নতুন বছরে পুরনো অপেক্ষা | Daily AjKaler Kontho

নতুন বছরে পুরনো অপেক্ষা


সম্পাদকীয় প্রকাশের সময় : জানুয়ারী ৮, ২০২৬, ১১:৫৪ অপরাহ্ন
নতুন বছরে পুরনো অপেক্ষা

ক্যালেন্ডার যথানিয়মে তার গন্তব্যে ছুটছে। সে কারো জন্য অপেক্ষা করে না। দুনিয়ার কোনো দিনপঞ্জিই কার কিসে অপেক্ষা, কার কী প্রত্যাশা-প্রাপ্তি তা দেখে না। সে তার আপন গতিতে চলমান, ধাবমান। ক্যালেন্ডার নিজে কিছু ঘটায় না। ঘটনার ঘটক, অনুঘটক মানুষই। কিন্তু প্রথাগতভাবে দায় পড়ে বছর বা সালের ওপর। বিদায় নেয়া বছরটিতেও ঘটা ঘটনার বেশিরভাগ মানুষেরই সৃষ্টি। কিছু কিছু ঘটনা প্রাকৃতিক বা জাগতিক নিয়মে ঘটা। বিদায়ী পঁচিশের আগে চব্বিশ ছিল রাজনৈতিকভাবে ঐতিহাসিক। বছরটির ৫ আগস্ট বাঁক ঘুরিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশের। ফ্যাসিস্টের বিচার, সংস্কার নিয়ে তাগিদ থাকলেও মোটা দাগের আকাঙ্খা ছিল যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। পঁচিশের সেই অপেক্ষা গড়িয়েছে ছাব্বিশেও। গোটা পঁচিশ সাল জুড়েই প্রশ্ন ঘুরেছে- নির্বাচন হবে তো? হলে সেটা কবে? এ দুই প্রশ্নেরই জবাব মিলেছে নতুন বছর শুরুর আগেই।

২০২৫ সাল ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য এক সন্ধিবছর। পুরোনো রাজনীতির ক্লান্তি, নতুন রাজনীতির সম্ভাবনা, সহিংসতার ভয় এবং সংস্কারের আকাক্সক্ষাÑ সবকিছু একসঙ্গে এগিয়েছে। গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে ১৭ নভেম্বর মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদ- দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ হারায়। বিচ্ছিন্নভাবে নানা সময় মিছিল করার চেষ্টা করেছিল দলটি, তার সঙ্গে ককটেল ও বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক তৈরির অপচেষ্টা করেছিল দলটি। এছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তিনটি মামলায় ২৫ জন (মোট ৩২) সেনাবাহিনীর সাবেক ও বর্তমান ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারিও বড় ঘটনা। ২৫ কর্মকর্তার মধ্যে ১৫ জন সেনাবাহিনীতে কর্মরত এবং একজন অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে (এলপিআর) ছিলেন। পরে সেনাবাহিনী ১৫ কর্মকর্তাকে হেফাজতে নেওয়ার কথা জানায়। তাঁদের বিচার চলছে। এসব নিয়ে আলোচনার মাঝেই অভ্যুত্থানের এক বছরেরও বেশি সময় পর বিদায়ী বছরের একেবারে শেষ মাস ডিসেম্বরে এসে ঘোষণা হয় ভোটের তারিখ। জানানো হয় ১২ ফেব্রুয়ারি একদিনে হবে দুটি ভোট। একটি সাধারণ নির্বাচনের ভোট, আরেকটি গণভোট।

