জবিতে যোগ্যদের বঞ্চিত করে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতিতে, নেপথ্যে কর্মকর্তা সমিতির সমিতি সম্পাদক | Daily AjKaler Kontho

জবিতে যোগ্যদের বঞ্চিত করে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতিতে, নেপথ্যে কর্মকর্তা সমিতির সমিতি সম্পাদক


জবি প্রতিনিধি প্রকাশের সময় : অক্টোবর ১১, ২০২৬, ৬:১৫ অপরাহ্ন
জবিতে যোগ্যদের বঞ্চিত করে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতিতে, নেপথ্যে কর্মকর্তা সমিতির সমিতি সম্পাদক

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে পদোন্নতির অপেক্ষায় রয়েছেন ভিসি মিজানের আস্থাভাজন ও ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্ট ১২ কর্মকর্তা। এই পদোন্নতিতে সহায়তা করার অভিযোগ উঠেছে স্বয়ং কর্মকর্তা সমিতির বিরুদ্ধে৷ অপরদিকে যোগ্য ও জ্যেষ্ঠ হওয়া স্বত্বেও ১ বছর ধরে আটকে রাখা হয়েছে ৭০ জনের বেশি কর্মকর্তা কর্মচারীর পদোন্নতি। এছাড়া নিজের জেলার কর্মকর্তাদের পদোন্নতি নিশ্চিতে তড়িঘড়ি করে নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়ার অভিযোগও উঠেছে কর্মকর্তা সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হালিম এর বিরুদ্ধে।

জানা যায়, ২০১৪-২০২১ সালে সাবেক উপাচার্য মিজানুর রহমানের ছত্রছায়ায় অবৈধভাবে নিয়োগ প্রাপ্ত ১২ জন কর্মকর্তা পদোন্নতির অপেক্ষায় রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তাদের মধ্যে অনেকে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই ভিসি মিজানের বিশের ক্ষমতাবলে অবৈধভাবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। ইতোমধ্যে যাচাই বাছাই বোর্ড থেকে সুপারিশ পেয়েছেন তারা। চলতি মাসের ১৩-১৪ তারিখে তাদের ভাইবা বোর্ড হওয়ার কথা রয়েছে।

এদের মধ্যে ছাত্রলীগ নেতা থেকে কর্মকর্তা বনে যাওয়া আইটি সেলে ৪ কর্মকর্তাও পদোন্নতির অপেক্ষায় রয়েছেন৷ এই ৪ জনই কর্মকর্তা সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হালিমের আস্থাভাজন বলে জানা যায়। নিজের জেলার হওয়ায় তাদের পদোন্নতি নিশ্চিতে তড়িঘড়ি করে নিয়োগ নীতিমালা প্রণয়ন করার অভিযোগও উঠেছে আব্দুল হালিমের বিরুদ্ধে। এভাবে বিতর্কিত ও সুবিধাভোগীরা অবাধে পদোন্নতি পেয়ে প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। অপরদিকে ৮০ তম সিন্ডিকেটের প্রজ্ঞাপন বাতিল করে ৭০ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি বঞ্চিত করে রাখার অভিযোগ উঠেছে ৷

২০১৯ সালের ৮০ তম সিন্ডিকেট এর প্রজ্ঞাপন মতে, যেকোন কর্মকর্তা বা কর্মচারী শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্ত পূরণ সাপেক্ষে সর্বোচ্চ ডেপুটি রেজিস্ট্রার পর্যন্ত পদোন্নতি পাবেন৷ সেই নিয়ম মেনে বিভিন্ন গ্রেডে পদোন্নতি পেতে আবেদন করেছিলেন প্রায় ৭০ জন কর্মকর্তা কর্মচারী, যার মধ্যে ২১ জনই ডেপুটি রেজিস্ট্রার সমমানের পদে। তার ২ সপ্তাহ পর ২০২৫ সালের ২ জুন অনুষ্ঠিত ১০১ তম সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তে পূর্বের সেই প্রজ্ঞাপন বাতিল করা হয়। সেই প্রজ্ঞাপন বাতিলের এক মাস আগে ৬ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়া হয়। এরা হলেন ট্রেজারার দপ্তরের ডেপুটি রেজিস্ট্রার শামীম, রেজিস্ট্রার দপ্তরের এনামুল হক, একাডেমিক শাখার বাবুনাথ দত্ত, রাষ্ট্রবিজ্ঞানবিভাগের উত্তম কুমার, ডিন অফিসের এনামুল হক, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরের খালেক। এরা সবাই প্রশাসনে প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। একই প্রজ্ঞাপনে কিছু কর্মকর্তাকে সুযোগ দিয়ে অন্যদের বঞ্চিত করায় প্রশাসনের বিরুদ্ধে বৈষম্যের অভিযোগ এনেছেন পদোন্নতি বঞ্চিতরা। ভুক্তভোগীদের দাবি, নিজস্ব পছন্দের ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পদোন্নতি নিশ্চিত করার পরই তড়িঘড়ি করে প্রজ্ঞাপনটি বাতিল করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ দুরভিসন্ধিমূলক।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দাবি- ৮০তম সিন্ডিকেটের প্রজ্ঞাপনে অনিয়ম ছিল এবং সেটি বহাল থাকলে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নিয়োগপ্রাপ্তরা সুবিধা পেত। তবে বঞ্চিতরা এই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করে জানান, পদোন্নতি বঞ্চিতদের তালিকায় ২০০৭-০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিয়োগপ্রাপ্ত বহু যোগ্য কর্মকর্তাও রয়েছেন।

