থানায় অভিযোগ লিখতেই ফোন! রায়পুরে তথ্য ফাঁসের অভিযোগ | Daily AjKaler Kontho

থানায় অভিযোগ লিখতেই ফোন! রায়পুরে তথ্য ফাঁসের অভিযোগ


জাকির হোসেন জুয়েল, লক্ষ্মীপুর জেলা প্রতিনিধি প্রকাশের সময় : অক্টোবর ২, ২০২৬, ৮:৪০ অপরাহ্ন
থানায় অভিযোগ লিখতেই ফোন! রায়পুরে তথ্য ফাঁসের অভিযোগ

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর থানার সামনে থাকা কয়েকটি কম্পিউটার দোকানকে ঘিরে সাধারণ মানুষের অভিযোগ ও মামলা-সংক্রান্ত ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস এবং কথিত দালালচক্রের তৎপরতার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, এসব দোকানে অভিযোগ বা মামলা-সংক্রান্ত কাগজপত্র তৈরির পরপরই অচেনা নম্বর থেকে তাদের ফোন করা হচ্ছে। কেউ পুলিশের সঙ্গে পরিচিত, কেউ আদালতের মুহুরি, আবার কেউ সাংবাদিক বা সাংবাদিকের স্টাফ পরিচয় দিয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দিচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর বিনিময়ে অর্থও দাবি করা হচ্ছে।

ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, তারা থানায় অভিযোগ করার বিষয়টি সীমিত পরিসরে জানালেও অভিযোগ লেখানোর পরপরই বাইরের ব্যক্তিরা তাদের মোবাইল নম্বর ও অভিযোগের বিষয় কীভাবে জানতে পারছেন?

অভিযোগের তথ্য যাচ্ছে কোথায়?

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কম্পিউটার দোকানে অভিযোগ লেখানোর পরপরই কিছু ব্যক্তি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। এ কারণে এসব তথ্য দোকান থেকে বাইরে যাচ্ছে কি না, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো সংঘবদ্ধ চক্র রয়েছে—তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।

অভিযোগ রয়েছে, কম্পিউটার দোকানে আসা কিছু ব্যক্তি নিজেদের সাংবাদিক বা সাংবাদিকদের স্টাফ পরিচয় দিয়ে অভিযোগকারীদের সঙ্গে কথা বলেন। কখনো মামলা করে দেওয়ার আশ্বাস, আবার কখনো পুলিশের মাধ্যমে কাজ করিয়ে দেওয়ার কথা বলে তাদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয় বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।

এ ছাড়া কয়েকজনের অভিযোগ, থানার সামনে থাকা এসব দোকানে বিভিন্ন আইনজীবীর মুহুরিরাও অবস্থান করেন। কেউ অভিযোগ বা মামলা-সংক্রান্ত কাগজপত্র তৈরি করতে এলে তার সঙ্গে কথা বলে থানায় অভিযোগ না করে আদালতে মামলা করার জন্য চাপ দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সোলাইমান নামে এক ব্যক্তি বলেন, “আমরা থানায় আসি, যাতে সহজে সমস্যাগুলো সমাধান করা যায়। কিন্তু এখানে এসে কেউ কেউ তাদের নিজস্ব আইনজীবীর কাছে আমাদের কোর্টে যাওয়ার জন্য চাপ দেন।”

অভিযোগকারীর পর বিবাদীপক্ষের সঙ্গেও যোগাযোগ?

ভুক্তভোগীদের আরও অভিযোগ, শুধু অভিযোগকারীর সঙ্গেই নয়, মামলার সম্ভাব্য বিবাদীপক্ষের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হচ্ছে। তাদেরও সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে থানায় অভিযোগ না করে শালিশের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার প্রস্তাব দেওয়া হয় বলে দাবি তাদের।

এমনকি শালিশে বসার জন্য নিজেদের অফিস বা নির্দিষ্ট স্থানে যেতে বলা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারী ও বিবাদী—উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে মধ্যস্থতার নামে অর্থ দাবি করা হচ্ছে কি না, সেটিও তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা বলছেন, কোনো ব্যক্তি আইনগত সহায়তার প্রয়োজন হলে আইনজীবী বা সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়া স্বাভাবিক। তবে সাধারণ মানুষকে তাদের অধিকার ও আইনগত প্রক্রিয়া সম্পর্কে পরিষ্কারভাবে না জানিয়ে কোনো নির্দিষ্ট পথে মামলা বা অভিযোগ করতে প্রভাবিত করা হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

