দুই বাংলার আলোচিত কথাসাহিত্যিক শাম্মী তুলতুল: বহুমাত্রিক প্রতিভায় উজ্জ্বল এক সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব | Daily AjKaler Kontho

দুই বাংলার আলোচিত কথাসাহিত্যিক শাম্মী তুলতুল: বহুমাত্রিক প্রতিভায় উজ্জ্বল এক সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব


ময়মনসিংহ ব্যুরো চিফ প্রকাশের সময় : এপ্রিল ১৮, ২০২৬, ১:৩৫ অপরাহ্ন
দুই বাংলার আলোচিত কথাসাহিত্যিক শাম্মী তুলতুল: বহুমাত্রিক প্রতিভায় উজ্জ্বল এক সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব

চট্টগ্রামের মাটি থেকে উঠে এসে দুই বাংলার সাহিত্যাঙ্গনে নিজস্ব আলো ছড়িয়ে দেওয়া এক উজ্জ্বল নাম—শাম্মী তুলতুল। সমকালীন বাংলা সাহিত্যে বহুমাত্রিক প্রতিভার পরিচয়ে যাঁরা আলোচিত, তাঁদের মধ্যে তিনি নিঃসন্দেহে একজন জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক।

সাহিত্য-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ঐতিহ্যবাহী পরিবারে জন্ম নেওয়া শাম্মী তুলতুলের বেড়ে ওঠা ছিল চিন্তা, চেতনা ও সংস্কৃতির আলোকিত পরিবেশে। তাঁর দাদা আব্দুল কুদ্দুস মাস্টার ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতা, লেখক এবং বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের বাল্যবন্ধু। বাবা আলহাজ্ব আবু মোহাম্মদ খালেদ ছিলেন শিক্ষাবিদ ও মুক্তিযোদ্ধা এবং মা কাজী রওশন আখতার সমাজসেবায় নিবেদিতপ্রাণ। ফলে পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে সাহিত্যচর্চার বীজ রোপিত হয়।

শৈশবে প্রাণবন্ত ও ডানপিটে স্বভাবের শাম্মী তুলতুল নাচ, গান, আবৃত্তি ও খেলাধুলায় সমান পারদর্শিতা দেখালেও সময়ের সঙ্গে লেখালেখিই হয়ে ওঠে তাঁর প্রধান পরিচয়। বর্তমানে তিনি একাধারে লেখক, উপন্যাসিক, গল্পকার, শিশুসাহিত্যিক, নজরুল অনুরাগী, রেডিও অনুষ্ঠান পরিচালক, খবর পাঠিকা, অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট, সাংবাদিক, ভয়েস প্রেজেন্টার, দাবা খেলোয়াড় ও মডেল হিসেবে কাজ করছেন। বহুমাত্রিক এই পরিচয় তাঁর সৃষ্টিশীলতার বিস্তৃত পরিধিকেই তুলে ধরে।

এ পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১৬টি। ২০২২ সালের কলকাতা বইমেলায় প্রকাশিত তাঁর গল্পগ্রন্থ ‘নরকে আলিঙ্গন’ পাঠকমহলে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং বর্তমানে ভারতের জনপ্রিয় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ফ্লিপকার্টে পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া তাঁর জনপ্রিয় উপন্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘চোরাবালির বাসিন্দা’, ‘পদ্মবু’ ও ‘মনজুয়াড়ি’—যেগুলো পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করে বেস্টসেলার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। তাঁর প্রতিটি রচনায় বিনোদনের পাশাপাশি শিক্ষণীয় বার্তা স্থান পায়, যা তাঁকে শুধু একজন গল্পকার নয়, বরং সামাজিক দায়বদ্ধ লেখক হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছে।

শিশু-কিশোর সাহিত্যে তাঁর অবদানও উল্লেখযোগ্য। তাঁর লেখা ‘পিঁপড়ে ও হাতির যুদ্ধ’ গল্পটি দীপ্ত টিভিতে নাট্যরূপে প্রচারিত হয়েছে। পাশাপাশি তাঁর রচনায় নির্মিত ‘লাল শরবত’ নাটক সম্প্রচারিত হয়েছে সিটি এফএমে। সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর একটি গল্প ভারতে গবেষণার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা তাঁর সাহিত্যকর্মের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ বহন করে। তিনি “রুম টু রিড বাংলাদেশ”-এর নির্বাচিত লেখিকা হিসেবেও সম্মাননা অর্জন করেছেন।

লেখালেখির স্বীকৃতি হিসেবে শাম্মী তুলতুল অর্জন করেছেন বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—মাদার তেরেসা অ্যাওয়ার্ড, মহাত্মা গান্ধী পিস অ্যাওয়ার্ড, সাউথ এশিয়া গোল্ডেন পিস অ্যাওয়ার্ড, নজরুল অগ্নিবীণা সাহিত্য পুরস্কার, সোনার বাংলা সাহিত্য সম্মাননা, রোটারি সম্মাননা, উইমেন পাওয়ার লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড ২০২৫, ময়ূরপঙ্খী স্টার অ্যাওয়ার্ড ২০২৫ এবং খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক সম্মাননা। খাগড়াছড়ির পাঠকসমাজ ভালোবেসে তাঁকে ‘রাজকন্যা’ উপাধিতে ভূষিত করেছে।

সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি গণমাধ্যমেও রয়েছে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি। তিনি নিয়মিত রেডিওতে খবর পাঠ করেন এবং টেলিভিশনে আবৃত্তি পরিবেশন করেন। সম্প্রতি বেগম রোকেয়া চরিত্রে একটি ম্যাগাজিনের কভার মডেল হিসেবে উপস্থিত হয়ে নতুন করে আলোচনায় আসেন, যা তাঁর বহুমাত্রিক সত্তার আরেকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

সামাজিক ও পারিবারিক নানা প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে নিজের অবস্থান তৈরি করার সংগ্রামই শাম্মী তুলতুলের ব্যক্তিত্বের অন্যতম শক্তিশালী দিক। তাঁর লেখালেখি কেবল সৃজনশীলতার বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং আত্মবিশ্বাস, প্রতিরোধ এবং সামাজিক সচেতনতারও প্রতিচ্ছবি।

নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে শাম্মী তুলতুল বলেন, লেখালেখি তাঁর কাছে শুধু পেশা নয়—এটি এক ধরনের দায়বদ্ধতা। মানুষের হৃদয়ে আলো পৌঁছে দেওয়ার এক অবিরাম প্রয়াস হিসেবেই তিনি সাহিত্যচর্চা করে যাচ্ছেন। তাঁর বিশ্বাস, সাহিত্য মানুষের ভেতরের অন্ধকার দূর করে আলোর দিশা দেখাতে পারে। জনপ্রিয়তার চেয়ে পাঠকের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনাই তাঁর কাছে বড় প্রাপ্তি।

সব মিলিয়ে বলা যায়, শাম্মী তুলতুল এখন শুধু একজন লেখক নন; তিনি সমকালীন বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল সম্ভাবনা, যাঁর সৃষ্টিশীলতা দুই বাংলার গণ্ডি পেরিয়ে আরও বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে পড়ছে।

আজকালের কন্ঠ/আর বি