সাংবাদিক আলিফ হত্যা ঘিরে নতুন রহস্য, আগাম নিরাপত্তা চেয়েও রক্ষা পাননি তিনি- পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের সন্দেহ, নেপথ্যে শুটার বাহিনী? | Daily AjKaler Kontho

সাংবাদিক আলিফ হত্যা ঘিরে নতুন রহস্য, আগাম নিরাপত্তা চেয়েও রক্ষা পাননি তিনি- পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের সন্দেহ, নেপথ্যে শুটার বাহিনী?


মোঃ আমিনূর ইসলাম রাব্বি, ময়মনসিংহ ব্যুরো প্রকাশের সময় : অক্টোবর ১৭, ২০২৬, ৬:৪২ অপরাহ্ন
সাংবাদিক আলিফ হত্যা ঘিরে নতুন রহস্য, আগাম নিরাপত্তা চেয়েও রক্ষা পাননি তিনি-  পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের সন্দেহ, নেপথ্যে শুটার বাহিনী?

নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মাদক, অস্ত্র ও চোরাচালান চক্রের তৎপরতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। নেত্রকোনার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা এবং ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটসহ বিভিন্ন সীমান্তপথ দিয়ে মাদক, অস্ত্র ও চোরাচালানি পণ্য দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের দাবি, এসব এলাকায় সংঘবদ্ধ চোরাচালান চক্র সক্রিয় রয়েছে। এসব চক্রের সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক আশ্রয়দাতা ও সশস্ত্র অপরাধীদের যোগসাজশ রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের দাবি, সীমান্তপথে বিপুল পরিমাণ অবৈধ পণ্য দেশে প্রবেশ করছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া প্রয়োজন। সাংবাদিক আলিফ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এসব চক্রের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র, পেশাদার শুটার কিংবা কোনো প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয় রয়েছে কি না, তা নিয়ে স্থানীয়ভাবে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

তবে এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই; তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন জরুরি।

হত্যার আশঙ্কা জানিয়েও কেন পেলেন না নিরাপত্তা?

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক সপ্তাহ আগে নিজের জীবন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে পুলিশের কাছে নিরাপত্তা চেয়েছিলেন সাংবাদিক আলিফ—এমন দাবি সামনে এসেছে। একটি আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক সভায় প্রকাশ্যে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানানোর পরও কেন তাঁর জীবন রক্ষা করা গেল না, সেই প্রশ্ন এখন সাংবাদিক সমাজ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে নেত্রকোনা জেলা পুলিশের একটি আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক সভায় সাংবাদিক আলিফকে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে দেখা যায় বলে দাবি করা হচ্ছে।

সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশের চেয়ারম্যান সিনিয়র সাংবাদিক মো. খায়রুল আলম রফিকের ভাষ্য অনুযায়ী, ভিডিওতে সাংবাদিক আলিফকে নিজের জীবন রক্ষার আকুতি জানাতে শোনা যায়। সেখানে তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি বাড়িতে গেলে মেরে ফেলবে। আমাকে পাঁচটা গুলি করবে। অস্ত্র নিয়ে তারা ঘুরছে। আমাকে বাঁচান।’

এমন গুরুতর আশঙ্কার কথা জানানোর পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সম্ভাব্য হামলাকারীদের শনাক্ত, অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান এবং সাংবাদিক আলিফের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা জনসমক্ষে স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছেন সাংবাদিক নেতারা।

তবে দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ বলেছেন, ‘আমি তাকে অনেকবার সতর্ক করেছি। তিনি আমাদের কথা শোনেননি। আসামিদের গ্রেপ্তার করতে অভিযান চলছে।

পুলিশের এই বক্তব্যের পাশাপাশি হত্যার আগে আলিফের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি কীভাবে বিবেচনা করা হয়েছিল, তা-ও তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।

সীমান্তের চোরাচালান চক্র নিয়ে অভিযোগ

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দুর্গাপুর, কলমাকান্দা ও হালুয়াঘাটের বিভিন্ন সীমান্তপথ ব্যবহার করে মাদক, অস্ত্র ও নানা ধরনের অবৈধ পণ্য দেশে প্রবেশ করছে। তাঁদের দাবি, এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে শুধু পণ্য বহনকারীরাই জড়িত নন; এর পেছনে অর্থের জোগানদাতা, পরিবহনকারী এবং সশস্ত্র সহযোগীদের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকতে পারে।

স্থানীয় সূত্রগুলোর অভিযোগ, এসব অবৈধ ব্যবসার স্বার্থ রক্ষায় কোনো কোনো চক্র এলাকায় ভয়ভীতি প্রদর্শন করে। তাদের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া কিংবা এসব বিষয়ে তথ্য প্রকাশের চেষ্টা করলে হুমকির মুখে পড়তে হতে পারে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের।

এমনকি এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কারও কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য উদ্‌ঘাটন জরুরি।

