পাবনা গণপূর্তে একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ, কেন্দ্রবিন্দুতে নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ কবীর | Daily AjKaler Kontho

পাবনা গণপূর্তে একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ, কেন্দ্রবিন্দুতে নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ কবীর


নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশের সময় : অগাস্ট ২০, ২০২৬, ১২:২৯ অপরাহ্ন
পাবনা গণপূর্তে একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ, কেন্দ্রবিন্দুতে নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ কবীর

পাবনা গণপূর্ত বিভাগে একের পর এক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিভাগের বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ কবীর।

অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্ব পালনকালে ক্ষমতার অপব্যবহার, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও সরকারি অর্থের অপচয়সহ নানা কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছেন তিনি। তার বিরুদ্ধে নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে রাশেদ কবীরের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, পাবনা গণপূর্তের অধীনে নির্মাণাধীন পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে ৫০০ শয্যায় উন্নীতকরণ প্রকল্পের ১০ তলা মূল ভবনের বেজমেন্টের পিলার নির্মাণে পাথরের পরিবর্তে ব্রিকচিপস ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে গণপূর্ত বিভাগের অনিয়মের প্রতিবাদে মানববন্ধনের ঘোষণা দিয়েছিলেন স্থানীয় একটি সংগঠনের নেতা খালেদ হোসেন পরাগ। গত ২৩ জুলাই এ বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার পর সেটি পরবর্তীতে আর দেখা যায়নি বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে, গণপূর্ত বিভাগের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে রাজশাহী জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর কাছে চিঠি দেওয়া স্থানীয় ঠিকাদার মিনহাজ উদ্দিনকে একদল অপরিচিত ব্যক্তি বাড়ি থেকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পরে তাকে বিভিন্ন স্থানে ঘোরানোর পর গণপূর্ত কার্যালয়ে নিয়ে গিয়ে ওই অভিযোগের বিপরীতে আরেকটি চিঠি ও ভিডিও বক্তব্য নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ঘটনায় ঠিকাদার মিনহাজ উদ্দিন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানা গেছে।

টেন্ডার ও নির্মাণকাজে অনিয়মের অভিযোগ

পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রকল্পে পিপিআর বিধি লঙ্ঘন করে নির্মাণকাজের নামে বিপুল অর্থ ব্যয়ের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, মূল নির্মাণকাজ শেষ না হলেও ‘রিমেইনিং ওয়ার্কস’ দেখিয়ে একাধিক গ্রুপে দরপত্র আহ্বান করা হয় এবং পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার মাধ্যমে প্রায় ২৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা লোপাটের চেষ্টা করা হয়েছে।

এর মধ্যে হাসপাতাল ভবনের ‘এ’ ব্লকসংলগ্ন খোলা ছাদে কাচের কাজের জন্য টেন্ডার আইডি ১২১৭৬৫০-এর আওতায় প্রায় ৪ কোটি ৯৬ লাখ ৮৮ হাজার ৯৫৫ টাকার কাজ দেওয়া হয় এসএ এন্টারপ্রাইজকে। অভিযোগ রয়েছে, অর্থ পরিশোধ করা হলেও কাজটির বাস্তব অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার গণমাধ্যমের কাছে তার লাইসেন্স অন্য একজনকে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

রূপপুর গ্রিন সিটিতেও বড় অঙ্কের অনিয়মের অভিযোগ

পাবনার ঈশ্বরদীতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আবাসন প্রকল্প ‘গ্রিন সিটি’র ১১টি ভবনের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও জেনারেটর কেনাকাটায় বিপুল অঙ্কের আর্থিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) নিরীক্ষা প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি নির্ধারিত মূল্য প্রায় ২৭ কোটি টাকা হলেও এসব সরঞ্জাম কেনায় ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় ২১৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এতে অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ১৮৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দরপত্র প্রণয়ন, মূল্যায়ন, কাজের আদেশ, বিল অনুমোদন ও অর্থ পরিশোধের বিভিন্ন ধাপে অনিয়মের কারণে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আপত্তিকৃত অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত আনার সুপারিশ করা হয়েছে।

একটি ভবনেই অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ প্রায় ১৮ কোটি টাকা

সিএজি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা একটি ভবনের হিসাবেও বড় ধরনের অস্বাভাবিকতার তথ্য পাওয়া যায়। উচ্চ ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রপাতির সরকারি নির্ধারিত মূল্য ছিল প্রায় ১০ লাখ ৩২ হাজার টাকা, বিপরীতে বিল করা হয়েছে ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

একটি ডিস্ট্রিবিউশন ট্রান্সফরমারের নির্ধারিত মূল্য প্রায় ৪০ লাখ ৪০ হাজার টাকা হলেও বিল করা হয়েছে ৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা। নিম্ন ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জামের সরকারি মূল্য প্রায় ১৬ লাখ ৩১ হাজার টাকা হলেও বিল দেখানো হয়েছে ৩ কোটি ২ লাখ টাকা।

এছাড়া পাওয়ার ফ্যাক্টর কারেকশন প্যানেলের মূল্য ১০ লাখ টাকার কম হলেও এর বিপরীতে প্রায় ২ কোটি টাকা এবং দুটি জেনারেটরের সরকারি মূল্য প্রায় ১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা হলেও বিল করা হয়েছে প্রায় ৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।

এই পাঁচ ধরনের সরঞ্জামের জন্য মোট প্রায় ১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা বিল করা হলেও সরকারি নির্ধারিত মূল্য ছিল প্রায় ১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তিন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অস্বাভাবিক ব্যয়ের অভিযোগ

নথিপত্রের বরাত দিয়ে জানা যায়, মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেড পাঁচটি ভবনের কাজের জন্য প্রায় ৯২ কোটি টাকা পেয়েছে। এসব সরঞ্জামের সরকারি মূল্য ছিল প্রায় ১২ কোটি ২৭ লাখ টাকা।

সাজিন কনস্ট্রাকশনের একটি প্রতিষ্ঠান সাজিন এন্টারপ্রাইজ চারটি ভবনের জন্য প্রায় ৮২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা পেয়েছে, যেখানে সরকারি মূল্য ছিল প্রায় ৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা। আর এমএসসিএল-জিকেবিপিএল যৌথ উদ্যোগ দুটি ভবনের জন্য পেয়েছে প্রায় ৩৯ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, বিপরীতে সরকারি মূল্য ছিল প্রায় ৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা।

সব মিলিয়ে তিন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ২১৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা দেওয়া হলেও একই সরঞ্জামের সরকারি মূল্য প্রায় ২৬ কোটি ৯৯ লাখ টাকা বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে পাবনা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ কবীরের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তার কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

আজকালের কন্ঠ/আর বি