
পুরুষ হতে অপারেশন করে মারা যান লিজা আক্তার।ছোটবেলা থেকেই জীবনসঙ্গী হিসেবে পুরুষদের পছন্দ করতেন না বরিশালের গৌরনদী উপজেলার রোজি আক্তার লিজা (ছদ্মনাম)। পরিবার দুইবার বিয়ে দিলেও সংসার করেননি। তার স্বপ্ন ছিল পুরুষ হয়ে তার এক বান্ধবীকে বিয়ে করার। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে প্রথম ধাপে স্তন অপারেশন করেছিলেন লিজা। তবে অপারেশনের কয়েক ঘণ্টা পরেই তার মৃত্যু হয়েছে।
লিজা নাম বদলে সরফরাজ নামে ঢাকার পান্থপথ গ্রীন রোডের ইউনিহেলথ স্পেশালাইজড হাসপাতালে গত ৩ সেপ্টেম্বর ভর্তি হন। ৫ সেপ্টেম্বর বিকালে অপারেশন হয় তার। রবিবার ভোর সাড়ে চারটার দিকে লিজার মৃত্যু হয়।
ওইদিন বিকালে পরিবারের সদস্যরা মরদেহ নিয়ে এলে এলাকায় ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়। পরবর্তীতে সন্ধ্যার মধ্যেই লিজাকে দাফন করা হয়েছে।
লিজার পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, লিজা মেয়ে হলেও ছেলেদের মতো আচরণ করতেন। ছেলেদের মতো চুল কাটাতেন। লিজার বাড়িতে ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকার বাসিন্দা জেমিনি ওরফে জেনিফা আক্তার নামের এক যাতায়াত করতেন। তাকে বিয়ে করতে চাইতেন লিজা।
জেনিফা আক্তার জানিয়েছেন, তারা একে অপরের বাসায় বেড়াতেন। একসাথে থাকতেন। লিজা ঢাকায় হরমোনের চিকিৎসা করাতেন।
জেনিফার দাবি, লিজার মা, বাবা ও বোন স্তন অপারেশনের জন্য দেড় লাখ টাকা দিয়েছেন। ওই টাকা দিয়ে গত ৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার পান্থপথের ইউনিহেলথ স্পেশাইলজড হাসপাতালে সরফরাজ নাম দিয়ে লিজাকে ভর্তি করা হয়।
তিনি জানান, সেখানে অপারেশনের পূর্বে সম্মতিপত্রে লিজার স্ত্রী হিসেবে তিনি (জেনিফা) স্বাক্ষর করেছেন। মেয়ে হয়ে আরেকজন মেয়ের স্ত্রী পরিচয়ে সম্মতিপত্রে স্বাক্ষরের বিষয়ে জেনিফা বলেন, ‘লিজার মা ও বাবার সম্মতি নিয়ে’ স্বাক্ষর করা হয়েছে।
তবে মৃত লিজার বাবা বলেন, “সে (জেনিফা) যে স্বাক্ষর করবে, তার স্বাক্ষরে যে অপারেশন হবে, সে বিষয়ে আমি কিছুই জানিনা। এমনকি লিজার নাম যে সরফরাজ রাখা হয়েছে তা আজই কেবল জেনেছি।”
তিনি আরও বলেন, “লিজা অপারেশন করে পুরুষ হয়ে জেনিফাকে বিয়ে করবে- এমনটা ওর (লিজা) মায়ের কাছে শুনেছি।”
আক্ষেপ করে তিনি বলেন, “ঘরের যেকোনো বিষয়ে আমার কোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় না। ঘরের সকল সদস্যরা আমাকে আলাদা চোখে দেখে।”
মৃত লিজার মা বলেন, “আমার মেয়ে লিজা ছোটবেলা থেকেই কোনো ছেলেকে পছন্দ করতনা। তাকে জোর করে দুইবার বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কোনোখানেই সে সংসার করেনি। ছেলেদের সাথে সঙ্গ দেওয়া কিংবা ঘর সংসার করার কোনও মনমানসিকতাই তার ছিল না।”
তিনি আরও বলেন, “দীর্ঘদিন থেকে জেনিফা আমাদের বাড়িতে এসে লিজার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী হিসেবে বেড়াতো। যেকারণে লিজার অপারেশনের দায়িত্ব আমরা জেনিফার ওপর ছেড়ে দিয়েছিলাম।”
ইউনিহেলথ স্পেশাইলজড হাসপাতাল থেকে দেওয়া মৃত্যু সনদে দেখা গেছে, গত ৩ সেপ্টেম্বর লিজাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সনদপত্রে লিজার নাম সরফরাজ এবং পুরুষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে মৃত্যু সনদপত্রে দেওয়া হাসপাতালের নাম্বারে যোগাযোগ করা হলে লিমন নামের এক ব্যক্তি নিজেকে এডমিন পরিচয় দেন। তার কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জিএম-এর সাথে কথা বলতে বলেন।
পরবর্তীতে ইউনিহেলথ স্পেশাইলজড হাসপাতালের জিএম বিশ্বজিত বৈদ্যের কাছে সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কৌশলে দায় এড়িয়ে যান এবং যে ডাক্তারের অধীনে রোগী ভর্তি হয়েছে তার সাথে যোগাযোগ করতে বলেন।
পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ডা. মাহমুদুল হাসানের কাছে সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ব্যস্ততার অজুহাত দিয়ে পরে ফোন করবেন বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন। এরপর তাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি আর ফোন রিসিভ করেননি।
ফলে এ ধরনের জেন্ডার পরিবর্তন করার অপারেশনের অনুমতি ওই হাসপাতালের রয়েছে কি না তা নিয়ে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের খতিয়ে দেখে ওই হাসপাতালসহ জেন্ডার পরিবর্তনের অপারেশনের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সচেতন নাগরিকরা জোর দাবি জানিয়েছেন।
গৌরনদী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) তারিক হাসান রাসেল বলেন, “বিষয়টি আমরা শুনেছি তবে কেউ কোনো অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
আজকালের কন্ঠ/আর বি
আপনার মতামত লিখুন :