয়ে দিয়েছেন আর্থিক সহযোগিতা। বিশেষ করে ২০২৪-এর জুলাই-আগস্টের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশ-বিদেশের অগণিত ফ্যাসিবাদের অবসানকামী মানুষের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে তাদের অনুপ্রেরণা ও সাহস জোগাতেন ড. আসিফ মিজান।
ফ্যাসিবাদের নির্মমতা: মামলা, হামলা ও অর্থনৈতিক নিপীড়নঃ
একটি স্বৈরাচারী শক্তির চক্ষুশূল হওয়ায় তাঁর ওপর নেমে আসে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক নিপীড়নের খড়গ:
রাজনৈতিক মামলা: রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে ৪টি মিথ্যা ও বানোয়াট মামলার মুখোমুখি হয়েছেন।
শারীরিক আক্রমণ ও অপহরণ চেষ্টা:
২০০০ সালে তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে অতর্কিত ও নৃশংস হামলা চালানো হয় এবং ভাগ্যক্রমে এলাকাবাসীর প্রতিরোধের কারনে তিনি অপহরণের হাত থেকে রক্ষা পান।
অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব ও লুণ্ঠন: তাঁর পৈতৃক জমিজমা জোরপূর্বক দখল করা হয় এবং পরিবারের স্বাভাবিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও চলাচলেই চরম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়।
স্ত্রীর চাকরি হরণ: প্রতিহিংসার চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে সম্পূর্ণ অবৈধ ও নজিরবিহীনভাবে পিএসসি (PSC)-এর মাধ্যমে প্রথম শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে নিযুক্ত তাঁর স্ত্রীসহ ৮৫ জনের চাকরি কেড়ে নেওয়া হয়। যা তাঁদের পরিবারকে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে গৌরব ও আগামীর প্রত্যয়ঃ
শত বাধা, নিপীড়ন ও নির্বাসনের অন্ধকার ডিঙিয়ে ড. আসিফ মিজান প্রবাসে তাঁর মেধার সর্বোচ্চ স্বাক্ষর রাখেন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে একটি বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর হওয়ার অনন্য ও অভূতপূর্ব গৌরব অর্জন করেন তিনি। বর্তমানে তিনি দারু সালাম ইউনিভার্সিটি, মোগাদিসু, সোমালিয়া-এর সম্মানিত ভাইস-চ্যান্সেলর হিসেবে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করছেন।
সুদীর্ঘ প্রবাস জীবন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অর্জিত তাঁর এই বিপুল জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাকে তিনি এখন বিলিয়ে দিতে চান মাতৃভূমির কল্যাণে। মেধাভিত্তিক, বৈষম্যহীন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হাতকে শক্তিশালী করতে ড. শেখ আসিফ এস. মিজান এক নির্ভীক ও দূরদর্শী সারথী হতে বদ্ধপরিকর।
আজকালের কন্ঠ/আর বি
আপনার মতামত লিখুন :