
সিলেটের প্রাচীন ঐতিহ্য ও গৌরবের ধারক মুরারিচাঁদ কলেজ আজ যেন রূপ নিয়েছিল এক বর্ণিল উৎসবমুখর অঙ্গনে। সকালবেলার কোমল আলোয় ধীরে ধীরে জেগে ওঠা ক্যাম্পাসটি নবীনদের পদচারণায় হয়ে ওঠে প্রাণচঞ্চল যেন নতুন স্বপ্নেরা একসঙ্গে ডানা মেলতে শুরু করেছে।
ডিগ্রি পাস ২০২৪–২৫ শিক্ষাবর্ষের নবাগত শিক্ষার্থীদের বরণ করে নিতে ডিগ্রি ক্লাবের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় এক মনোমুগ্ধকর নবীনবরণ অনুষ্ঠান। এই আয়োজনকে কেন্দ্র করে পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এক উচ্ছ্বাসময় আবহ হাসি, কোলাহল আর প্রত্যাশার রঙে রাঙানো এক অপূর্ব সকাল।
অডিটোরিয়ামটি যেন হয়ে উঠেছিল রঙের ক্যানভাস বর্ণিল কাগজ, ফুল আর আলোকসজ্জায় সাজানো প্রতিটি কোণ যেন নতুনদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত। সেই সাজসজ্জার মধ্যেই সিনিয়র শিক্ষার্থীরা দাঁড়িয়ে ছিলেন উষ্ণ অভ্যর্থনা নিয়ে। নতুনদের হাতে তুলে দেওয়া হয় ফুল, আর সেই ফুলের সুবাসে মিশে যায় আন্তরিকতার স্পর্শ অচেনা পরিবেশ মুহূর্তেই হয়ে ওঠে আপন।
নতুন শিক্ষার্থীদের চোখে ছিল কৌতূহল, আনন্দ আর অজানা পথচলার মিশ্র অনুভূতি। কেউ এসেছেন উৎসবের সাজে, কেউবা সরলতার আবরণে তবুও সবার মধ্যে ছিল এক অদম্য উচ্ছ্বাস। পরিচিতি পর্বের মাধ্যমে একে একে গড়ে ওঠে সম্পর্কের নতুন সেতুবন্ধন, যেখানে অচেনারা হয়ে ওঠে আপনজন।
অনুষ্ঠানের সূচনা হয় ধর্মীয় সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত ও গীতা পাঠের মাধ্যমে। এই সূচনা যেন বার্তা দেয়, জ্ঞানের পথে সকল বিভেদ ভুলে একসাথে এগিয়ে যাওয়ার।
অধ্যাপক শাহনাজ বেগমের সভাপতিত্বে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. আকমল হোসেন। তাঁর বক্তব্যে ছিল প্রেরণার দীপ্তি
“জীবনের প্রতিটি বাধা অতিক্রম করতে হবে সাহস আর আত্মবিশ্বাস দিয়ে। ইতিবাচক চিন্তা মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যায়। ডিগ্রি মানে পিছিয়ে পড়া নয়—এটি একজন মানুষ হয়ে ওঠার দৃঢ় ভিত্তি।”
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রফেসর ড. মো. আবুল কালাম আজাদসহ অন্যান্য শিক্ষকবৃন্দ। তাঁদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানে এনে দেয় এক গাম্ভীর্যপূর্ণ মর্যাদা। এছাড়া বিভিন্ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান, সামাজিক নেতৃবৃন্দ ও ছাত্রসংগঠনের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানটি হয়ে ওঠে আরও প্রাণবন্ত ও বহুমাত্রিক।
আলোচনা পর্ব শেষে শুরু হয় সাংস্কৃতিক পরিবেশনা যেখানে সুর, ছন্দ আর আবৃত্তির মূর্ছনায় মুগ্ধ হয়ে ওঠে পুরো অডিটোরিয়াম। গান যেন হৃদয়ের কথা বলে, কবিতা যেন স্বপ্নের ভাষা হয়ে ওঠে, আর প্রতিটি পরিবেশনা দর্শকদের করতালিতে বারবার ফিরে পায় নতুন প্রাণ।
সঞ্চালনায় ছিলেন ডিগ্রি ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক জিয়া উদ্দিন চৌধুরী ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক সৈয়দা তামান্না ইসলাম। স্বাগত বক্তব্যে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে উঠে আসে ভালোবাসা, আশা আর নতুন পথচলার অঙ্গীকার।
দিনব্যাপী এই আয়োজন শুধু একটি আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান নয় এটি ছিল স্বপ্নের সূচনা, আত্মবিশ্বাসের বীজ বপনের এক মহামুহূর্ত। বক্তাদের কণ্ঠে উঠে আসে কলেজের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস, সংগ্রামের গল্প, আর সেই ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় নিজেদের যুক্ত করার আহ্বান।
শেষ বিকেলের আলো যখন ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসে, তখনও ক্যাম্পাসে রয়ে যায় সেই দিনের উচ্ছ্বাসের রেশ। নবীনদের চোখে তখন নতুন পথের স্বপ্ন, নতুন বন্ধুত্বের গল্প, আর অজানা ভবিষ্যতের প্রতি এক দৃঢ় প্রত্যয়।
এই নবীনবরণ যেন শুধু ফুল দিয়ে বরণ নয় এটি এক প্রতিশ্রুতি, এক আলোকিত যাত্রার শুরু; যেখানে জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে গড়ে উঠবে আগামীর মানুষ, আগামীর সমাজ।
আপনার মতামত লিখুন :