
সিলিন্ডারের গ্যাসের সংকট, বাড়তি দাম সবকিছুর মাঝেই বিকল্প জ্বালানির পথ দেখাচ্ছেন শরীয়তপুরের তরুণ উদ্যোক্তা সানজিদুল ইসলাম। গরুর গোবর থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদন করে প্রায় ২ কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে ৩০টি পরিবারের রান্নাঘরে জ্বালানি পৌঁছে দিচ্ছেন তিনি। একই সঙ্গে গ্যাস উৎপাদনের পর অবশিষ্ট বর্জ্য থেকে তৈরি করছেন জৈব সার। তার এই উদ্যোগে একদিকে কমছে রান্নার জ্বালানির খরচ, অন্যদিকে গোবর পরিণত হচ্ছে সম্পদে।
একদিকে জ্বালানি গ্যাসের সংকট, অন্যদিকে দিন দিন বাড়ছে বোতলজাত এলপিজি গ্যাসের দাম। রান্নার জন্য গ্যাস সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক পরিবারকে যেমন বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে, তেমনি সংকটের সময় সিলিন্ডার পাওয়াও হয়ে উঠছে কঠিন। এমন পরিস্থিতিতে গোবর থেকেই রান্নার গ্যাস উৎপাদন করে ভিন্ন এক সম্ভাবনার দ্বার খুলেছেন শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার তরুণ উদ্যোক্তা সানজিদুল ইসলাম।
ভেদরগঞ্জ উপজেলার ডিএমখালী ইউনিয়নে স্থাপন করা হয়েছে তার বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট। প্ল্যান্টে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার কেজি গরুর গোবর ব্যবহার করে উৎপাদন করা হচ্ছে বায়োগ্যাস। পরে প্রায় ২ কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে ৩০টি পরিবারের রান্নাঘরে সরবরাহ করা হচ্ছে সেই গ্যাস।
শুধু গ্যাস উৎপাদনেই থেমে নেই এই উদ্যোগ। বায়োগ্যাস তৈরির পর অবশিষ্ট উপাদান ফেলে না দিয়ে তা প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করা হচ্ছে জৈব সার। ফলে একই উদ্যোগ থেকে পাওয়া যাচ্ছে রান্নার জ্বালানি ও কৃষিকাজের উপযোগী সার। পাশাপাশি গরুর খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও হচ্ছে পরিবেশবান্ধব উপায়ে।
মামার গরুর খামারের পাশেই প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা করেন সানজিদুল। ২০২৬ সালে প্রায় ১১ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে শুরু করেন বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট নির্মাণের কাজ। উৎপাদন শুরু হওয়ার পর প্রায় এক মাস আগে স্থানীয় ৩০টি পরিবারে গ্যাস সরবরাহ শুরু করেন তিনি। বর্তমানে গ্যাস সরবরাহ ও জৈব সার বিক্রি করে সব মিলিয়ে বছরে প্রায় ১০ লাখ টাকা আয় করছেন এই উদ্যোক্তা।
সানজিদুলের প্ল্যান্ট থেকে গ্যাস পাওয়া পরিবারগুলোর মধ্যেও তৈরি হয়েছে স্বস্তি। তাদের ভাষ্য মতে, সিলিন্ডার গ্যাস কিনতে যেমন বাড়তি টাকা খরচ হয়, তেমনি অনেক সময় প্রয়োজনের মুহূর্তে গ্যাস পাওয়া যায় না। কিন্তু পাইপলাইনের মাধ্যমে নিয়মিত গ্যাস পাওয়ায় সেই ভোগান্তি অনেকটাই কমেছে।
গ্রাহক রেহানা পারভিন বলেন, সিলিন্ডার গ্যাস থেকে আমরা অনেকটাই সেফটি পাচ্ছি। কম টাকায় পাচ্ছি, বিশেষ করে সবসময় পাচ্ছি এবং এর তাপও বেশি। আমার হাসব্যান্ড বাইরে থাকে। সিলিন্ডার গ্যাস শেষ হয়ে গেলে দোকানে নিতে হয়, আবার আনতে হয়। এতে অনেক ভোগান্তি হয়। এখন এসবের কোনো চিন্তা নেই, শুধু মাসে বিল দিই।
