নড়াইলে চাঞ্চল্যকর হাসান হত্যাকাণ্ডের জেরে ২৫ বাড়িতে ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ, এলাকা ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা | Daily AjKaler Kontho

নড়াইলে চাঞ্চল্যকর হাসান হত্যাকাণ্ডের জেরে ২৫ বাড়িতে ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ, এলাকা ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা


নড়াইল প্রতিনিধি প্রকাশের সময় : অক্টোবর ১৫, ২০২৬, ৭:০১ অপরাহ্ন
নড়াইলে চাঞ্চল্যকর হাসান হত্যাকাণ্ডের জেরে ২৫ বাড়িতে ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ, এলাকা ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা

নড়াইলের নড়াগাতী থানার কলাবাড়িয়া ইউনিয়নের চরকান্দিপাড়া গ্রামে আধিপত্য বিস্তার ও পূর্ব বিরোধকে কেন্দ্র করে ভ্যানচালক হাসান শেখ (৪৫) হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর প্রতিপক্ষের বাড়িঘরে ব্যাপক ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ২০ থেকে ২৫ টি বসতবাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্তরা মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সরেজমিনে ওই গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, ‘পুড়ে যাওয়া বাড়িগুলোতে এখন শুধু ছাই আর ধ্বংসস্তূপ। পাকা বাড়িঘর গুলো পেট্রোল দিয়ে অগ্নিসংযোগের পর খা খা করছে। ঘরের টিন, আসবাবপত্র, ধান-চাল, পাট, গবাদি পশু, স্বর্ণালঙ্কারসহ সবকিছু লুট করে নিয়ে আগুন দেওয়া হয়েছে। আতঙ্কে নারী ও শিশুরা গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। হত্যার ঘটনার পর দিন থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত এই ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।

এছাড়াও বিধ্বস্ত চরকান্দিপাড়া ঘুরে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষজনদের সাথে কথা বলে আরও জানা গেছে, ‘অছিকুর শেখের বাড়িঘর, অহিদুল শেখের বাড়িঘর, শেখ তৈয়বুর রহমানের বাড়িঘর, জাহিদ শেখের বাড়িঘর, সোহরাব শেখের বাড়িঘর, সাইফুল শেখের বাড়িঘর, মাহমুদ শেখের বাড়িঘর, মামুন শেখের বাড়িঘর, সেকন শেখের বাড়িঘর, মারুফ শেখের বাড়িঘর, আকিদুল শেখের বাড়িঘর, হাসমত শেখের বাড়িঘর, আমিন শেখের বাড়িঘর, শাহাবুদ্দিন শেখের বাড়িঘর, ইখতিয়ার শেখের বাড়িঘর, ইখলাস শশেখের বাড়িঘর, মামুন শেখের বাড়িঘর, ইস্কান্দার শেখের বাড়িঘর, আজিম গাজীর বাড়িঘর সহ কমপক্ষে ২৫ টি বাড়িঘর তান্ডব চালিয়ে ভাংচুর, লুটপাট সহ আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে।

ভুক্তভোগী বাবু শেখের স্ত্রী তসিরন অভিযোগ করে বলেন, ‘সোহেল মেম্বরের নেতৃত্বে আলমগীর, আজিজুল, মাহাবুর, রাসেল, মুক্তিসহ একদল দুর্বৃত্ত তাদের বাড়িতে হামলা চালায়। এসময় তার পরনে থাকা স্বর্ণের কানের দুল, স্বর্ণের চেইন, স্মার্ট ফোন এবং ঘরে থাকা সমস্ত আসবাবপত্র নিয়ে যায়। তার ছেলেরা বিদেশে থাকে। কষ্টে অর্জিত সমস্ত কিছু ধংশ করে দিয়েছে তারা। ভাংচুর, লুটপাট করেও খ্যান্ত হয়নি। শেষ পর্যন্ত রাতের বেলায় আমাদের বিল্ডিং পেট্রোল দিয়ে আগুন ধরিয়ে ধংস করে দেয়। আমরা এখন পুরোপুরি নি:শ্ব হয়ে পড়েছি। আমরা সৃষ্ট ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।

