মুসলেউদ্দিনকে খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ, তবু তার অভিযোগে জেলে এতিম দুই ভাই-বোন | Daily AjKaler Kontho

মুসলেউদ্দিনকে খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ, তবু তার অভিযোগে জেলে এতিম দুই ভাই-বোন


জাকির হোসেন জুয়েল, লক্ষ্মীপুর জেলা প্রতিনিধি প্রকাশের সময় : জুলাই ১১, ২০২৬, ১:১৪ অপরাহ্ন
মুসলেউদ্দিনকে খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ, তবু তার অভিযোগে জেলে এতিম দুই ভাই-বোন

লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের জেরে মৃত নুর নবীর দুই সন্তান ইকবাল ও নয়ন বেগমকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের (মোবাইল কোর্ট) মাধ্যমে এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনায় এলাকাজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য ও আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, বৈধ দলিল-খতিয়ান থাকা সত্ত্বেও সেগুলো যথাযথভাবে বিবেচনা না করেই কমলনগর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আরাফাত হুসাইন তাদের কারাদণ্ড দেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ৭ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে মুসলেউদ্দিন নামের এক ব্যক্তি মৃত নুর নবীর ওয়ারিশদের বিরুদ্ধে কমলনগর উপজেলা ভূমি অফিসে জমির মালিকানা দাবি করে একটি অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) উভয় পক্ষকে দলিল ও খতিয়ানসহ শুনানিতে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেন।

ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, নির্ধারিত শুনানির দিন তারা মালিকানার দলিল, খতিয়ান ও নামজারির কাগজপত্র নিয়ে উপস্থিত হলেও সেগুলো যাচাই না করেই ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ইকবাল ও নয়ন বেগমকে এক মাসের কারাদণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।

এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আরাফাত হুসাইন বলেন, “বাদী মুসলেউদ্দিনের মালিকানা পাওয়া গেছে। কিন্তু তিনটি শুনানিতেও বিবাদী পক্ষ কোনো মালিকানা দলিল বা খতিয়ান দেখাতে পারেনি। তাই আইন অনুযায়ী সাজা দেওয়া হয়েছে। তারা চাইলে উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারবেন।”

তবে পরে সাংবাদিকরা ভুক্তভোগী পরিবারের দলিল-খতিয়ান দেখালে তিনি দাবি করেন, “শুনানির দিন এ ধরনের কোনো কাগজপত্র আসামিদের সঙ্গে ছিল না।”

ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি অনুযায়ী, মৃত নুর নবীর নামে ১৯৮০ ও ১৯৮৪ সালের দুটি নিবন্ধিত দলিল (নং-১৯৫০ ও ৯২৫০), খতিয়ান নং-২০১, ১৬৩ ও ৬৭ এবং নামজারি নথি (নং-৫০৭) রয়েছে। এসব নথির ভিত্তিতে পরিবারটি প্রায় ৮৬ শতাংশ জমি দীর্ঘ ৩৫ থেকে ৪০ বছর ধরে বসতবাড়ি হিসেবে ভোগদখল করে আসছে।

মুসলেউদ্দিনকে খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মুসলেউদ্দিন নামে কোনো ব্যক্তিকে তারা চেনেন না। এলাকায় তার কোনো বাড়ি বা স্থায়ী ঠিকানার তথ্যও কেউ নিশ্চিত করতে পারেননি। অভিযোগ দায়েরের পর তদন্ত ও বৈঠকের সিদ্ধান্ত হলে তিনি আত্মগোপনে চলে যান বলে অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারের করা মামলার পর পুলিশও তার অবস্থান বা সঠিক ঠিকানা নিশ্চিত করতে পারেনি বলে পরিবারের দাবি।

স্থানীয় বাসিন্দা শাহাবুদ্দিন বলেন, “মুসলেউদ্দিন নামে কাউকে আমরা চিনি না। নুর নবী কোনোদিন জমি বিক্রি করেননি। পরিকল্পিতভাবে ইকবাল ও নয়নকে জেলে পাঠানো হয়েছে।”

১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ, দেওয়ানি মামলা

এ ঘটনায় মৃত নুর নবীর স্ত্রী মনোয়ারা বেগম ও তার সন্তানসহ ২৫ জন ওয়ারিশ লক্ষ্মীপুর জেলা জজ আদালতে মুসলেউদ্দিন ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে একটি দেওয়ানি মামলা (মামলা নং-৪৬/২৬) দায়ের করেছেন।

নুর নবীর মেয়ে নাজমা বেগম অভিযোগ করেন, স্থানীয় ইউপি সদস্য নিজাম উদ্দিন ও বদ্ধি বেপারী মুসলেউদ্দিনের সঙ্গে যোগসাজশ করে তাদের বসতভিটা দখলের চেষ্টা করছেন। তাদের কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। চাঁদা না দেওয়ায় পরিকল্পিতভাবে তার ভাই ইকবাল ও বোন নয়ন বেগমকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

ভুক্তভোগী পরিবারের আরও অভিযোগ, মোহাম্মদ বেপারী ও তার সন্তানেরা জোরপূর্বক তাদের বসতবাড়ির মাটি এবং পাঁচটি গাছ কেটে নিয়ে গেছে। বাধা দিলে প্রতিনিয়ত প্রাণনাশ ও গুমের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

অভিযোগ অস্বীকার

চাঁদা দাবি ও যোগসাজশের অভিযোগ অস্বীকার করে ইউপি সদস্য নিজাম উদ্দিন বলেন, “আমি এ ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নই। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।”

অন্যদিকে, অভিযোগকারী মুসলেউদ্দিনের অবস্থান বা ঠিকানা নিশ্চিত করা না যাওয়ায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

এলাকাবাসীর দাবি

এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভ বিরাজ করছে। স্থানীয়দের দাবি, বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করতে হবে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং আইনি প্রক্রিয়ায় তাদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

আজকালের কন্ঠ/আর বি