
সাংবাদিকতার সাইনবোর্ড ব্যবহার করে বরিশালের বাকেরগঞ্জে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে রাজত্ব চালানো কুখ্যাত মাদক কারবারি, চাঁদাবাজ ও শীর্ষ সন্ত্রাসী দানিসুর রহমান লিমনকে অবশেষে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এক গৃহবধূকে একাধিকবার ধর্ষণ এবং পরবর্তীতে পুনরায় ধর্ষণের চেষ্টা চালানোর সময় স্থানীয় জনতার হাতে গণধোলাইয়ের শিকার হন তিনি। পরে তাকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়।
লিমনের এই পতন ও গ্রেপ্তারের খবরে পুরো বাকেরগঞ্জ জুড়েই সাধারণ মানুষের মাঝে স্বস্তি নেমে এসেছে, আনন্দিত এলাকাবাসী এলাকায় মিষ্টি বিতরণ করেছেন। বর্তমানে এই লম্পট ও চাঁদাবাজের ফাঁসির দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে গোটা উপজেলা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, কথিত এই সাংবাদিক লিমনের বিরুদ্ধে মাদক, চাঁদাবাজি, দালালি ও চুরিসহ বর্তমানে মোট ১২টি মামলা চলমান রয়েছে।
ধর্ষণের চেষ্টা ও গণধোলাইয়ের বিবরণ:
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত দানিসুর রহমান লিমন দীর্ঘদিন ধরে ওই অঞ্চলের এক গৃহবধূকে নানা ভয়ভীতি ও ব্ল্যাকমেইল করে একাধিকবার ধর্ষণ করেন। গত [০৭/৬/২০২৬] তারিখে ওই গৃহবধূকে আবারও ধর্ষণের চেষ্টা চালালে ভুক্তভোগীর চিৎকার শুনে আশেপাশের সাধারণ মানুষ ছুটে আসে। ক্ষুব্ধ জনতা এ সময় কথিত সাংবাদিক লিমনকে হাতেনাতে ধরে গণধোলাই দেয় এবং বাকেরগঞ্জ থানা পুলিশের হাতে তুলে দেয়। পুলিশ ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা পেয়ে তাকে থানা হাজতে নিয়ে যায়।
মাদক, চুরি ও অপরাধের অন্ধকার সাম্রাজ্য:
স্থানীয়দের অভিযোগ, লিমনের অপরাধের তালিকা দীর্ঘ। নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য তিনি নিজ স্ত্রীকে বিভিন্ন প্রভাবশালী ও বিত্তশালীদের বাসায় পাঠিয়ে দেহ ব্যবসায় বাধ্য করতেন বলেও এলাকায় ব্যাপক গুঞ্জন ও ক্ষোভ রয়েছে। এছাড়া বাকেরগঞ্জের ১৪টি ইউনিয়নে তার নিয়ন্ত্রণে চলতো মাদকের বিশাল আখড়া। কিছুদিন পূর্বেও ২৬০ পিস ইয়াবাসহ এক নারীসহ আবাসিক হোটেল থেকে র্যাবের হাতে সরাসরি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এই লিমন।
জেল থেকে জামিনে বেরিয়েই নিজের অপরাধ ঢাকতে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে তিনি ‘সাংবাদিকতা’কে সাইনবোর্ড হিসেবে বেছে নেন। এই পরিচয় ব্যবহার করে বাকেরগঞ্জের ১৪টি ইউনিয়নে ছাগল ও হাঁস চুরির সিন্ডিকেট, চোরাই মোটরসাইকেলের রাজকীয় ব্যবসা এবং মাদক চোরাচালান নির্বিঘ্নে চালাতে শুরু করেন। মানুষকে জিম্মি করে চাঁদাবাজি ও দালালির এক মহা-উৎসবে মেতে উঠেছিলেন তিনি। এমন কোনো অপকর্ম নেই যা তিনি করেননি।
রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ১৫ বছরের আধিপত্য:
লিমনের এই অপরাধের সাম্রাজ্য একদিনে গড়ে ওঠেনি। বিগত ১৫ বছর ধরে তিনি রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে পার পেয়ে গেছেন। পূর্বে তিনি সাবেক জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য রত্না আমিনের কথিত ‘ধর্মপুত্র’ পরিচয়ে এলাকায় প্রভাব খাটাতেন। পরবর্তীতে ক্ষমতার পটপরিবর্তনে তিনি খোলস পাল্টে আওয়ামী লীগের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা মল্লিকের হাত ধরে বাকেরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় আসেন। এই দুই রাজনৈতিক আশ্রয়ে থেকে তিনি ১৪টি ইউনিয়নে একক আধিপত্য বিস্তার করে ফিটিংস বাণিজ্য, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসা চালিয়ে আসছিলেন। তার এই বেপরোয়া আচরণের কারণে দীর্ঘদিন ধরে বাকেরগঞ্জের সাধারণ মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল।
ফাঁসির দাবিতে উত্তাল বাকেরগঞ্জ ও ক্ষুব্ধ জনতা:
লিমনের গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই বাকেরগঞ্জের সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। এই কুখ্যাত ধর্ষণকারী, চাঁদাবাজ ও মাদক ব্যবসায়ীর সর্বোচ্চ শাস্তি তথা ফাঁসির দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। স্থানীয়দের একটাই দাবি—যতক্ষণ না এই অপরাধীর মৃত্যু হয়, ততক্ষণ তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে রাখার রায় কার্যকর করতে হবে।
গ্রেপ্তারের পর উত্তেজিত সাধারণ জনতা যখন লিমনের কঠোর শাস্তির দাবিতে বাকেরগঞ্জ থানায় চাপ সৃষ্টি করে, তখন পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের আশ্বস্ত করা হয় এবং সর্বোচ্চ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
বর্তমান আইনি অবস্থা ও পুলিশের বক্তব্য:
ভুক্তভোগী গৃহবধূর পরিবারের পক্ষ থেকে বাকেরগঞ্জ থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনসহ সংশ্লিষ্ট ধারায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। আজ [০৮/৬/২০২৬/সকালে পুলিশ কঠোর নিরাপত্তায় আসামিকে আদালতে সোপর্দ করলে বিজ্ঞ আদালত তাকে জেল হাজতে প্রেরণ করেন।
এ বিষয়ে বাকেরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উত্তেজিত জনতাকে আশ্বস্ত করে সংবাদমাধ্যমকে জানান, “আইনের চোখে অপরাধী শুধুই অপরাধী, তার কোনো রাজনৈতিক বা পেশাগত পরিচয় বিবেচ্য নয়। উত্তেজিত জনতার চাপের মুখে আমরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছি—দেশের প্রচলিত আইনে সর্বোচ্চ যতটুকু শাস্তির বিধান আছে, তদন্ত সাপেক্ষে আইন অনুযায়ী আমরা ঠিক ততটুকুই কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করব। অপরাধীকে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।”
আজকালের কন্ঠ/আর বি
আপনার মতামত লিখুন :