আজকালের কন্ঠ ডেস্ক : প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের আগে কার্য তালিকায় রিট আবেদনের শুনানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিধিসম্মতভাবে এমআর ট্রেডিংয়ের রিট আবেদন বেঞ্চের কার্য তালিকায় না এলেও জালিয়াতি করে কার্য তালিকায় আনেন সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ অফিসার। এ সংক্রান্ত আপিল বিভাগের রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ পেয়েছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ অনুলিপিতে বলা হয়, এফিডেভিট করার তারিখে শুনানির জন্য রিটটি তালিকায় রাখা হয় এবং একই দিন অ্যাটর্নি জেনারেলকে নোটিশ দেয়া হয়। এটা অস্বাভাবিক এবং সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ অফিসারের জালিয়াতি। এ রায়ের আলোকে বেঞ্চ অফিসারের বিরুদ্ধে সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন বিভাগীয় ব্যবস্থা নেবে বলে জানা গেছে।
অসদাচরণের অভিযোগে বিচার কাজ থেকে বিরত থাকা বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরীর বেঞ্চ অফিসার ইব্রাহিম খলিলের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ন্যাশনাল ব্যাংকের ঋণসংক্রান্ত এক রিট মামলায় অবৈধভাবে ডিক্রি জারির মাধ্যমে রায় পাল্টে দেয়ার অভিযোগ ওঠে ওই বেঞ্চে। এরপর ন্যাশনাল ব্যাংকের আপিল আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এমআর ট্রেডিংয়ের মিজানুর রহমানকে ১ কোটি টাকা জরিমানা করেন আপিল বিভাগ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিমকোর্টের এক প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেন, আপিল বিভাগের রায়টি দেখেছি। সেই আলোকে রায়ের পর্যালোচনা চলছে। বেঞ্চ অফিসারের অনিয়মের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কোনোভাবেই অনিয়মকে প্রশ্রয় দেয়া হবে না।
জানা যায়, ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে ৩৬ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছিল এমআর ট্রেডিং। সেই ঋণ খেলাপি হওয়ায় ন্যাশনাল ব্যাংক অর্থঋণ আদালতে ট্রেডিংটির বিরুদ্ধে মামলা করে। এ মামলা চলাকালে দু’পক্ষের মধ্যে আপসনামা হয় এবং সে অনুসারে টাকা মিলমিশ করে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এরপর তারা ওই আপসনামা অর্থঋণ আদালতে দাখিল করে সে অনুযায়ী ডিক্রি চান।
কিন্তু অর্থঋণ আদালত সে আপসনামার ভিত্তিতে ডিক্রি জারি করেননি। এরপর ওই ডিক্রির বিরুদ্ধে এমআর ট্রেডিং হাইকোর্টে আবেদন করে। সে আবেদনের শুনানি নিয়ে বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ রুল জারি করেন এবং আপসনামার ভিত্তিতে অর্থঋণ আদালতকে ডিক্রি জারির নির্দেশ দেন। এরপর পুনরায় অর্থঋণ আদালত ডিক্রি দেন এবং এমআর ট্রেডিং হাইকোর্ট থেকে জারি করা রুল তুলে নেন।
১৬ মে আপিল বিভাগে ন্যাশনাল ব্যাংকের ঋণসংক্রান্ত এক রিট মামলায় অবৈধভাবে ডিক্রি জারির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের রায় পাল্টে দেয়ার অভিযোগ করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। এ অভিযোগ শুনে আপিল বিভাগ উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘এমন আদেশ হাইকোর্ট দিতে পারেন না। এটা নজিরবিহীন।’ জবাবে মাহবুবে আলম বলেন, ‘এটি একটি সিরিয়াস ম্যাটার। রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো উচিত। শুনানি শেষে হাইকোর্টের রায় ও অর্থঋণ আদালতের ডিক্রি বাতিল করেন আপিল বিভাগ। একই সঙ্গে মামলাটি পুনরায় চালু করার নির্দেশ দেন। এছাড়া আদালত এমআর ট্রেডিংকে এক কোটি টাকা জরিমানা করেন। জরিমানার এ টাকা আদালতে জমা দিতে বলা হয়। সে অনুযায়ী এমআর ট্রেডিং ব্যাংকের মাধ্যমে এক কোটি টাকা জমা দেয়। সম্প্রতি আপিল বিভাগের এ রায়ের অনুলিপি প্রকাশিত হয়েছে।
এতে বলা হয়, কোর্টের স্বাভাবিক নিয়ম হল- বেঞ্চ অফিসার রিট পিটিশন নেয়ার ১ দিন পর কার্যতালিকায় আসবে। ২০১৭ সালের ৫ অক্টোবর রিট আবেদনটি কার্য তালিকায় থাকতে হলে কমপক্ষে আগের দিন মামলার পক্ষদের নাম, নম্বর ইত্যাদি ছাপানোর জন্য প্রেসে পাঠাতে হতো। এখানে এফিডেভিট করার তারিখে অর্থাৎ ২০১৭ সালের ৫ অক্টোবর শুনানির জন্য পোস্ট করে এবং একই দিন অ্যাটর্নি জেনারেলকে অবহিত করা হয়। যা সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ অফিসারের জালিয়াতি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেঞ্চ অফিসার ইব্রাহিম খলিল বলেন, ‘আগে একটা সিস্টেম ছিল, মোশন (উপস্থাপন) আমাদের হাতে ছিল। এখন অ্যাডভোকেটরা আমাদের স্লিপ দেন। তারপর আমরা তালিকাভুক্ত করি। নাম্বারটা কবে পড়েছে আদৌ এফিডেভিট হয়েছে কিনা দেখার সুযোগ তো আমার নেই। অ্যাডভোকেট আমাকে স্লিপ দিয়েছেন এরপর আমি তালিকায় দিয়েছি।’
এ বিষয়ে ডেপুর্টি অ্যাটর্নি জেনারেল একেএম আমিন উদ্দিন মানিক বলেন, যেদিন রিট আবেদনটি কার্য তালিকাভুক্ত হয় সেদিনই এফিডেভিট করা হয়। যা সম্পূর্ণ বেআইনি। এটি হাইকোর্টের রুলসের পরিপন্থী। ‘অসদাচরণের’ অভিযোগের অনুসন্ধান শুরুর পর হাইকোর্ট বিভাগের তিন বিচারপতিকে বিচার কাজ থেকে সাময়িকভাবে বিরত থাকতে বলেন সুপ্রিমকোর্ট।
এ সিদ্ধান্ত ওই তিন বিচারপতিকে অবহিত করার পর তারা ছুটি চান। এ তিন বিচারপতি হলেন- বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী, বিচারপতি একেএম জহিরুল হক ও বিচারপতি কাজী রেজাউল হক। ২২ আগস্ট সুপ্রিমকোর্টের নিয়মিত কার্য তালিকায় নির্ধারিত বেঞ্চে তাদের নাম ছিল না। আদালতের বিচারিক কার্যক্রমেও তারা অংশ নেননি। পরে তাদের ছুটি মঞ্জুর হয়।
আপনার মতামত লিখুন :