
শাহজাহান আলী মনন, সৈয়দপুর (নীলফামারী) প্রতিনিধি : নিজ জিম্মায় থাকা রাষ্ট্রীয় সম্পদ রেললাইন (রেলপাত) চুরি করে বিক্রির মামলায় নীলফামারীর সৈয়দপুর রেলওয়ের এক প্রকৌশলী এখন জেল হাজতে। তার নাম সুলতান মৃধা। তিনি সৈয়দপুর রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন পিডাব্লিউ অফিস তথা এসএসএই/ওয়ে/সৈয়দপুর কার্যালয়ের ইনচার্জ উর্দ্ধতন উপসহকারী প্রকৌশলী (পথ)।
শুক্রবার (২০ জুন) সকালে তাকে সৈয়দপুর রেলওয়ে থানা পুলিশ আদালতে পাঠায়। এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকাল ৩ টায় তার অফিস থেকে রেলওয়ে পুলিশ ও রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি) তাকে আটক করে। সন্ধ্যায় তার উর্ধতন কর্মকর্তা পার্বতীপুর রেলওয়ের সহকারী প্রকৌশলী (এইএন) তহিদুল ইসলাম বাদী হয়ে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। মামলা নং ১।
মামলার বাদী তহিদুল ইসলাম বলেন, গতকাল ১৯ জুন সকাল সাড়ে ১০ টায় রাজশাহীস্থ বাংলাদেশ রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ট্র্যাক) এবং পাকশীর বিভাগীয় প্রকৌশলী-২ মহোদয়ের নম্বর থেকে ফোন আসে। তাঁরা বলেন, তিনি সৈয়দপুর রেলওয়ের এসএসএই/ওয়ে/সৈয়দপুর অফিসের ইনচার্জ মো. সুলতান মৃধা (৫৮) তার অফিসের ভিতরে গোডাউনে রক্ষিত রেলের পাত রেল কাটার কাজে ব্যবহৃত গ্যাস সিলিন্ডার দিয়ে কেটে চুরি করে চোরাই পথে বিক্রির উদ্দেশ্যে জমা রেখেছেন।
এমনকি স্থানীয় সাংবাদিক এ সংক্রান্ত ভিডিও স্যারকে হোয়াটসএ্যাপে সরবরাহ করেছেন। এমন সংবাদের প্রেক্ষিতে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তাৎক্ষণিকভাবে আমি সড়ক পথে পার্বতীপুর হতে সৈয়দপুর রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন এসএসএই/ওয়ে/সৈয়দপুর দপ্তরে হাজির হয়ে গোডাউন খুলে পরিদর্শন করি। তখন দেখতে পাই চারটি অক্সিএসিটিলিন সিলিন্ডার এবং একটি এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডারসহ রেল কাটিং ক্যাবল ও ২৫ টুকরা বিভিন্ন সাইজের কাটা রেল গোডাউনের ভিতরে বিদ্যমান। যার মূল্য প্রায় ১ লাখ টাকা।
রেলওয়ে ম্যানুয়াল কোড মোতাবেক এ ধরনের কাজ একটি অপরাধ এবং দুরভিসন্ধিমূলক। আসামী সুলতান মৃধা (৫৮) একজন রেলওয়ে কর্মচারী হয়ে অজ্ঞাতনামা ৫-৭ জন আসামীসহ পরস্পর যোগসাজশে চুরি করার উদ্দেশ্যে গ্যাস সিলিন্ডার সমূহ গোডাউন ঘরে এনে গ্যাস দিয়ে রেল লাইন ছোট ছোট টুকরো করে কেটে ক্ষতি সাধনসহ চুরির উদ্যোগ নিয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। যা বাংলাদেশ পেনাল কোড ১৮৬০ এর ৩৮১/৫১১/৪২৭/৩৪ ধারার অপরাধ।
তিনি আরও বলেন, আমি এর আগে গত ৩০ এপ্রিল ওই অফিস ও স্টোর পরিদর্শন করেছিলাম। এমতাবস্থায় ওইদিন হতে ১৯ জুন বেলা আড়াইটার মধ্যে যেকোন সময় আসামীরা এজাহারে বর্নিত অপরাধ সংঘটিত করেছে। তাই ওই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থাকা মোঃ সুলতান মৃধা (৫৮) কে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে মোতাবেক আরএনবির সহোযোগীতায় আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে সৈয়দপুর রেলওয়ে থানায় হস্তান্তর পূর্বক এজাহার দায়ের করেছি। এতে, উল্লেখিত চুরির বিষয়ে প্রধান আসামী মো. সুলতান মৃধার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আবেদন করেছি।
উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার ভোরে সুলতান মৃধা প্রায় ২ পিক-আপ কাটা রেললাইন পাচার করেছে। এখবর পেয়ে সাংবাদিক জাকির হোসেন ও শাহজাহান আলী সকাল ১০ টায় ওই অফিসে পৌঁছে বিভিন্ন আলামতের ভিত্তিতে সত্যতা নিশ্চিত হয়। এসময় ইনচার্জ সুলতান মৃধা বিষয়টি অস্বীকার করেন এবং স্টোর খুলে দেখাতে গড়িমসি করেন। এর প্রেক্ষিতে স্থানীয় আরএনবি সদস্যদের সহায়তায় স্টোর খুললে সেখানে গ্যাস সিলিন্ডার ও কাটার মেশিনসহ টুকরো টুকরো করে রাখা রেললাইন দেখতে পায়।
তখন সাংবাদিকদ্বয় বিষয়টি রেলওয়ের উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানান। এসময় তারা বিষয়টি তেমন গুরুত্ব দেননি। তখন এই অফিসের উর্ধতন কর্তৃপক্ষ পার্বতীপুর রেলওয়ের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী তৌহিদুল ইসলাম বলেন, স্টোরে বা ইয়ার্ডে রেললাইন কাটার কোন নিয়ম নাই। তাছাড়া গ্যাস ব্যবহার কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একইভাবে গ্যাস সিলিন্ডার রাখাও বৈধ নয়। আমি এবিষয়ে কিছু জানিনা। সব দায়িত্ব ইনচার্জের।
সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় তত্বাবধায়ক শাহ সুফি নুর মোহাম্মদ বলেন, পিডাব্লিউ এর ওই ইনচার্জের বিরুদ্ধে এধরনের অনেক অভিযোগ পেয়েছি। কিন্তু তথ্য প্রমাণ না পাওয়ায় ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হচ্ছেনা। আপনারা তাকে হাতেনাতে ধরিয়ে দেন। তাহলে বেশ উপকৃত হতাম। এমন জনবল রেলওয়ের জন্য ক্ষতিকর।
রাজশাহীস্থ বাংলাদেশ রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ট্রাক) আহসান জাবির মুঠোফোনে বলেন, তথ্য প্রমাণ থাকলে আপনারা নিউজ করেন। তাহলে আমরা তদন্ত সাপেক্ষে প্রমাণ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নিবো।
তাদের মন্তব্য নিয়ে সাংবাদিক শাহজাহান আলী সংবাদ প্রকাশ করেন। এরপর কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে এবং তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেন। সে অনুযায়ী আরএনবি ও রেলওয়ে পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী যৌথ অভিযান চালিয়ে সত্যতা পেয়ে সুলতান মৃধাকে আটক করে সৈয়দপুর রেলওয়ে থানায় নেয়। পরে মামলা দায়ের করে তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
সুলতান মৃধা মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার চর কামার হাওয়ালদার কান্দি এলাকার মৃত হবির উদ্দিন মৃধার ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন থেকে সৈয়দপুর পিডাব্লিউ অফিসের দায়িত্বে থেকে একের পর এক এধরণের অপকর্ম করে চলেছেন। রেলওয়ে শ্রমিকলীগের ওপেন লাইন শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক পদে থেকে তিনি সেই দাপটে এসব করতেন। রেলওয়ের প্রধান কার্যালয় তথা রেল ভবনের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা তার আত্মীয় হওয়ায় একাধিকবার তার অপকর্ম ধরা পড়লেও তিনি বার বার পার পেয়ে গেছেন।
রেলওয়ের মালামাল চুরিসহ নানা অনিয়ম মাধ্যমে রক্ষকের দায়িত্বে থেকে ভক্ষক হয়ে সরকারি কোটি কোটি টাকা পকেটস্থ করেছেন। এছাড়াও নারীঘটিত দুষ্কর্মের সাথেও তিনি জড়িত। একারণেও তিনি জনতার হাতে পাকড়াও হয়েছিলেন। কিন্তু পাপ বাপকেও ছাড়েনা। সর্বশেষে তিনি আটক হলেন। তার আর মাত্র ৬ মাস চাকুরীর মেয়াদ আছে বলে জানা গেছে। তার আটকের খবরে সৈয়দপুর রেলওয়ে অঙ্গনে চাঞ্চল্যের সুৃষ্টি হয়েছে।
আপনার মতামত লিখুন :