অবক্ষয়মুক্ত সমাজ বিনির্মাণ: প্রয়োজন রাষ্ট্র ও সামাজিক মনস্তত্ত্বের সমন্বিত জাগরণ | Daily AjKaler Kontho

অবক্ষয়মুক্ত সমাজ বিনির্মাণ: প্রয়োজন রাষ্ট্র ও সামাজিক মনস্তত্ত্বের সমন্বিত জাগরণ


প্রফেসর ড. আসিফ মিজান প্রকাশের সময় : জুলাই ১, ২০২৬, ১০:৩৬ পূর্বাহ্ন
অবক্ষয়মুক্ত সমাজ বিনির্মাণ: প্রয়োজন রাষ্ট্র ও সামাজিক মনস্তত্ত্বের সমন্বিত জাগরণ

একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা অবকাঠামোগত উন্নয়ন তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তার সামাজিক কাঠামোটি সুদৃঢ় নৈতিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। বর্তমান গ্লোবালাইজেশন বা বৈশ্বিকায়নের যুগে আমরা প্রতিনিয়ত যে মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, সেখানে সমাজকে তিনটি মরণব্যাধি তীব্রভাবে গ্রাস করছে—সন্ত্রাস, দুর্নীতি এবং মাদক। সমাজবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, এই অপরাধত্রয়ী কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এরা পরস্পরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং সমাজদেহে একটি চক্রাকার ব্যাধির সৃষ্টি করে। এই ত্রিমাত্রিক সংকট থেকে সমাজকে মুক্ত করতে হলে কেবল একক কোনো শক্তির ওপর নির্ভর করা অবান্তর। এর জন্য প্রয়োজন সমাজবিজ্ঞানী আর্নল্ড টয়েনবি নির্দেশিত সেই সমন্বিত সামাজিক মনস্তত্ত্ব, যেখানে পরিবার, দেশের মূল প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একটি অবিভাজ্য ও ত্রিমাত্রিক অক্ষ হিসেবে যুগপৎ কাজ করবে।

ত্রিবিধ শক্তির মেলবন্ধন ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতাঃ
ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী ইমিল ডুর্খেইম তাঁর সামাজিক সংকটের তত্ত্বে স্পষ্ট দেখিয়েছেন যে, যখন সমাজের প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা দেখা দেয়, তখন সমাজে ‘অ্যানোমি’ বা আদর্শহীনতার জন্ম হয়। আমাদের বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় মাদক, সন্ত্রাস ও দুর্নীতি রুখতে রাষ্ট্র বা প্রশাসন যতই কঠোর আইন প্রণয়ন করুক না কেন, তার মাঠপর্যায়ের সফল প্রয়োগ নিশ্চিত করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা পুলিশ প্রশাসন। কিন্তু রাষ্ট্র ও পুলিশের এই যৌথ প্রয়াস কেবল তখনই টেকসই রূপ লাভ করবে, যখন এর সাথে সামাজিক ক্ষুদ্রতম একক অর্থাৎ ‘পরিবার’ সক্রিয়ভাবে যুক্ত হবে। অপরাধ দমনে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা মূলত নিরাময়মূলক (Curative), কিন্তু পরিবারের ভূমিকা হলো প্রতিরোধমূলক (Preventive)। রাষ্ট্র যখন অপরাধীকে শাস্তি দিয়ে সমাজকে সংশোধন করতে চায়, পরিবার তখন শুরুতেই সেই অপরাধের বীজ অঙ্কুরোদগম হতে বাধা দেয়। অতএব, একটি সুস্থ, নিরাপদ এবং মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজ বিনির্মাণে এই ত্রিবিধ শক্তির যুগপৎ মেকানিজম বা সমন্বিত প্রয়াস আধুনিক রাষ্ট্রদর্শনের অন্যতম প্রধান শর্ত।

পারিবারিক নজরদারি এবং নৈতিকতার অর্থনীতিঃ
পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার অন্যতম বড় ট্র্যাজেডি হলো বিত্ত বা অর্থের তীব্র প্রতিযোগিতা, যা মানুষের নৈতিক মনস্তত্ত্বকে অবদমিত করে। সমাজবিজ্ঞানী কার্ল মার্ক্সের ‘এলিয়েনেশন’ বা বিচ্ছিন্নতাবোধের তত্ত্বকে বর্তমান সময়ের সাথে মেলালে দেখা যায়, পরিবারগুলো আজ অর্থনৈতিক মোহে অন্ধ হয়ে নিজেদের সন্তানদের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। পরিবারের প্রতিটি সদস্যের আয়ের উৎস কী, তা জানা কেবল কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, এটি একটি সর্বোচ্চ নৈতিক ও পারিবারিক দায়িত্ব। উপার্জনের প্রক্রিয়া যদি অস্বচ্ছ বা কলুষিত হয়, তবে তার প্রভাব সরাসরি এসে পড়ে তরুণের মননে।

