
বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্পে নারীর ক্ষমতায়ন এক অনিবার্য বাস্তবতা। কিন্তু এই অগ্রযাত্রার বিপরীতে সমাজে এমন এক শক্তি সক্রিয়, যা প্রগতিকে স্বীকার করতে চায় না। বিশেষ করে উগ্র ধর্মীয় ব্যাখ্যার আশ্রয়ে কিছু গোষ্ঠী নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে ‘নৈতিক বিচ্যুতি’ হিসেবে তুলে ধরে সমাজে এক ধরনের ভয় ও নিয়ন্ত্রণের পরিবেশ তৈরি করছে। এই বাস্তবতায় ক্ষমতায়ন ও উগ্রতার সংঘাত এখন আর তাত্ত্বিক নয়, এটি বাস্তব, দৃশ্যমান এবং উদ্বেগজনক।
গাজীপুরের এক নারী উদ্যোক্তা, রিফাত সুলতানার ঘটনাটি সেই সংঘাতের একটি প্রতীকী উদাহরণ। কৃষিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি একটি বিউটি পার্লার ও স্পা গড়ে তোলেন, যেখানে স্থানীয় নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হতো। ধীরে ধীরে এই উদ্যোগ শুধু একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে নয়, বরং নারীর স্বাবলম্বিতার একটি প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়।
কিন্তু এই অগ্রযাত্রাই কিছু উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর বিরোধিতার মুখে পড়ে। রিফাতের অভিযোগ অনুযায়ী, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ-এর স্থানীয় কিছু উগ্রবাদী নেতা তাঁর প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমকে ‘অসামাজিক’ আখ্যা দিয়ে সেটি বন্ধ করার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, নারীদের ঘরের বাইরে কাজ করা সমাজে ‘বিশৃঙ্খলা’ সৃষ্টি করে এবং এটি ধর্মীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। এই ধরনের বক্তব্য কেবল ব্যক্তিগত মত নয়; এটি একটি বৃহত্তর চিন্তাধারার প্রতিফলন, যা নারীর স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে চায়।
এই চাপ কেবল কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি বলেই অভিযোগ। তাঁর ভাষ্যমতে, একাধিকবার তাঁর প্রতিষ্ঠানে গিয়ে হুমকি দেওয়া হয়, এমনকি ভিত্তিহীনভাবে তাঁর ব্যবসাকে অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়ানোর চেষ্টা করা হয়। এই ঘটনাগুলো দেখায়, আদর্শিক বিরোধ কীভাবে ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত আক্রমণে রূপ নেয় এবং কীভাবে একটি বৈধ উদ্যোগকে সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়। যখন যুক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন অপবাদই হয়ে ওঠে সবচেয়ে সহজ অস্ত্র।
হুমকি সত্ত্বেও রিফাত তাঁর কাজ থামাননি। বরং তিনি তাঁর কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করেন, নতুন সেবা চালু করেন, আরও নারীকে কাজে যুক্ত করেন। এটি ছিল এক ধরনের নীরব প্রতিরোধ, যেখানে ভয়কে অস্বীকার করে এগিয়ে যাওয়ার সাহস দেখা যায়। কিন্তু এই সাহসই আবার তাঁকে আরও বড় সংঘাতের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
পরবর্তীতে তাঁর অভিযোগ অনুযায়ী, আরও সংগঠিতভাবে চাপ প্রয়োগ শুরু হয়। তাঁর প্রতিষ্ঠানটিকে ‘অসামাজিক কার্যক্রমের আখড়া’ আখ্যা দিয়ে সরাসরি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। এই পর্যায়ে ঘটনাটি আর কেবল মতাদর্শগত বিরোধে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি রূপ নেয় ক্ষমতা প্রদর্শন এবং নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রয়াসে। একটি নারী-নেতৃত্বাধীন উদ্যোগকে থামিয়ে দেওয়া যেন হয়ে ওঠে একটি ‘বার্তা’, নির্ধারিত সীমার বাইরে যাওয়ার পরিণতি কী হতে পারে।
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মতো সংগঠনগুলো অতীতেও নারীর অগ্রযাত্রা সংক্রান্ত বিভিন্ন ইস্যুতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, এটি অজানা নয়। নারীর জনপরিসরে অংশগ্রহণ, কর্মসংস্থান কিংবা সামাজিক ভূমিকা নিয়ে তাদের কিছু বক্তব্য বারবার বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে গাজীপুরের এই ঘটনাকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন বলে দেখার সুযোগ খুব কম।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ধরনের উগ্র দৃষ্টিভঙ্গি কীভাবে সমাজে প্রভাব বিস্তার করে। যখন কোনো নারীর বৈধ উদ্যোগকে ‘অনৈতিক’ বলে চিহ্নিত করা হয়, তখন তা শুধু একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে আক্রমণ নয়; এটি অন্য নারীদের জন্য একটি বার্তা, “তোমরা সীমা অতিক্রম করো না।” এই ভয়ভীতি তৈরি করাই আসলে মূল কৌশল, যা দীর্ঘমেয়াদে নারীর অংশগ্রহণকে নিরুৎসাহিত করে।
আরও উদ্বেগজনক হলো, এই ধরনের ঘটনার পরও কার্যকর প্রতিকার অনেক সময় দৃশ্যমান হয় না। অভিযোগ, মামলা বা আইনি পদক্ষেপ থাকলেও সেগুলোর অগ্রগতি ধীরগতির হয়, যা ভুক্তভোগীদের মধ্যে হতাশা তৈরি করে। এই পরিস্থিতি উগ্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে এক ধরনের দায়মুক্তির অনুভূতি তৈরি করতে পারে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করে।
বাংলাদেশের সংবিধান নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করেছে। সেই বাস্তবতায় নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা কোনো বিতর্কের বিষয় হতে পারে না। বরং এটি একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার পূর্বশর্ত। যারা এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে, তারা মূলত উন্নয়নের ধারাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
পরিশেষে বলা যায়, প্রগতির এই পথচলা সহজ নয়, বিশেষ করে যখন তা উগ্রতা ও সংকীর্ণ মানসিকতার মুখোমুখি হয়। কিন্তু ইতিহাস বলে, প্রগতি থেমে থাকে না। প্রয়োজন শুধু সচেতনতা, সাহস এবং ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা। নারীর ক্ষমতায়ন কোনো আপসের বিষয় নয়, এটি একটি মৌলিক অধিকার। আর সেই অধিকার রক্ষার লড়াই চলমান থাকবে, যতদিন না সমাজ সত্যিকার অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে ওঠে।
আপনার মতামত লিখুন :