এর আগে বছরের পুরোটা সময়ই গেছে জুলাই সনদ ও সংস্কার প্রণয়ন নিয়ে। বছরের শেষদিনে উপসংহার ঘটলো বাংলাদেশের রাজনীতির একটি বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের। আগের দিন ৩০ ডিসেম্বর ভোরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার। পরদিন জানাজা। স্বামী জিয়াউর রহমানের জানাজাস্থল ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতেই হলো বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা। এরপর স্বামীর পাশেই কবর। জমায়েতের ভারে আক্রান্ত ঢাকা। আগের সপ্তাহে লক্ষ লক্ষ মানুষ ঢাকায় জমায়েত হয় আবেগ-উচ্ছ্বাসে তার ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বরণ করতে। এরও আগে মানুষ সমবেত হয়েছিল, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হাদির জানাজা পড়তে। এবারের জমায়েতও বিদায় ও বিষাদের। নির্বাচনকে ঘিরে সামনেও জমায়েতের বিশাল ট্রেনে কেবল ঢাকা নয়, গোটা বাংলাদেশ। এসব জমায়েতের কোনটা বিষাদের বা আনন্দের-সেই জিজ্ঞাসা থেকেই যাচ্ছে। বেগম খালেদা জিয়ার জীবনে সব চেয়ে বড় স্বার্থকতা দুনিয়ার জীবনে বাংলাদেশের রাজনীতি ও ইতিহাসে তিনি অমর চরিত্র। এর মাঝেই পঞ্জিকার তারিখ মতো এগোয় নির্বাচনী ট্রেন।

তারেক রহমান দেশে ফিরেই জানিয়েছিলেন, আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান। তার এ প্ল্যান বাস্তবায়ন অবশ্যই নির্বাচনের পরের বিষয়। তবে, শুরুটা নির্বাচনের আগেই দৃশ্যমান হতে থাকে। চলনে-বলনে এক ব্যাতিক্রম এবং অন্যরকম তারেক রহমানকে দেখতে থাকে বাংলাদেশ। যেখানে যাচ্ছিলেন সেখানেই পঙ্গপালের মতো মানুষের ছুটে যাওয়া। বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস সাধারণ মানুষের। অভিবাদনের জবাবে হাত নাড়তে নাড়তে কাহিল হয়ে পড়লেও এর প্রকাশ ঘটছিল না। মিলছিল না মুখের হাসি। হাইটের সঙ্গে যোগ হতে থাকে নতুন হাইপও। তারেক রহমানকে নিয়ে এ হাইপ-হাইটের পথেই খালেদা জিয়ার মৃত্যু।

তার মৃত্যুতে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খালেদা জিয়ার পক্ষে দাখিল করা তিনটি আসনে নতুন করে তফসিল ঘোষণা করতে হবে কি না, সেই প্রশ্ন সামনে আনতে দেরি হয়নি। তার মৃত্যুর আগেরদিন ছিল মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন ছিল। খালেদা জিয়ার পক্ষে বগুড়া-৭, দিনাজপুর-৩ ও ফেনী-১ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়। এই তিন আসনে বিএনপির একজন করে বিকল্প প্রার্থীও মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এরই মধ্যেই পরদিন মঙ্গলবার ভোর ছয়টায় খালেদা জিয়া মারা যান। জাতীয় নির্বাচনসংক্রান্ত আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে বলা আছে, প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি, এমন কোনো বৈধভাবে মনোনীত প্রার্থীর মৃত্যু হলে ওই আসনে নতুন করে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করতে হবে। নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, তিনটি আসনে খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র জমা হলেও তিনি বা কেউ এখনো বৈধ প্রার্থী হননি। কারো মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে টিকে যাওয়ার পর তিনি বৈধ প্রার্থী বিবেচিত হন। খালেদা জিয়া মারা যাওয়ায় তাঁর মনোনয়ন স্থগিত থাকবে। বৈধভাবে মনোনীত ঘোষণার পর কোনো প্রার্থীর মৃত্যু হলে সেখানে আবার তফসিল ঘোষণা করতে হয়। এ ক্ষেত্রে সেটা করতে হবে না।