ভুক্তভোগী জাহিদুর রহমানের স্ত্রী চায়না বেগম বলেন

‘হাসান শেখের মৃত্যুর খবরের পর সোহেল মেম্বরের নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী বাহিনী দেশীয় অস্ত্রসস্ত্র সহ আমাদের বাড়িসহ অন্যান্য বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে ব্যপক ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। পুলিশ এক পাড়ায় অবস্থান করলে সন্ত্রাসীরা অন্য পাড়ায় গিয়ে ভাংচুর ও লুটপাট করে যাচ্ছে। ভয়ে আমরা বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছি। তাদের ভয়ভীতির কারনে আমরা এখনও বাড়িঘরে উঠতে পারছি না। আমরা প্রশাসনের দ্রুত সহযোগিতা কামনা করছি যেন আমরা দ্রুত বাড়িঘরে উঠতে পারি।

শেখ তৈয়বুরের স্ত্রী আঞ্জুয়ারা ও মেয়ে শিল্পী বেগম বলেন, ‘হাসান শেখ খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সোহেল মেম্বরের

নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী আমাদের বাড়িঘর ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে পায় ৬০ লক্ষ টাকার ক্ষয়ক্ষতি করেছে। আমাদের বাড়ির ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মহিলা ও তাদের ছেলেমেয়েরা বাড়িঘরে গেলে সন্ত্রাসীরা হুমকি ধামকি দিচ্ছে। দিনের বেলায় চুপচাপ থাকলেও রাতের আধারে সন্ত্রাসীরা গ্রামে ভাংচুর ও লুটপাট অব্যহত রেখেছে। আমরা এর থেকে পরিত্রাণ চাই।

ওহিদুল ইসলামের স্ত্রী ববিতা বেগম বলেন, আমরা এক কাপড়ে ঘর থেকে বের হয়েছি। ছেলেমেয়েরা স্কুলে যেতে পারছে না। ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে আমাদের সব শেষ করে দিয়েছে। আমাদের বাড়িতে আর থাকার মত কোন পরিবেশ নেই। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মানুষজন মানবেতর ভাবে জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। আমরা এই পরিবেশ থেকে বাচতে চাই।

স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ২৩ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টার দিকে নড়াগাতী থানার কলাবাড়িয়া ইউনিয়নের চরকান্দিপাড়ায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সোহেল মেম্বার গ্রুপ ও আবেদ শেখ গ্রুপের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শুরু হয়। দেশীয় অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষে হাসান শেখ গুলিবিদ্ধ হয় এবং ১১ জন আহত হন।

আহতদের প্রথমে কালিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে গুরুতর আহতদের খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হাসান শেখ বৃহস্পতিবার ভোরে মারা যান।

এ ঘটনায় নিহতের ভাই হোসেন শেখ বাদী হয়ে নড়াগাতী থানায় ৩৯ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। হত্যাকাণ্ডের পর উত্তেজিত হয়ে সোহেল মেম্বারের লোকজন আবেদ গ্রুপের লোকজনের বাড়িঘরে হামলা চালায় বলে অভিযোগ উঠেছে।

ভুক্তভোগীদের দাবি, এ হামলায় অন্তত ২০ থেকে ২৫ টি বাড়ি ভাংচুর, লুটপাট করে আগুন দেওয়া হয়েছে। এতে ভুক্তভোগীরা প্রায় ৮ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

নিহত ভ্যানচালক হাসান শেখের মা তাসলিমা বেগম (৬২) কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, আমি আমার সন্তান হাসান শেখ হত্যায় যারা জড়িত তাদেরকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি। এবং দোষীদের ফাঁসির দাবি জানাচ্ছি।

এ বিষয়ে নড়াগাতী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, মো: হোসেন আলী বলেন “হাসান শেখ হত্যা মামলায় ৩ জন এবং ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের দুটি পৃথক মামলায় আরও ৬ জনসহ মোট ৯ জনকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চরকান্দিপাড়া ও কলাবাড়িয়া এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। লুট হওয়া মালামালের কিছু অংশ কলাবাড়িয়ার বিভিন্ন এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। অপরাধীদের গ্রেফতার ও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে পুলিশ, ডিবি ও র‍্যাবের যৌথ অভিযান অব্যাহত আছে।”

বর্তমানে এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ভয়, আতঙ্ক আর চরম নিরাপত্তাহীনতায় কুঁকড়ে রয়েছে নড়াগাতী থানার কলাবাড়িয়া গ্রামের চরকান্দিপাড়া গ্রাম।