
“উদ্ভাবন নির্ভর বাংলাদেশ গঠনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি”—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলায় উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হয়েছে ৪৭তম জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহ-২০২৬। জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরের তত্ত্বাবধানে এবং গোলাপগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে দুই দিনব্যাপী এ কর্মসূচি বিজ্ঞানমনস্কতা ও উদ্ভাবনী চেতনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
উৎসবের অংশ হিসেবে আয়োজন করা হয় বিজ্ঞান মেলা, ১০ম বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড, বিজ্ঞান বিষয়ক কুইজ প্রতিযোগিতা এবং বর্ণাঢ্য পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। এতে উপজেলার ১৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করে তাদের উদ্ভাবিত নানা বিজ্ঞানভিত্তিক প্রকল্প ও প্রদর্শনী উপস্থাপন করে।
বিজ্ঞান মেলায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, স্মার্ট কৃষি ব্যবস্থা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, রোবোটিক্স এবং দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা সমাধানমূলক নানা প্রকল্প প্রদর্শন করে। এসব উদ্ভাবনী কাজ দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিজ্ঞানচর্চার প্রতি গভীর আগ্রহ সৃষ্টি করে। মেলায় আগত অভিভাবক, শিক্ষক ও সাধারণ দর্শনার্থীরা শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও বাস্তবধর্মী চিন্তাভাবনার প্রশংসা করেন।
গত বৃহস্পতিবার আয়োজিত সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গোলাপগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মো: রফিকুল ইসলাম। তিনি বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন এবং শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করেন ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে উদ্ভাবনী কাজে অংশ নিতে। এসময় উপস্থিত ছিলেন গোলাপগঞ্জ মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ আরিফুল হকসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, বিজ্ঞান মেলা তরুণ প্রজন্মের সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী চিন্তাকে বিকশিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তিনি আরও বলেন, “বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা ও চর্চার মাধ্যমে একটি উদ্ভাবনমুখী বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব, যেখানে তরুণরাই হবে ভবিষ্যতের নেতৃত্বদানকারী শক্তি।”
গোলাপগঞ্জ মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ আরিফুল হক তাঁর বক্তব্যে বলেন, “বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। আজকের এই বিজ্ঞান মেলায় শিক্ষার্থীদের যে সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী চিন্তা আমরা দেখলাম, তা সত্যিই আশাব্যঞ্জক। তরুণদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে হলে এ ধরনের আয়োজন আরও বেশি করে করা উচিত।”
তিনি আরও বলেন, “মাদক, অপরাধ ও সামাজিক অবক্ষয় থেকে তরুণ সমাজকে দূরে রাখতে বিজ্ঞানচর্চা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শিক্ষার্থীরা যদি জ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনের দিকে মনোনিবেশ করে, তাহলে তারা নিজেদের পাশাপাশি দেশকেও এগিয়ে নিতে পারবে।”
শেষে তিনি আয়োজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের জন্য শুভকামনা প্রকাশ করেন।
শিক্ষার্থীরা তাদের উপস্থাপিত প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য, কার্যপ্রণালী এবং বাস্তব জীবনে এর প্রয়োগযোগ্যতা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তুলে ধরে। অনেক শিক্ষার্থী তাদের উদ্ভাবন দিয়ে পরিবেশ সংরক্ষণ, শক্তি সাশ্রয় এবং প্রযুক্তির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে, যা উপস্থিত সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
অন্যদিকে, শিক্ষকবৃন্দ জানান, এ ধরনের আয়োজন শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের গণ্ডি পেরিয়ে বাস্তব জীবনে জ্ঞান প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করে। তারা মনে করেন, নিয়মিত এমন বিজ্ঞানমেলা আয়োজন করা হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গবেষণামূলক মনোভাব ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে।
এ আয়োজনকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে এলবি গ্রীণ ফ্লাওয়ার প্রাথমিক বিদ্যালয় ও উচ্চ বিদ্যালয়ের এক প্রতিভাবান শিক্ষার্থীর রচিত একটি চমৎকার কবিতা। তার মনের ভাবনা ও কল্পনার রঙে রাঙানো এই কবিতায় ফুটে উঠেছে বিজ্ঞান, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি, যা উপস্থিত সবার মাঝে বিশেষভাবে সাড়া ফেলে।
সব মিলিয়ে, গোলাপগঞ্জে আয়োজিত জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহ-২০২৬ কেবল একটি অনুষ্ঠানই নয়, বরং এটি ছিল তরুণ প্রজন্মের উদ্ভাবনী শক্তি, সৃজনশীলতা ও বিজ্ঞানচর্চার এক উজ্জ্বল মঞ্চ—যা ভবিষ্যতের বিজ্ঞানমনস্ক বাংলাদেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আপনার মতামত লিখুন :