কোনো আসনে কোনো দল একাধিক প্রার্থীর মনোনয়ন দিতে পারে। তবে একাধিক প্রার্থী থাকলে প্রতীক বরাদ্দের আগে যাঁর নামে দল থেকে প্রতীক বরাদ্দের চিঠি দেওয়া হয়, তিনিই দলীয় প্রার্থী হন। তাই খালেদা জিয়ার নামে তিন আসনে নতুন করে তফসিল ঘোষণা দরকার করে না। এরপরও খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচনের তফসিলে পরিবর্তন আনার দাবি তুলে অতিরাজনীতির ফাঁক খোঁজার লোক ও মহল রয়েছে। এ যাত্রায় তা বাজার পায়নি। বছর জুড়ে আলোচনার আরেকটি বড় বিষয় ছিল, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফেরা নিয়ে। তিনি আসছেন না কেন, এলে কবে নাগাদ আসবেনÑ এসব প্রশ্নে কৌশলগতভাবে কিছুটা কাবু হয়ে পড়ে বিএনপি। শিগগিরই আসবেন, দ্রুত আসবেন- ধরনের জবাবে সন্তুষ্টু হতে পারছিল না সাধারণ মানুষ। এর অবসান ঘটে ২৫ ডিসেম্বর। কিন্তু অবসান হয়েও না হওয়ার মতো অবস্থা ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদি হত্যার ঘটনায়। ১১ ডিসেম্বর তফসিল ঘোষণার মধ্যদিয়ে দেশে যখন নির্বাচনমুখী যাত্রা শুরুর পরদিনই ঘটে বিপত্তি। ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয় ১৮ ডিসেম্বর। এর জেরে ফুঁসে ওঠে তাঁর সমর্থকেরা। খুনিদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে আন্দোলন থামেনি। হাদি জুলাই যোদ্ধাদেরই একজন। এ যোদ্ধাদের রাজনৈতিক গন্তব্য কী হয়, তা নিয়ে জনমনে কৌতূহল ছিল বছরের শুরুতে। গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি গঠনে এই প্রশ্নের কিছুটা জবাব মেলে। বাকিটা এখনো বলতে গেলে বাকির খাতায়ই পড়ে আছে। বিশেষ করে এনসিপির নানা মতবিরোধের কথা এখন আর গোপন নেই। কথার বাহাদুরি বা প্যাঁচে সত্য গোপন রাখা যাচ্ছে না। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলটি অভ্যন্তরীণ সংকটে পড়েছে। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করার কারণে অনেকেই দল ছাড়ার ঘোষণা দেন।

বলার অপেক্ষা রাখে না, হাইপ-হাইটে ঘুরছে বিএনপি। দুই যুগ আগে প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হলেও বিএনপিতে তারেক রহমানের ভূমিকা ছিল মা খালেদা জিয়ার সহযোগী হিসেবে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৮ সালে খালেদা জিয়াকে দুর্নীতির মামলায় কারাগারে পাঠালে বিদেশে থেকে দল পরিচালনার দায়িত্ব নেন তারেক রহমান। এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর বন্দী অবস্থা থেকে বের হয়ে সপরিবার যুক্তরাজ্যে যান তিনি। মা কারাগারে যাওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দলের হাল ধরেন তারেক রহমান। এরপর প্রতিটি লড়াই-সংগ্রামে বিদেশে থেকেই বিএনপি ও সমমনা দলগুলোকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তিনি। অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের ক্ষমতাচ্যুতির পর থেকে তারেক রহমানের ফেরার আশায় ছিলেন বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা। কিন্তু স্পষ্ট কোনো ঘোষণা না আসায় বিএনপি যে দুর্দশায় পড়েছিল সেখান থেকে ভালোভাবে উদ্ধার মিলেছে ২৫ ডিসেম্বর লন্ডন থেকে তারেক রহমানের ঢাকায় ফেরার মধ্য দিয়ে।

২০২৬-এর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অবাধ, সুষ্ঠু ও জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের মাধ্যমে রাজনীতিকে আবার নিয়মের ভেতরে ফিরিয়ে আনা, জনগণকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় বিশ্বাসী ও আস্থাশীল করা। দলগুলোর পক্ষে জনমুখী কৌশল ও গণসংশ্লিষ্ট কর্মসূচি নির্ধারণ করে, পরিবর্তন ও সংস্কারের বিষয়গুলোকে স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা করা। ক্ষমতা প্রয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে, নির্বাচনের মাধ্যমে জনআস্থার পথে এগিয়ে যাওয়া। তাহলেই দেশের মানুষ সমস্ত শোক, দুঃখ এবং হতাশা কাটিয়ে স্বপ্ন দেখবে নতুন বাংলাদেশের। যেখানে কেবলি থাকবে সুদৃঢ় ঐক্য আর সমৃদ্ধি।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

আজকালের কন্ঠ/আর বি