
কুড়িগ্রামের উলিপুরে তিস্তার ভাঙনে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি। বাকরুদ্ধ নিরুপায় পাড়ের মানুষ। এদিকে যে সকল এলাকায় জিও ব্যাগ দিয়ে পাইলিং করে দেয়া হয়েছে সে সকল এলাকায় ভাঙন নেই বললেই চলে।
তিস্তায় অসময়ে পানি কম থাকলেও তীব্র স্রোতে ফসলি জমি ও পাড় ভেঙে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এতে করে নিঃস্ব হচ্ছে শত শত পরিবার। এ সময় ভাঙন রোধে জিও ব্যাগের জোর দাবি জানান তারা।
জানা যায়, উপজেলায় ১টি পৌরসভা ও ১৩টি ইউনিয়নের মধ্যে ৪টি ইউনিয়ন দলদলিয়া, থেতরাই, গুনাইগাছ ও বজরা তিস্তা নদী দ্বারা বেষ্টিত রয়েছে। এসকল ইউনিয়নে প্রতি বছর তীরের পাড় এবং ভেসে উঠা চরাঞ্চলের শতশত মানুষের বসতভিটা ও একরময় একর জমি তিস্তা গর্ভে বিলীনে নিঃস্ব হচ্ছে।
এসব ইউনিয়নে তিস্তা নদীর ভাঙন কবলিত এলাকার মধ্যে চাপরারপাড় হাজিপাড়া, উচ্চগ্রাম, বসনিয়াপাড়া, মুন্সিপাড়া, কর্পূরা, ঠুটাপাইকার, গোড়াইপিয়ার, শেখেরটেক, পাকার মাথা, দড়ি কিশোর পুর, বামনপাড়া, লাল মসজিদ, কুমারপাড়া, ভেন্ডারপাড়া, ফকিরপাড়া, মাঝিপাড়া, পশ্চিম বজরা, চর বজরা, বাঁধের মাথা, উত্তর সাদুয়া দামার হাট, খামার দামারহাট নদীর পশ্চিমপাড়, সাতালস্ক, চর বজরা, সন্তোষ অভিরাম, কাজিরচক সহ অন্যান্য এলাকা ভাঙন হিসাবে চিহ্নিত করে সরকারি ভাবে জিও ব্যাগ দিয়ে ভাঙন ঠেকানোর কাজ করলেও অনেক এলাকায় এখনো ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।
এসব এলাকায় নতুন করে নদী ভাঙনে একরের পর একর আবাদি জমি, বসতবাড়ি এবং বড় বড় গাছ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। নতুন করে নদী ভাঙন এলাকাগুলোর মধ্যে লাল মসজিদ, গোড়াইপিয়ার পাকার মাথা, অর্জুন, শেখেরটেক ও দড়িকিশোরপুর। এ সব এলাকায় গত কয়েকদিনের ভাঙনে অর্ধশতাধিক একর ফসলি জমি বিলীন হয়ে গেছে।
বৃহস্পতিবার বিকেল(২২ অক্টোবর) সরেজমিনে তিস্তার ভাঙন কবলিত থেতরাই পাকার মাথা শেখেরটেক এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, তিস্তার তীব্র স্রোতে ব্যপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। বিগত এক মাস ধরে অল্প কিছু নদীর পাড় ভাঙলেও গত ৫দিন ধরে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে।
গত কয়েক দিনের ভাঙনে প্রায় অর্ধ শতাধিক ফসলি জমি বিলীন হয়ে গেছে। হাজার হাজার টাকা ব্যায়ে আমনের ক্ষেত এখন শুধু স্বপ্ন থেকে যাচ্ছে তাদের। আর মাত্র কয়েক দিন হলেই আমন ধান কাটা মাড়াই করতেন তারা। ওই এলাকার পাড় ইতোপূর্বে জিও ব্যাগ দিয়ে পাইলিং করা থাকলেও নিচের মাটি সরে গিয়ে জিও ব্যাগ অন্যত্রে চলে যাচ্ছে।
এ অবস্থায় ওই এলাকার পাড় রক্ষা করা না গেলে প্রায় ১৫ থেকে ২০টি পরিবার, কয়েক একর ফসলি জমি, বাঁধের রাস্তা, একটি মসজিদ ও একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হুমকির মুখে পড়ে যাবে।
ভাঙন এলাকার নদীর পাড়ের উপরে থাকা এক গৃহবধূ শাহানুর বেগম বলেন, বেশ কয়েদিন থেকে এ এলাকায় নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে। প্রতিদিনের ভাঙনে আমার বাড়ির কাছে এসেছে। হয়তোবা আজ কালের মধ্যে বাড়ি অন্যত্রে সরিয়ে নিতে হবে। ইতিপূর্বে বেশ কয়েকবার নদী ভেঙে এখানে মানুষের জমি ভাড়া করে নিয়ে বাড়ি করে আছি। এ বাড়িও নদীতে চলে গেলে আমার সন্তানদের নিয়ে কোথায় যাবো। এসময় তিনি ভাঙন রোধে জিও ব্যাগ দেয়ার জোর দাবি জানান।
একই এলাকার ফিরুজুল মিয়া (৪৫) বলেন, গত কয়েকদিনের ভাঙনে আমার প্রায় এক একর ফসলি জমি বিলীন হয়ে গেলো। প্রায় ৩০ হাজার টাকা দিয়ে আমন ধানের চাষ করেছিলাম। আর মাত্র কয়েদিন হলে নতুন ধান ঘরে উঠত। সেখান থেকে কিছুই পালামনা। এমনকি জায়গাটুকু নদী নিয়ে গেল।
ভাঙন এলাকার নুরু মিয়া (৪৭), ওমর আলী (৬০), মুফিল উদ্দিন (৫৫), নোরল আমিন (৭১) ও রুহুল আমীন (৪০) সহ আরও অনেকে বলেন, কয়েক দিনের ভাঙনে আমরা দিশেহারা হয়ে গেছি। এ কয়েকদিনে প্রায় অর্ধ শতাধিক একর ফসলি জমি আমনের ক্ষেত সহ বিলীন হয়ে গেছে। হাজার হাজার টাকা খরচ করে ধান চাষ করে ফলনও পেলাম না এমনকি জায়গাটুকু নদী খেয়ে নিল। এখন আমরা কিভাবে কি ভাবে চলব উপায় পাচ্ছি না।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, তিস্তায় পানি কম থাকলেও কিছু কিছু নতুন নতুন এলাকায় ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করে জিও ব্যাগের চাহিদা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নিকট পাঠিয়ে দেয়া হবে। বরাদ্দ চলে আসলে ওই সব এলাকায় ভাঙন রোধে কাজ করা হবে বলে জানান তিনি।
আপনার মতামত লিখুন :