অভিযোগ করার পরই ভিডিও, পরে অর্থ দাবির অভিযোগ

জাহিদ নামে এক ব্যক্তি দাবি করেন, তিনি থানায় অভিযোগ করার জন্য একটি কম্পিউটার দোকানে গিয়ে অভিযোগটি লেখাচ্ছিলেন। অভিযোগ লেখা শেষ হওয়ার পরপরই দুই-তিনজন ব্যক্তি দোকানের ভেতরে এসে নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দেন এবং তার সমস্যার বিষয়ে জানতে চান। একপর্যায়ে তারা ভিডিও ধারণ শুরু করেন।

জাহিদের ভাষ্য, “আমরা তো থানায় অভিযোগ করতে এসেছি, সাংবাদিকদের কাছে সাক্ষাৎকার দিতে আসিনি।”

তার অভিযোগ, অনুমতি ছাড়াই ধারণ করা ভিডিও পরে বিভিন্ন ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ করা হয়। এরপর ভিডিও প্রকাশের বিষয়টি দেখিয়ে তাকে ফোন করে অর্থ দাবি করা হয়।

সিদ্দিক সরকার নামে আরেক ব্যক্তিও একই ধরনের অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, “কম্পিউটার দোকানে অভিযোগ লেখানোর সময় কয়েকজন নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে আমার ভিডিও করেন। পরে জানতে পারি, ভিডিওটি বিভিন্ন ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ করা হয়েছে। এরপর সেটি নিয়ে আমাকে ফোন করে টাকা দাবি করা হয়।”

সোহাগ নামে আরেক ব্যক্তি বলেন, “থানায় অভিযোগ করে আসার পরের দিন কয়েকজন সাংবাদিক পরিচয়ে আমার বাড়িতে আসেন। তারা বলেন, আপনি তো গতকাল থানায় এই বিষয়ে অভিযোগ করেছেন, আমরা সাংবাদিক হিসেবে নিউজ করতে এসেছি।”

এতে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে প্রশ্ন করেন, “আমি তো তাদের কাউকে বিষয়টি জানাইনি। তাহলে আমার অভিযোগের খবর তারা কীভাবে পেল?”

তদন্তের দাবি

ভুক্তভোগীদের দাবি, বিষয়টি শুধু তথ্য জানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কারও কারও কাছে মামলা করে দেওয়া বা পুলিশের মাধ্যমে কাজ করিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে অর্থ চাওয়া হয়েছে। আবার অভিযোগকারী ও বিবাদী উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে শালিশের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের মতে, থানার মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের সামনে কেউ পুলিশের নাম ব্যবহার করে অর্থ আদায় করছে কি না কিংবা সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করছে কি না—তা তদন্ত করা জরুরি।

একই সঙ্গে অভিযোগ বা মামলা-সংক্রান্ত ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে দোকানের বাইরে যাচ্ছে, কারা এসব তথ্য পাচ্ছেন এবং বিভিন্ন ব্যক্তি কীভাবে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন—এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।

দোকানদারদের অস্বীকার

তবে অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে সংশ্লিষ্ট কম্পিউটার দোকানদাররা বলেন, তাদের দোকান থেকে কোনো ব্যক্তির অভিযোগসংক্রান্ত তথ্য বাইরে দেওয়া হয় না। কারও কাছ থেকে অনৈতিকভাবে টাকা নেওয়ার সঙ্গেও তারা জড়িত নন।

পুলিশের বক্তব্য

এ বিষয়ে রায়পুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, থানার নাম ব্যবহার করে কেউ সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা আদায় করলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

থানার সামনে কোনো দালালচক্রের তৎপরতা থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। প্রতারণার শিকার ব্যক্তিদের প্রমাণসহ থানায় অভিযোগ করার জন্য অনুরোধ করেন ওসি।

এখন প্রশ্ন—থানায় অভিযোগ করতে আসা মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য যদি সত্যিই বাইরে চলে যায়, তাহলে সেই তথ্যের উৎস কোথায়? কম্পিউটার দোকান, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগাযোগ কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে তথ্য ছড়াচ্ছে কি না—নিরপেক্ষ তদন্তেই তা স্পষ্ট হতে পারে।