৪৭৪ কোটি টাকার বীজ প্রকল্পে হুমায়ুন কবিরের ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা | Daily AjKaler Kontho

৪৭৪ কোটি টাকার বীজ প্রকল্পে হুমায়ুন কবিরের ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা


নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশের সময় : নভেম্বর ৫, ২০২৬, ৬:০৬ অপরাহ্ন
৪৭৪ কোটি টাকার বীজ প্রকল্পে হুমায়ুন কবিরের ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা

দেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কৃষকের কাছে উন্নত জাতের বীজ পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) বাস্তবায়নাধীন ‘ধান, গম ও ভুট্টার উন্নততর বীজ উৎপাদন ও উন্নয়ন প্রকল্প (তৃতীয় পর্যায়)’ নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। ৪৭৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পে ভুট্টাবীজের মজুত, সংরক্ষণ ও গুণগত মান নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন উঠলেও প্রকল্পের সামগ্রিক কার্যক্রম সচল রাখতে কাজ করছেন প্রকল্প পরিচালক কৃষিবিদ মো. হুমায়ুন কবির।

২০২৫ সালের মার্চ থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য উন্নত ও উচ্চফলনশীল জাতের ধান, গম ও ভুট্টাবীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ এবং কৃষকের কাছে সরবরাহের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। একই সঙ্গে বীজ সংরক্ষণব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কৃষিঝুঁকি মোকাবিলায় কৃষকদের সহায়তা করাও প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য।

প্রকল্পের আওতায় আমদানি করা হাইব্রিড ভুট্টাবীজের মজুত ও গুণগত মান নিয়ে কিছু অভিযোগ সামনে এসেছে। বিশেষ করে ২০২৫-২৬ মৌসুমে ভারত থেকে আমদানি করা বি-৩৩৫৫ জাতের ভুট্টাবীজের মজুত ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ওই মৌসুমে ভারত থেকে ২০০ মেট্রিক টন হাইব্রিড ভুট্টাবীজ আমদানি করা হয়। এর মধ্যে রবি মৌসুমে কৃষকদের কাছে ২২ মেট্রিক টন বিক্রি হয়। অবশিষ্ট ১৭৮ মেট্রিক টন পরবর্তী মৌসুমের জন্য সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) সভার কার্যবিবরণীতেও এ সিদ্ধান্তের উল্লেখ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কাস্টমসের নেটওয়ার্কিং ও সফটওয়্যারজনিত সমস্যার কারণে আমদানি করা বীজ খালাসে বিলম্ব হয়। ফলে নির্ধারিত সময়ে সব বীজ বাজারজাত করা সম্ভব হয়নি। তবে বি-৩৩৫৫ জাতের ভুট্টাবীজের প্রদর্শনী ও মাঠ দিবসে কৃষকদের আগ্রহ দেখা গেছে। অবশিষ্ট বীজ বীজ সংরক্ষণের নির্ধারিত প্রযুক্তিগত পদ্ধতি অনুসরণ করে ডিহিউমিডিফায়েড গুদামে রাখা হয়েছে বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তাদের দাবি, সংরক্ষিত বীজের অঙ্কুরোদ্‌গম ক্ষমতা ৯০ শতাংশের বেশি রয়েছে।

এদিকে ২০২৬ সালের ৮ অক্টোবরের একটি প্রাক্‌সভা কার্যপত্রে বীজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ও প্রাথমিক মজুতের হিসাবে ২৬৩ মেট্রিক টনের উল্লেখ পাওয়া গেছে। জানুয়ারির পিআইসি সভায় উল্লেখিত ১৭৮ মেট্রিক টনের সঙ্গে এই হিসাবের পার্থক্য ৮৫ মেট্রিক টন। এ পার্থক্যকে কেন্দ্র করে মজুত ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্য, আগের বছরের সমাপনী মজুত, চলতি বছরের উৎপাদন, আমদানি এবং চূড়ান্তভাবে গ্রহণ করা বীজের পরিমাণ বিবেচনায় নিয়েই মোট মজুতের হিসাব প্রস্তুত করা হয়। তাই দুটি নথির সংখ্যাগত পার্থক্যের কারণ নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সময়ের পূর্ণাঙ্গ স্টক বিবরণী, গ্রহণ ও বিতরণের নথি এবং গুদামভিত্তিক হিসাব পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

বিএডিসির মাঠপর্যায়ের বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণকেন্দ্রগুলোতে দৈনন্দিন মজুত ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর থাকে। স্টক রেজিস্টার, বিন কার্ড, বীজ গ্রহণ, বিতরণ ও সংরক্ষণের নথি স্থানীয় পর্যায়ে সংরক্ষণ করা হয়। অন্যদিকে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে সামগ্রিক পরিকল্পনা, বাজেট, ক্রয় কার্যক্রমের সমন্বয়, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি তদারকি। ফলে প্রকল্প পরিচালকের প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং গুদামের দৈনন্দিন ভৌত মজুত ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

