
জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে জটিল ও গুরুতর সংকটগুলোর মধ্যে একটি। এটি প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে এবং মানবসভ্যতার মৌলিক চাহিদা যেমন খাদ্য, পানি এবং বাসস্থানের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশ, তার ভৌগোলিক অবস্থান ও অর্থনৈতিক কাঠামোর কারণে, এই সংকটের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। জার্মান ওয়াচের গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইন্ডেক্স (২০১০) অনুসারে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতির দিক থেকে বাংলাদেশ শীর্ষ দশটি দেশের মধ্যে প্রথম স্থানে রয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (IPCC) রিপোর্টে বলা হয়েছে, শিল্পবিপ্লবের পর থেকে জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার, বন উজাড় এবং মানবসৃষ্ট কার্যকলাপের ফলে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে বিশ্বের গড় তাপমাত্রা শিল্পপূর্ব সময়ের তুলনায় ১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ২১০০ সাল নাগাদ এটি ১.৮ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে। এই তাপমাত্রা বৃদ্ধি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় এবং তাপপ্রবাহের মতো চরম আবহাওয়ার ঘটনার তীব্রতা ও ফ্রিকোয়েন্সি বাড়িয়ে তুলছে।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) জানিয়েছে, ২০১৯ সালে বিশ্বব্যাপী ৩৪ কোটির বেশি মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল। জলবায়ু পরিবর্তন, সংঘাত এবং অতিমারির কারণে এই সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুসারে, ২৩০ কোটি মানুষ সুপেয় পানির সংকটে থাকা দেশগুলোতে বাস করছে। তীব্র খরা এবং তাপপ্রবাহ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করছে, যা বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ব্রাজিল ও কলোম্বিয়ায় কফি উৎপাদন যথাক্রমে আশঙ্কাজনক হারে এবং ২২ শতাংশ কমেছে, যা বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশের জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর শুধু ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নয়, এটি আমাদের বর্তমান বাস্তবতা। বাংলাদেশের মতো দেশগুলো এর প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যদিও এই সংকটের জন্য তারা সবচেয়ে কম দায়ী।”
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং নিম্নাঞ্চলীয় ভূমির কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখানে অত্যন্ত তীব্র। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধি দেশের কৃষি, জনস্বাস্থ্য এবং অর্থনীতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি এবং জনগণের জীবিকার প্রধান উৎস। তবে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই খাত মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
১৯৭৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বাংলাদেশে গড় তাপমাত্রা ১.২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ধান ও গমের মতো ফসলের ফলন হ্রাস করছে। খুলনা অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়ায় ধানের উৎপাদন ৮ শতাংশ এবং গমের উৎপাদন ৩২ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। বর্ষাকালে বৃষ্টিপাত ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও, এটি কেন্দ্রীভূত ও অনিয়মিত হয়ে উঠছে, ফলে বন্যা ও খরার ঝুঁকি বাড়ছে। প্রতি বছর ৩০ থেকে ৪০ লাখ হেক্টর জমি খরায় আক্রান্ত হচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ত জলের অনুপ্রবেশ বাড়ছে। খুলনা বিভাগের প্রায় ৪ লাখ হেক্টর জমি লবণাক্ততার শিকার, যা শস্যের নিবিড়তা ২০০ শতাংশ থেকে ১৩৩ শতাংশে নামিয়ে এনেছে।
সিডর, আইলা, আম্ফানের মতো ঘূর্ণিঝড় কৃষিজমি ও অবকাঠামো ধ্বংস করছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা ১০ শতাংশ বাড়তে পারে। খরা, বন্যা এবং লবণাক্ততা মাটির পুষ্টি উপাদান ও জৈব পদার্থ কমিয়ে ফলন হ্রাস করছে। কৃষি বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষকরা ফসল চাষের সময়সূচি নির্ধারণে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। ফসলের বৈচিত্র্য ও জলবায়ু-সহনশীল জাতের প্রচলন ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা কঠিন।”
জলবায়ু পরিবর্তন জনস্বাস্থ্যের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। তীব্র গরমে হিটস্ট্রোক ও ডিহাইড্রেশনের ঝুঁকি বাড়ছে। উষ্ণ তাপমাত্রা মশাবাহিত রোগ যেমন ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব বাড়িয়ে তুলছে। বন্যার কারণে পানিবাহিত রোগ যেমন কলেরা ও ডায়রিয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের (২০২০) তথ্য অনুসারে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের জিডিপি ২ শতাংশ কমতে পারে। কৃষি, মৎস্য এবং বস্ত্রশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বেকারত্ব ও দারিদ্র্য বাড়বে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে ১৭ শতাংশ ভূমি নিমজ্জিত হতে পারে, যা ২০ মিলিয়ন মানুষকে বাস্তুচ্যুত করতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার ও বিভিন্ন সংস্থা বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) খরা, লবণাক্ততা ও বন্যা-সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন করেছে, যেমন ব্রি ধান-৭১, ব্রি ধান-৭৮ এবং ব্রি ধান-৯৯। এই জাতগুলোর সম্প্রসারণ জরুরি। বৃষ্টির জল সংরক্ষণ, সোলার সেচ পাম্প এবং ভাসমান কৃষি পদ্ধতি প্রচলন করা হচ্ছে। সময়োপযোগী আবহাওয়ার পূর্বাভাস কৃষকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করছে। জৈব সার ও কম্পোস্ট সারের ব্যবহার বাড়িয়ে মাটির উর্বরতা বজায় রাখা হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ এবং ম্যানগ্রোভ রোপণের মতো উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।
মিথেন নিঃসরণ কমাতে বিকল্প ভেটিং ও ড্রেনিং (AWD) পদ্ধতি ধানচাষে ব্যবহৃত হচ্ছে। সোলার পাম্প ও নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। কৃষি বনায়ন ও ম্যানগ্রোভ রোপণ কার্বন শোষণে সহায়তা করছে। বিশ্লেষক ড. সেলিম মাহমুদ বলেন, “জলবায়ু-স্মার্ট কৃষি (CSA) পদ্ধতি বাংলাদেশের কৃষিকে টেকসই করতে পারে। তবে, এর জন্য আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা অপরিহার্য।”
খুলনা বিভাগ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততার কারণে ধানের উৎপাদন কমছে এবং অনেক জমি পতিত হয়ে যাচ্ছে। তবে, লবণাক্ততা-সহনশীল ফসল এবং সমন্বিত কৃষি পদ্ধতি কৃষকদের জন্য আশার আলো দেখাচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের কৃষি, জনস্বাস্থ্য এবং অর্থনীতির জন্য একটি অস্তিত্বের সংকট। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জলবায়ু-সহনশীল প্রযুক্তি, সঠিক নীতি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। সরকার, কৃষিবিজ্ঞানী এবং জনগণের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, এখনই সময় পদক্ষেপ নেওয়ার, নইলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়া কঠিন হবে।
আপনার মতামত লিখুন :