সহিংসতার বেল্টে ক্ষত, রুদ্ধ ব্যবসা: প্রগতির ওপর আদর্শিক চাপ | Daily AjKaler Kontho

সহিংসতার বেল্টে ক্ষত, রুদ্ধ ব্যবসা: প্রগতির ওপর আদর্শিক চাপ


মোঃ লুৎফর রহমান প্রকাশের সময় : নভেম্বর ৫, ২০২২, ৪:২৯ অপরাহ্ন
সহিংসতার বেল্টে ক্ষত, রুদ্ধ ব্যবসা: প্রগতির ওপর আদর্শিক চাপ

বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের ইতিহাসে নারীর অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। কিন্তু এই অগ্রযাত্রার সমান্তরালে সমাজে এক ধরণের অদৃশ্য কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী শেকল কাজ করছে, যা সুযোগ পেলেই প্রগতির টুঁটি চেপে ধরতে চায়। সম্প্রতি গাজীপুরের একটি নারী উদ্যোক্তার প্রতিষ্ঠানে ঘটে যাওয়া তান্ডব এবং একজন নারী উদ্যোক্তার ওপর চামড়ার বেল্ট দিয়ে আঘাত করার চেষ্টা সেই ভয়ংকর শেকলেরই এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। এই ঘটনা কেবল একটি ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়; বরং এটি নারী স্বাধীনতার বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত উগ্রবাদী মানসিকতার চূড়ান্ত ও সহিংস রূপ। যখন কোনো প্রগতিশীল উদ্যোগকে আদর্শিক বিরোধিতার দোহাই দিয়ে শারীরিকভাবে আক্রমণ করা হয়, তখন সমাজ আসলে তার সভ্যতার মানদণ্ডেই পরাজিত হয়।

দীর্ঘদিন ধরেই এক শ্রেণির চরমপন্থী গোষ্ঠী নারীর ক্ষমতায়নকে একটি ‘নৈতিক অপরাধ’ হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করে আসছে। তাদের দৃষ্টিতে নারীর একমাত্র নিরাপদ স্থান হলো গৃহের অভ্যন্তর। এর বাইরে নারীর যেকোনো সৃজনশীল বা অর্থনৈতিক সক্রিয়তাকে তারা ‘পাপ’ কিংবা ‘বিজাতীয় সংস্কৃতি’ বলে আখ্যা দেয়। এই মানসিকতা থেকেই শুরু হয় মনস্তাত্ত্বিক চাপ এবং ভিত্তিহীন অপবাদ ছড়ানোর কৌশল। বিউটি পার্লার বা স্পা-র মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রায়শই তারা ‘অসামাজিক কার্যকলাপের আখড়া’ বলে দাগিয়ে দেয়, যার পেছনে থাকে মূলত একজন সফল নারীকে সামাজিকভাবে অপদস্থ করার হীন উদ্দেশ্য। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, এই মৌখিক ও মনস্তাত্ত্বিক আক্রমণ যখন কেবল হুমকিতে সীমাবদ্ধ না থেকে সহিংসতায় রূপ নেয়, তখন রাষ্ট্রের আইন ও শৃঙ্খলা ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলোও বীভৎসভাবে উন্মোচিত হয়ে পড়ে।

গাজীপুরের সেই ঘটনায় আমরা দেখেছি কীভাবে হেফাজতে ইসলামের মতো উগ্রবাদী প্রভাবশালী সংগঠনের স্থানীয় নেতারা আইনের তোয়াক্কা না করে একটি বৈধ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে ঢুকে ভাঙচুর চালায়। যখন একজন প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে নিজ হাতে চামড়ার বেল্ট তুলে নিয়ে একজন নারীকে আঘাত করতে উদ্যত হন, তখন তা কেবল শারীরিক নির্যাতন থাকে না, তা হয়ে ওঠে নারীত্বের অবমাননা এবং কর্তৃত্ববাদী পুরুষতন্ত্রের আস্ফালন। এই সহিংসতা মূলত একটি বার্তা দিতে চায়, “তোমরা আমাদের নির্ধারিত সীমানার বাইরে পা রাখলে এভাবেই তোমাদের দণ্ড দেওয়া হবে।” এই ধরণের কর্মকাণ্ড সমাজে এক গভীর ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে, যেখানে সম্ভাবনাময় নারী উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করতে বা স্বাবলম্বী হতে ভয় পান।