আমদানি করা বি-৩৩৫৫ জাতের ভুট্টাবীজের অঙ্কুরোদ্‌গম ক্ষমতা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। কোনো কোনো পরীক্ষায় অঙ্কুরোদ্‌গমের হার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ এবং পরবর্তী সময়ে সংরক্ষিত কিছু লটে তা ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশে নেমে আসার দাবি করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই), স্থানীয় বিএডিসি কর্মকর্তা এবং বিএডিসির কেন্দ্রীয় বীজ পরীক্ষাগারের পরীক্ষায় সন্তোষজনক ফল পাওয়ার পরই আমদানিকৃত বীজ গ্রহণ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বীজের অঙ্কুরোদ্‌গম ক্ষমতা নির্ধারণে আমদানির সময়কার পরীক্ষার পাশাপাশি সংরক্ষণকালীন পরিবেশ, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও গুদাম ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ। তাই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট লটের নমুনা সংগ্রহ করে স্বীকৃত পরীক্ষাগারে স্বাধীন ও পুনরায় পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এতে বীজের প্রকৃত গুণগত মান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।

ঠাকুরগাঁও ও চুয়াডাঙ্গা বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের গুদামে সংরক্ষিত বীজের হিসাব নিয়েও আলোচনা রয়েছে। অভিযোগের একটি অংশে ঠাকুরগাঁও কেন্দ্রে বি-৩৩৫৫ জাতের বীজের সঙ্গে দেশীয় হাইব্রিড বীজ মেশানোর কথা বলা হয়েছে। তবে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র এ অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, চুয়াডাঙ্গা কেন্দ্রে আগের বছরের কোনো বীজ মজুত ছিল না। এ বিষয়ে প্রকৃত অবস্থা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের স্টক রেজিস্টার, লট নম্বর, সংরক্ষণ ও বিতরণসংক্রান্ত নথি যাচাই করা প্রয়োজন।

অন্যদিকে প্রকল্পের আওতায় নতুন করে ১০০ মেট্রিক টন হাইব্রিড ভুট্টাবীজ সংগ্রহের জন্য ৪ কোটি ৭ লাখ ২৫ হাজার টাকার ক্রয়চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। ই-জিপি দরপত্রের তথ্য অনুযায়ী, টেন্ডার আইডি ১৩০৪৮০৪-এর আওতায় ২০২৬ সালের ২৮ জুন দরপত্র আহ্বান করা হয়। ১২ আগস্ট নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড (এনওএ) দেওয়া হয় এবং ১৯ আগস্ট চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্যাকেজ নম্বর RWMP/2025-26/GD-33-এর আওতায় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে রয়েছে বঙ্গ অ্যাগ্রিটেক লিমিটেড।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আসন্ন রবি মৌসুমে বগুড়া, ময়মনসিংহ, ফেনী, চুয়াডাঙ্গা ও রংপুর অঞ্চলের কৃষকদের চাহিদা পূরণে এ বীজ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর ২০২৫) এবং অনুমোদিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) অনুসরণ করেই ক্রয়প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।

এ ছাড়া ঠাকুরগাঁওয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ মনোয়ার হোসেন খানের ২০২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বরের ১৫৫ নম্বর স্মারক নিয়েও আলোচনা রয়েছে। নথি অনুযায়ী, ১৯ আগস্টের ক্রয়চুক্তির ২০ দিন পর স্মারকটি জারি করা হয়। ফলে স্মারকের বিষয়বস্তু, উদ্দেশ্য ও ক্রয়চুক্তির সময়ক্রম পৃথকভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

কৃষি খাতে বিএডিসির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি পর্যায়ে মানসম্মত বীজের সরবরাহ নিশ্চিত করা, মৌসুমি চাহিদা অনুযায়ী কৃষকদের হাতে সময়মতো বীজ পৌঁছে দেওয়া এবং বীজের বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের সরাসরি প্রভাব রয়েছে।

এ অবস্থায় প্রকল্পের মজুত ও বীজের গুণগত মান নিয়ে ওঠা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত যেমন প্রয়োজন, তেমনি নথিপত্র ও দায়িত্বের সুনির্দিষ্ট পরিধি বিবেচনা না করে কোনো ব্যক্তিকে দায়ী করাও সমীচীন নয়। প্রকল্প পরিচালকের প্রশাসনিক তদারকি, পিআইসি সভার সিদ্ধান্ত এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব—সবকিছু আলাদাভাবে যাচাই করে প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা জরুরি।

৪৭৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকার এ প্রকল্পের সফলতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে কৃষকের কাছে সময়মতো মানসম্মত বীজ পৌঁছে দেওয়ার ওপর। সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার, স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া, সঠিক মজুত ব্যবস্থাপনা এবং বীজের গুণগত মান নিশ্চিত করা গেলে প্রকল্পটি দেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আজকালের কন্ঠ/আর বি