নির্লিপ্ত কর্মকর্তা সমিতি:

সাধারণ কর্মকর্তাদের স্বার্থ রক্ষায় কর্মকর্তা সমিতির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সমিতির শীর্ষ নেতাদের নিষ্ক্রিয়তার কারণে একদিকে যোগ্য ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা অধিকার বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে বিতর্কিত ও সুবিধাভোগী গোষ্ঠী প্রশাসনে আধিপত্য বিস্তার করছে। পদোন্নতি সুপারিশ কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্বে রয়েছেন কর্মকর্তা সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হালিম৷ প্রশাসনকে চাপ প্রয়োগ করে ৮০ তম প্রজ্ঞাপন বাতিল করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

দায়সারা জবি কোষাধ্যক্ষ :

প্রজ্ঞাপন বাতিলের ফলে পদোন্নতি বঞ্চিতদের বিষয়ে নীতামালা প্রণয়ন করে সুপারিশ প্রদানে কোষাধ্যক্ষের নেতৃত্ব কমিটি করা হয়। একই সাথে পদোন্নতি যাচাই বাছাই কমিটির নেতৃত্বেও আছেন তিনি। কিন্তু ১ বছরেও কমিটির কোন কার্যকর উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি। বঞ্চিত কর্মকর্তারা কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. সাবিনা শরমিন এর নিকট বারবার ধরনা দিয়ে কোন সাড়া পাননি। এ নিয়ে কোষাধ্যক্ষের স্বেচ্ছাচারিতা ও দায়সারা মনোভাবকে দোষছেন বঞ্চিতরা৷

প্রশাসনে বাড়ছে অসন্তোষ:

সিনিয়রদের টপকে জুনিয়রদের পদোন্নতি পাওয়া নিয়ে প্রশাসনে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে প্রশাসনের কাজে সমন্বয়হীনতা ও জটিলতা সৃষ্টির আশঙ্কা করা হচ্ছে। পদোন্নতি বঞ্চিত কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ, ও কর্মকর্তা সমিতির নেতৃবৃন্দের কাছে আমরা অসংখ্যবার গিয়েছি৷ কিন্তু কেউ কর্ণপাত করেনি৷ অথচ বিগত দুই বছরে শিক্ষকদের ৫-৬ টি পদোন্নতি বোর্ড হয়েছে। পুরো বিষয়টি সমাধানের দায়িত্ব কোষাধ্যক্ষের উপর ন্যাস্ত আছে৷ ১ বছরেও কোন সমাধান বের করতে পারেননি তিনি৷ ইতোমধ্যে জুনিয়র ব্যাচের ১২ কর্মকর্তারার পদোন্নতি বোর্ডের তারিখ দেয়া হয়েছে চলতি মাসের ১৩-১৪ তারিখ৷ সিনিয়র হয়েও এখন আমাদেরকে জুনিয়রের আদেশ পালন করতে হবে। কর্মকর্তা সমিতির নেতৃবৃন্দরা আমাদের সহায়তা না করে, উল্টো আমাদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

এ বিষয় কর্মকর্তা সমিতির সভাপতি খন্দকার হাবিবুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে বলেন, নিয়োগ বঞ্চিত কর্মকর্তাদের বিষয়ে আমরা নিয়ামিত প্রশাসনের সাথে কথা বলছি। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে একটি কমিটি হয়েছে। সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হালিম বলেন, ৮০ তম প্রজ্ঞাপনের নিয়ম মেনে করা হয়নি। তাই বাতিল হয়েছে৷ এখানে আমাদের কিছুই করার নেই৷

কর্মকর্তাদের পদোন্নতি বাছাই বোর্ড ও পদোন্নতি বঞ্চিতদের বিষয় নীতিমালা প্রণয়ন কমিটির আহ্বায়ক জবি কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. সাবিনা শরমিন বলেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এত কর্মকর্তার প্রয়োজন নেই। সবাই কর্মকর্তা হয়ে গেলে কাজ করবে কে? পূর্বে নিয়ম লঙ্ঘন করে ৮০ তম সিন্ডিকেটের প্রজ্ঞাপন দেয়া হয়েছিল৷ যার ফলে যেকেউ পদোন্নতি পেয়ে শীর্ষ পদে যেতে পারতো৷ তাই এটি বাতিল হয়েছে৷

এ বিষয়ে জবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. রইছ উদ্দীন বলেন, ৮০ তম সিন্ডিকেটের প্রজ্ঞাপন নিয়ে বিতর্ক ছিল, তাই বাতিল করা হয়েছে। পূর্বের ৮০ তবে প্রজ্ঞাপন বাতিলের ঠিক এক মাস আগে কোন যুক্তিতে একই নিয়মে ৬ জন কর্মকর্তা পদোন্নতি পেলেন এবং অন্যদের ক্ষেত্রে কেন ব্যতিক্রম হলো—এমন প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর দিতে পারেননি উপাচার্য। তবে তিনি মন্তব্য করেন, পূর্বে একই নিয়মে যারা সুযোগ পেয়েছেন, তাদের বিষয়টিও তদন্ত বা তথ্যানুসন্ধান করা প্রয়োজন।