ফেসবুকে অপরাধী চক্র নিয়ে লেখালেখি করেছিলেন আলিফ। সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশের নেতাদের দাবি, সাংবাদিক আলিফ তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে স্থানীয় মাফিয়া চক্র, মাদকের গডফাদার, কথিত ভাড়াটে খুনি ও অস্ত্রধারী অপরাধীদের নিয়ে লেখালেখি করেছিলেন।

এসব লেখালেখির সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। এ জন্য আলিফের ফেসবুক পোস্ট, পূর্ববর্তী হুমকির তথ্য, সম্ভাব্য বিরোধ এবং হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গতিবিধি তদন্তের আওতায় আনার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সেলের পরিচালক মোহাম্মদ আলী আবির বলেন, ‘স্থানীয় বিএনপির এক শীর্ষস্থানীয় নেতার ভাইয়ের মাধ্যমে শুটার দিয়ে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে বলে আমাদের সন্দেহ। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন। এটি তাঁর উত্থাপিত একটি অভিযোগ ও সন্দেহ। এর সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের ফলাফল এবং তাঁদের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ।

দ্রুত গ্রেপ্তার ও ১৫ দিনের মধ্যে অভিযোগপত্র দাখিলের দাবি। সাংবাদিক আলিফ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও আসামিদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশের পরিচালক মোহাম্মদ আলী আবির। তিনি বলেন, ‘প্রশাসন এখনো নীরব কেন? হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করতে কি মঙ্গল গ্রহে যেতে হবে? প্রকাশ্যে একজন সাংবাদিককে গুলি করে হত্যা করা হলো, অথচ অপরাধীদের গ্রেপ্তারে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই কেন?’

তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা না হলে পুলিশ সুপারের কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচি দেওয়া হবে। একই সঙ্গে দ্রুত তদন্ত শেষ করে ১৫ দিনের মধ্যে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের দাবি জানান তিনি।

মোহাম্মদ আলী আবির অভিযোগ করেন, একজন সাংবাদিক বারবার হত্যার আশঙ্কা প্রকাশ করার পরও তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়নি। সম্ভাব্য অপরাধীদের বিরুদ্ধে আগে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলে হয়তো এমন মর্মান্তিক ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো।

তবে হত্যাকাণ্ডের আগে পুলিশ কী ব্যবস্থা নিয়েছিল এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতে কোনো ঘাটতি ছিল কি না, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। দুই শিশুসন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ। নিহত সাংবাদিক আলিফের পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশের চেয়ারম্যান সিনিয়র সাংবাদিক মো. খায়রুল আলম রফিক। তিনি বলেন, ‘সাংবাদিক আলিফের দুটি শিশুসন্তান রয়েছে। তাদের মাথার ওপর থেকে বাবার ছায়া কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এই শিশুরা এখন কোথায় যাবে? কার কাছে যাবে? তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে?

তিনি আরও বলেন, ‘রাষ্ট্রকে অবশ্যই এই অসহায় শিশুদের দায়িত্ব নিতে হবে। তাদের নিরাপত্তা, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নিহত সাংবাদিকের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

শুধু হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। একজন সাংবাদিক আগাম নিরাপত্তা চেয়েও কেন জীবন রক্ষা করতে পারলেন না, তার জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। খায়রুল আলম রফিক বলেন, ‘আমরা সাংবাদিক আলিফ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত চাই। প্রকৃত হত্যাকারী, পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা এবং নেপথ্যের আশ্রয়দাতাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। কোনো রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়ে অপরাধীরা যেন পার পেয়ে না যায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, সীমান্তবর্তী অঞ্চলের চোরাচালান নেটওয়ার্কের সঙ্গে সাংবাদিক আলিফ হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে।

নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি

সাংবাদিক সমাজের দাবি, সাংবাদিক আলিফ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত যেন কোনো প্রভাবশালী মহলের চাপে বাধাগ্রস্ত না হয়। একই সঙ্গে নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন এবং প্রকৃত অপরাধীরা যেন আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে না পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে।

তদন্তের স্বার্থে হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য উদ্দেশ্য, পূর্ববর্তী হুমকি, সন্দেহভাজনদের ভূমিকা, ব্যবহৃত অস্ত্রের উৎস এবং ঘটনার সঙ্গে কোনো সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

সাংবাদিক আলিফের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়; এটি সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা, নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব পালনের বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে।

এখন সবার প্রত্যাশা, সাংবাদিক আলিফ হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্‌ঘাটিত হবে, জড়িত ব্যক্তিরা যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে শনাক্ত হয়ে আইনের আওতায় আসবেন এবং আগাম নিরাপত্তা চেয়েও একজন সাংবাদিকের জীবন রক্ষা না হওয়ার কারণ জনগণের সামনে স্পষ্ট করা হবে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-সাংবাদিক আলিফ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কারা? জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে আকুতি জানানোর পরও কেন তাঁকে রক্ষা করা গেল না?