একই সাথে, আমাদের সন্তানরা সামাজিক বলয়ে কার সাথে মেলামেশা করছে, কাদের সাথে সময় কাটাচ্ছে এবং তাদের যোগাযোগের গতিপ্রকৃতি কোন দিকে আবর্তিত হচ্ছে—সে বিষয়ে অভিভাবকসুলভ ‘সতর্ক নজরদারি’ (Vigilance) অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় অতি-আধুনিকতা বা ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে আমরা যে উদাসীনতা প্রদর্শন করি, তা তরুণ প্রজন্মকে মাদকের মরণকামড় কিংবা কিশোর গ্যাংয়ের মতো প্রাতিষ্ঠানিক সন্ত্রাসের দিকে ঠেলে দেয়। মনে রাখতে হবে, সমাজ বা রাষ্ট্রের বৃহত্তর মঞ্চে নৈতিকতার যে অভাব আমরা দেখি, তার ভিত্তিপ্রস্তর মূলত কোনো না কোনো পরিবারের শৈথিল্যের মধ্য দিয়েই রচিত হয়।

বিত্তের প্রাচুর্য বনাম সততার শাশ্বত গরিমাঃ
আমরা এমন এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি যেখানে মানুষের সামাজিক মর্যাদা নির্ধারিত হচ্ছে তার ব্যাংক ব্যালেন্স, দামি গাড়ি কিংবা অট্টালিকার নিক্তিতে। কিন্তু সমাজ কাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বের জন্য এই ‘মেটেরিয়ালিস্টিক’ বা বস্তুগত মাপকাঠি অত্যন্ত বিপজ্জনক। দার্শনিক সক্রেটিস তাঁর রাষ্ট্রচিন্তায় বারবার জোর দিয়েছিলেন যে, রাষ্ট্রের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে তার নাগরিকদের গুণ বা ‘Virtue’-এর মধ্যে, সম্পদের মধ্যে নয়। পরিবারের প্রকৃত আভিজাত্য, গরিমা এবং মর্যাদা কখনো বিত্তের প্রাচুর্যে বা অনৈতিকভাবে অর্জিত টাকার অঙ্কে বাড়তে পারে না। প্রকৃত সামাজিক মর্যাদা ও পারিবারিক ঐতিহ্য সমুন্নত হয় সততা, চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং নৈতিকতার শাশ্বত আদর্শের আলোকচ্ছটায়। সততার এই সংস্কৃতি যদি আমরা পারিবারিক পরিমণ্ডলে পুনরুজ্জীবিত করতে না পারি, তবে আইন দিয়ে দুর্নীতি বা মাদক নির্মূল করা কখনোই সম্ভব হবে না।

উপসংহার ও আগামীর রূপরেখাঃ
সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় রোধে এবং আমাদের তরুণ প্রজন্মকে সঠিক ও সৃজনশীল পথে পরিচালিত করতে হলে আমাদের এই যৌথ সচেতনতা ও সমন্বিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্নভাবে টিকিয়ে রাখতে হবে। বর্তমান সমাজকে যদি আমরা মাদকের মরণব্যাধি, সন্ত্রাসের করাল গ্রাস এবং দুর্নীতির মরণকামড় থেকে মুক্ত করতে না পারি, তবে আমাদের তরুণ সমাজ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশের সুফল বয়ে আনার পরিবর্তে উল্টো রাষ্ট্রের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।

উপাচার্য হিসেবে এবং একজন সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তক হিসেবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য কেবল ডিগ্রি প্রদান নয়, বরং নৈতিক মূল্যবোধের স্ফূরণ ঘটানো। রাষ্ট্র, প্রশাসন, পুলিশ এবং পরিবারের এই সমন্বিত প্রয়াসের মাধ্যমেই কেবল একটি মানবিক ও শান্তিময় সমাজ গঠন সম্ভব। আসুন, আমরা ব্যক্তি ও পারিবারিক পর্যায় থেকে এই রূপান্তরের সূচনা করি। সততা, জবাবদিহিতা ও নৈতিকতার এই শাশ্বত বার্তা ছড়িয়ে পড়ুক সমাজের প্রতিটি স্তরে, প্রতিটি গৃহকোণে।

লেখক: প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, মোগাদিসু, সোমালিয়া এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সমাজ বিশ্লেষক।

আজকালের কন্ঠ/আর বি