এই সংকটের আরেকটি অন্ধকার দিক হলো প্রশাসনের নির্লিপ্ততা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি। সমাজে বা জনপরিসরে যখন এই ধরণের আক্রমণ ঘটে, তখন প্রত্যাশা থাকে যে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের সুরক্ষা দেবে এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ও ধর্মীয় নেতাদের রাজনৈতিক প্রভাবের সামনে অনেক সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও অসহায় বোধ করে। অভিযোগ গ্রহণ করতে গড়িমসি করা কিংবা এজাহার থেকে মূল হোতাদের নাম বাদ দেওয়ার যে সংস্কৃতি আমরা দেখছি, তা মূলত অপরাধীদের জন্য একটি অভয়াবরণ তৈরি করে। যখন অপরাধীরা জানে যে তাদের রাজনৈতিক সুরক্ষা আছে এবং আইনের হাত তাদের নাগাল পাবে না, তখন তারা আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এই দায়মুক্তিই আসলে জনপরিসর থেকে অন্দরমহল পর্যন্ত সহিংসতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উগ্রবাদের এই সহিংস রূপটি হুট করে তৈরি হয়নি। এটি দীর্ঘদিনের পদ্ধতিগত প্রচারণার ফল। ২০১৩ সালে উত্থাপিত সেই বিতর্কিত ১৩ দফা দাবিতেও কিন্তু নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা বন্ধ এবং নারীর কাজ করার সুযোগ সীমিত করার স্পষ্ট হুমকি ছিল। সেই পুরোনো দাবির আধুনিক ও সহিংস সংস্করণই আজ আমরা দেখছি। যখন অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে ‘ধর্মদ্রোহিতা’ হিসেবে ফ্রেম করা হয়, তখন তা সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে এবং উগ্রবাদীদের সহিংসতাকে একধরণের কৃত্রিম বৈধতা দেয়। অথচ বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্র ও জনজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে যখন একটি চামড়ার বেল্ট সেই অধিকারকে চাবুক মারে, তখন সংবিধানের সেই প্রতিশ্রুতি কেবল কাগুজে দলিলেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।

এই সহিংসতার প্রভাব কেবল আক্রান্ত পরিবারের ওপরই পড়ে না, এটি গোটা দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ এবং সামাজিক স্থিতিশীলতাকেও হুমকির মুখে ফেলে। একটি দেশ যেখানে অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী, সেখানে তাদের কর্মক্ষেত্র যদি নিরাপদ না হয়, তবে টেকসই উন্নয়ন কোনোদিনই সম্ভব নয়। আজ যে চামড়ার বেল্ট একজন রিফাত সুলতানাকে আঘাত করছে, আগামীকাল তা অন্য কোনো কর্মজীবী নারীর পথরোধ করবে। এই চক্র ভাঙতে হলে প্রয়োজন শক্তিশালী সামাজিক প্রতিরোধ এবং আইনের কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ। কলম যে তলোয়ারের চেয়েও শক্তিশালী, সেই বিশ্বাস নিয়ে আজ আমাদের সোচ্চার হওয়ার সময় এসেছে।

পরিশেষে বলা যায়, ক্ষমতার দম্ভ আর উগ্রবাদের তান্ডবে যেন নারীর স্বপ্নগুলো চূর্ণ না হয়, সেটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। আমরা এমন কোনো বাংলাদেশ চাই না যেখানে প্রগতিশীলতাকে দণ্ড দিয়ে শাসন করা হয়। আমরা চাই না ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে কেউ নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ওপর আঘাত করুক। ক্ষমতার এই দম্ভ আর সহিংসতার অবসান না ঘটলে স্বাধীনতার অর্থ চিরকালই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আজ সময় এসেছে সেই অদৃশ্য শেকলগুলো ভেঙে ফেলার, যা আমাদের উন্নয়নের আকাশকে কুয়াশাচ্ছন্ন করে রেখেছে। ক্ষমতার চেয়ে জীবনের মূল্য এবং অন্ধকারের চেয়ে আলোর শক্তি যে অনেক বেশি, এই সত্যটিই হোক আগামীর বাংলাদেশের মূলমন্ত্র।