সানজিদুলের উদ্যোগ শুধু স্থানীয় পরিবারগুলোর রান্নার জ্বালানি সংকটই কিছুটা কমাচ্ছে না, আগ্রহ তৈরি করেছে অন্যদের মধ্যেও। বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট দেখতে এসে অনেকে এমন উদ্যোগ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
জহির উদ্দিন নামে স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, আমাদের এলাকার ছেলে গোবর থেকে গ্যাস উৎপাদন করছে, তা আবার পাইপের মাধ্যমে মানুষের বাড়িতে দিয়ে অর্থ উপার্জন করছে বিষয়টি আমার কাছে খুব ভালো লেগেছে। তাই দেখতে এসেছি। আমারও ইচ্ছা আছে, ওর কাছ থেকে জেনে আমিও এরকম একটি বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট করব।
তিনি বলেন, সানজিদুলের এই উদ্যোগ এলাকার যুবসমাজের জন্য একটি রোল মডেল হয়ে থাকবে। এলাকার যুবকদের প্রতি আমার আহ্বান থাকবে, বেকার না থেকে এ ধরনের উদ্যোগ নিয়ে কিছু করার। কারণ ছোট থেকেই একসময় বড় কিছু করা সম্ভব।
বর্তমানে ৩০টি পরিবারকে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হলেও সানজিদুলের পরিকল্পনা আরও বড়। ভবিষ্যতে প্ল্যান্টের পরিধি বাড়িয়ে অন্তত ১০০টি পরিবারকে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন তিনি।
সানজিদুল ইসলাম বলেন, বগুড়ায় গিয়ে এমন একটি প্ল্যান্ট দেখে আমার ইচ্ছা হয়েছিল এলাকায় একটি প্লান্ট দেব। কিন্তু বিদেশ চলে যাওয়ায় আর করা হয়ে ওঠা হয়নি। সাত বছর পর দেশে এসে সেই ইচ্ছা থেকেই ১১ লাখ টাকা ব্যয়ে এই প্ল্যান্টটি স্থাপন করি। বর্তমানে এখান থেকে উৎপাদিত গ্যাস ৩০টি বাড়িতে সরবরাহ করছি। পাশাপাশি জৈব সারও তৈরি হচ্ছে। সব মিলিয়ে বছরে প্রায় ১০ লাখ টাকা আয় হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, এটিকে আরও বড় করার পরিকল্পনা রয়েছে। এখন ৩০টি বাড়িতে লাইন দিয়েছি। যদি ১০০টি বাড়িতে লাইন দিতে পারি, তাহলে এলাকায় সিলিন্ডার গ্যাসের চাহিদা কিছুটা কমবে।
তরুণদের উদ্দেশে সানজিদুল বলেন, প্রতিটি এলাকায় যদি এমন প্ল্যান্ট তৈরি করা যায়, তাহলে দেশের চলমান গ্যাস সংকট নিরসনে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
এ বিষয়ে ভেদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আবু বকর সিদ্দিক বলেন, একজন প্রবাস ফেরত ব্যক্তি গরুর খামারের গোবর দিয়ে জৈব সার ও গ্যাস প্লান্ট তৈরি করেছেন। এতে করে গ্যাসের চাহিদা পূরণ হচ্ছে এলাকাবাসীর এবং কৃষকদেরও উপকার হচ্ছে। সানজিদুল এর মত আরো অন্য কোন বেকার যুবক এরকম উদ্যোগ নিতে চাইলে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন হলে আমরা সাহায্য করব।
বর্জ্য থেকে সম্পদ, বদলাতে পারে গ্রামের অর্থনীতি গরুর গোবর সাধারণত গ্রামীণ এলাকায় বর্জ্য হিসেবেই বিবেচিত হয়। কিন্তু সানজিদুলের উদ্যোগ দেখাচ্ছে, সেই গোবরই হতে পারে রান্নার জ্বালানি ও কৃষির উপযোগী সার তৈরির কাঁচামাল। এতে একদিকে খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সহজ হচ্ছে, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে নতুন আয়ের সুযোগ।
আপনার মতামত লিখুন :