
একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের বাকস্বাধীনতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার অধিকার। কিন্তু বর্তমান সময়ে আমরা এক অত্যন্ত উদ্বেগজনক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছি, যেখানে ক্ষমতাসীন দলের এক শ্রেণীর অসাধু নেতা এবং ধর্মীয় চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো একজোট হয়ে সাধারণ মানুষের কণ্ঠরোধ করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। নিজেদের অন্যায়, অপকর্ম ও ক্ষমতার দাপটকে টিকিয়ে রাখার জন্য তারা সমাজজুড়ে ভয় ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। যখনই কোনো সাধারণ নাগরিক তাদের দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা উগ্রবাদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলে, তখনই তাকে সহিংসতা ও বর্বরোচিত নির্যাতনের মাধ্যমে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়।
এই চলমান নিপীড়নের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি। ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী মহল সরকারি চুক্তি, ব্যাংক ঋণ আত্মসাৎ এবং নানাবিধ দুর্নীতির মাধ্যমে আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে, আর অন্যদিকে ‘হেফাজত-এ-ইসলাম’-এর মতো উগ্রবাদী সংগঠনগুলো ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সমাজে বিভেদ ও হিংসা ছড়াচ্ছে। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, যে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার ওপর সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তার দায়িত্ব ন্যস্ত, সেই পুলিশ প্রশাসনের কিছু অসাধু ও দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা এই অপরাধীদের পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে মদদ দিয়ে যাচ্ছেন। ক্ষমতার প্রভাব এবং ধর্মীয় স্পর্শকাতরতার অজুহাত দেখিয়ে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো ভুক্তভোগীদেরই মুখ বন্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়, যা সমাজে অপরাধীদের জবাবদিহিহীনভাবে পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।
কোনো আদর্শ রাষ্ট্রে দুর্নীতি ও উগ্রবাদের এমন মেলবন্ধন চলতে পারে না। বিরোধী পক্ষ বা সাধারণ জনগণের ওপর ‘রাজনৈতিক এজেন্ট’ তকমা দিয়ে বা ধর্মীয় অনুভূতির দোহাই দিয়ে যে বর্বরোচিত হামলা চালানো হচ্ছে, তা মূলত আমাদের মৌলিক মানবাধিকারের ওপর চরম আঘাত। শাসক শ্রেণীর অনিয়ম এবং চরমপন্থীদের ধর্মান্ধতা, উভয় সংকটই আজ সাধারণ মানুষের জীবনকে বিষিয়ে তুলেছে।
এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে হলে এবং একটি সুশাসিত, নিরাপদ সমাজ গঠন করতে হলে ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতিবাজ পুলিশ কর্মকর্তাদের যোগসাজশের বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণকে সোচ্চার হতে হবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধই পারে সাধারণ মানুষের হৃত অধিকার ও কণ্ঠস্বরের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিতে।
আপনার মতামত লিখুন :