
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বাড়তে থাকা উত্তেজনা—বিশেষত ইরান ও ইসরাইলের সম্ভাব্য সংঘাত—শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশের মতো দেশ, যার অর্থনীতির একটি বড় ভরকেন্দ্র প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স, সেই প্রভাবের বাইরে থাকার সুযোগ নেই। যুদ্ধ যদি বিস্তৃত আকার ধারণ করে, তবে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশির জীবন, কর্মসংস্থান এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ একসঙ্গে সংকটে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের শ্রমবাজারের একটি বড় অংশ গত কয়েক দশকে মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর হয়ে উঠেছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান এবং বাহরাইন—এই ছয়টি উপসাগরীয় দেশে কয়েক মিলিয়ন বাংলাদেশি কর্মরত। তারা নির্মাণ, সেবা, তেল–গ্যাস, পরিবহন, খুচরা ব্যবসা এবং গৃহকর্মসহ নানা খাতে কাজ করেন। বাংলাদেশ ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট রেমিট্যান্সের বড় অংশই আসে এই অঞ্চল থেকে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বা সামরিক অস্থিরতা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সরাসরি না হলেও গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
ইরান–ইসরাইল উত্তেজনা নতুন কোনো ঘটনা নয়, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা আরও তীব্র হয়েছে। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, সিরিয়া ও লেবাননে প্রক্সি সংঘাত, এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ—সব মিলিয়ে অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরেই অস্থিতিশীল। যদি এই উত্তেজনা সরাসরি সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়, তবে তার অভিঘাত শুধু দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং সমগ্র উপসাগরীয় অর্থনীতিতে তার ঢেউ লাগবে।
এই প্রেক্ষাপটে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক বাস্তবতা হলো হরমুজ প্রণালী। পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্বের বৃহত্তর সমুদ্রে যাওয়ার প্রধান পথ এই সরু প্রণালী, যার মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থাগুলোর মতে, বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়ে যায়। যদি যুদ্ধের কারণে এই প্রণালীতে অস্থিরতা তৈরি হয়, তবে জ্বালানির দাম বাড়বে, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিতেও চাপ পড়বে। আর এই অর্থনৈতিক চাপের প্রথম আঘাত পড়তে পারে অভিবাসী শ্রমবাজারে।
অতীতে দেখা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক মন্দা বা রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় বিদেশি শ্রমিকরা প্রথমে কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন। নির্মাণ প্রকল্প স্থগিত হওয়া, নতুন প্রকল্প কমে যাওয়া, কিংবা ব্যবসায়িক ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত—এসব ক্ষেত্রে বিদেশি শ্রমিকদের ওপরই প্রভাব পড়ে বেশি। বাংলাদেশি শ্রমিকদের বড় অংশ যেহেতু নিম্ন ও মধ্যদক্ষতার কাজ করেন, তাই অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিলে তাদের চাকরি হারানোর ঝুঁকিও তুলনামূলক বেশি থাকে।
এর আরেকটি দিক হলো রেমিট্যান্স প্রবাহের সম্ভাব্য পরিবর্তন। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স শুধু পারিবারিক আয়ের উৎস নয়; এটি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী রাখার একটি প্রধান ভিত্তি। বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষণেও দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত শুরু হয় এবং শ্রমবাজার সংকুচিত হয়, তাহলে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে ধাক্কা লাগতে পারে—যার প্রভাব পড়বে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর।
আরেকটি মানবিক প্রশ্নও এখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ বা সামরিক উত্তেজনা বাড়লে প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা, বসবাস ও চলাচল নিয়েও উদ্বেগ দেখা দেয়। প্রবাসীরা সাধারণত স্থানীয় সমাজের প্রান্তিক স্তরে বসবাস করেন এবং অনেক সময় তাদের জন্য জরুরি সহায়তা পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। অতীতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাত—যেমন উপসাগরীয় যুদ্ধ বা ইয়েমেন সংকট—এর সময় অনেক বিদেশি শ্রমিককে হঠাৎ করে দেশে ফিরতে হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা দেখায়, এ ধরনের পরিস্থিতিতে দ্রুত কূটনৈতিক তৎপরতা এবং জরুরি সহায়তা ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য নীতিগত কিছু প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমত, শ্রমবাজারের বৈচিত্র্য বাড়ানো জরুরি। দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা বাংলাদেশের শ্রমবাজারকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলে নতুন শ্রমবাজার খোঁজা এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে কর্ম
সংস্থানের সুযোগ বাড়ানো দরকার। দ্বিতীয়ত, প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও সহায়তার জন্য দূতাবাসগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। তৃতীয়ত, দেশে ফিরে আসা শ্রমিকদের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের জন্য কার্যকর নীতি থাকা দরকার।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও যুদ্ধের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের হাতে নেই। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের প্রভাব বাংলাদেশের ঘরে ঘরে পৌঁছাতে পারে—প্রবাসী আয়ের মাধ্যমে, শ্রমবাজারের মাধ্যমে, কিংবা জ্বালানি ও পণ্যের মূল্যের মাধ্যমে। তাই মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি উত্তেজনাই আমাদের জন্য শুধু দূরবর্তী কূটনৈতিক খবর নয়; বরং অর্থনীতি ও সমাজের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি বাস্তবতা।
ইরান–ইসরাইল উত্তেজনা যদি বড় সংঘাতে রূপ নেয়, তবে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিকেই বদলে দেবে না; বরং বাংলাদেশের রেমিট্যান্সনির্ভর অর্থনীতির ওপরও নতুন চাপ সৃষ্টি করবে। তাই এখনই দূরদর্শী কূটনীতি, শ্রমবাজার বৈচিত্র্য এবং প্রবাসী সুরক্ষার সমন্বিত নীতি গ্রহণ করা সময়ের দাবি। কারণ, প্রবাসীদের ঘামে গড়ে ওঠা রেমিট্যান্সের প্রবাহই বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম শক্তি—আর সেই শক্তিকে টিকিয়ে রাখাই আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আজকালের কন্ঠ/ আর এস/আর
আপনার মতামত লিখুন :