
বাংলাদেশের সমকালীন ভূ-রাজনীতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণে একটি নাম অনিবার্যভাবেই অনুঘটক হিসেবে কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে—”তারেক রহমান”। অতি সম্প্রতি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং রাজনৈতিক বলয়ে তাঁর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবন ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা নিয়ে নানামুখী কৌতূহল ও বিতর্ক সৃষ্টির প্রয়াস লক্ষ্য করা গেছে। তবে একজন রাজনীতি বিশ্লেষক হিসেবে আমার সুচিন্তিত অভিমত হলো—তারেক রহমানের মতো একজন ‘ক্যারিসমেটিক’ (Charismatic) ও গণমুখী নেতাকে কেবল প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি বা সনদের সংকীর্ণ মাপকাঠিতে পরিমাপ করার চেষ্টা এক ধরণের বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্ব ও স্থূল দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ। তিনি তাঁর স্বকীয় রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা এবং নেতৃত্বের জাদুকরী শক্তিতে আজ স্বমহিমায় ভাস্বর এক অনন্য রাষ্ট্রনায়ক।
প্রাতিষ্ঠানিকতার সীমানা ছাড়িয়ে নেতৃত্বের ক্যারিশমাঃ
তারেক রহমানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব কোনো বাঁধাধরা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অনুগামী বা দাস নয়। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের দীক্ষা শুরু হয়েছে পারিবারিক পরিমণ্ডলে—শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাষ্ট্রদর্শন ও আদর্শিক উত্তরাধিকারের মধ্য দিয়ে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তত্ত্বগত শিক্ষার চেয়ে মাঠপর্যায়ের প্রায়োগিক অভিজ্ঞতা এবং আপামর জনগণের সাথে সরাসরি মনস্তাত্ত্বিক সংযোগ যে কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য অনেক বেশি ফলপ্রসূ। জনাব তারেক রহমান সেই তৃণমূল সংযোগ ও গণআকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক। তাঁর নেতৃত্ব আজ প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতার সীমানা পেরিয়ে এমন এক উচ্চতায় আসীন, যেখানে তাঁর সহজাত ‘ক্যারিশমা’ এবং জনসম্পৃক্ততাই মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতি: ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও প্রতিকূলতাঃ
ঐতিহাসিক তথ্যের নিরিখে এটি উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক যে, তারেক রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৮৫-৮৬ শিক্ষাবর্ষের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হলের আবাসিক ছাত্র হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন। আইন বিভাগে দুই মাস অধ্যয়নের পর অ্যাকাডেমিক বিষয়ের বৈচিত্র্যায়নের স্বার্থে তিনি বিভাগ পরিবর্তন করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হন। দুই বিভাগ মিলিয়ে তৎকালীন সময়ে তাঁর সহপাঠী ছিলেন ১২২ জন, যাঁদের মধ্যে বর্তমান বাংলাদেশের বহু প্রথিতযশা ও কীর্তিমান ব্যক্তিত্ব রয়েছেন—যাঁদের মধ্যে অন্যতম সাবেক স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, বিশিষ্ট পরিবেশবিদ ও উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং সুপ্রিম কোর্টের মহামান্য বিচারপতি ফারাহ মাহবুব।
এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, কেন তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম সেখানে সমাপ্তি টানতে পারেনি? এর উত্তর লুকিয়ে আছে তৎকালীন স্বৈরাচারী এরশাদ আমলের বৈরী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের ভেতর। প্রখ্যাত আইনজ্ঞ অধ্যাপক আসিফ নজরুলের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শহীদ জিয়ার নির্মম হত্যাকাণ্ডের সাথে তৎকালীন রাষ্ট্রযন্ত্রের নীতিনির্ধারকদের একাংশের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এবং ফলশ্রুতিতে উদ্ভূত চরম ‘নিরাপত্তা ঝুঁকি’র কারণেই মূলত তাঁর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথাগত পড়াশোনা ব্যাহত হয়েছিল। ফলত, তাঁর শিক্ষাজীবন অসম্পূর্ণ থাকার পেছনে মেধার কোনো ঘাটতি ছিল না; বরং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্র ও জীবননাশের আশঙ্কাই ছিল প্রধান নিয়ামক।
তৃণমূল মনোদৃষ্টি ও জনস্বীকৃতির তত্ত্বায়নঃ
একজন সফল জননেতার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি থাকাটা যতটুকু না আবশ্যিক, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি জরুরি হচ্ছে জনমানুষের ভাষা, দুঃখ-কষ্ট এবং মনস্তত্ত্ব অনুধাবন করার তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক ক্ষমতা। তারেক রহমান দীর্ঘ সময় ধরে দেশের টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া চষে বেড়িয়ে সাধারণ মানুষের প্রান্তিক জীবনসংগ্রাম খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাঁর উদ্ভাবিত ‘তৃণমূল সম্মেলন’ কর্মসূচি বাংলাদেশের সমকালীন রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ও যুগান্তকারী সংযোজন। মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন লাভ করতে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সনদের প্রয়োজন হয় না; বরং প্রয়োজন হয় অদম্য সাহসিকতা, ত্যাগ এবং জনগণের প্রতি নিখাদ দায়বদ্ধতা। প্রতিপক্ষ যখন তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখন তারা মূলত গণমানুষের মনস্তত্ত্ব ও জননেতৃত্বের মূল দর্শন অনুধাবন করতেই ব্যর্থ হয়।
রাজনৈতিক বৈধতা ও উত্তরাধিকারের সার্থকতাঃ
জনাব তারেক রহমান কেবল জিয়া পরিবারের রক্তের উত্তরাধিকারী নন; বরং তিনি আজ স্বীয় যোগ্যতা, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং অপরিসীম ত্যাগের বিনিময়ে নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান এবং সর্বসাধারণের অকুণ্ঠ ভালোবাসা অর্জন করেছেন। প্রায় দুই দশক ধরে নির্বাসন, অপপ্রচার এবং রাষ্ট্রীয় জুলুম-নিপীড়ন সহ্য করেও তিনি যেভাবে দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা ও দলকে সুসংগঠিত রেখেছেন, তা তাঁর অসামান্য সাংগঠনিক প্রজ্ঞা ও নেতৃত্বের পরিপক্বতারই প্রমাণ বহন করে। তিনি এটি প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন যে, নেতৃত্বের প্রকৃত বৈধতা ও স্বীকৃতি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের চার দেয়ালের ভেতর থেকে আসে না; বরং তা অর্জিত হয় জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন ও ব্যালটের রায় থেকে।
অতএব, তারেক রহমানকে কোনো ক্ষুদ্র গণ্ডিতে বা প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ফ্রেমে আবদ্ধ করার অপচেষ্টা সম্পূর্ণ অমূলক ও অবান্তর। তিনি আজ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের এবং ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের সংগ্রামের এক প্রতীকী কণ্ঠস্বর ও বাতিঘর। ডিগ্রি বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির ক্ষুদ্র গণ্ডি অতিক্রম করে তিনি আজ এক ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ (Larger than life) তথা এক মহীরুহ চরিত্রে রূপান্তরিত হয়েছেন। বাংলাদেশের চলমান ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিগন্তে তাঁর এই অবস্থান কেবল বাস্তবসম্মত নয়, বরং সম্পূর্ণ যৌক্তিক ও অপরিহার্য। সমকালীন ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রনীতিতে তাঁর এই ক্যারিসমেটিক নেতৃত্বের সুদূরপ্রসারী প্রভাব বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে—তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া ও রাজনীতি বিশ্লেষক।
আজকালের কন্ঠ/আর বি
আপনার মতামত লিখুন :