শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: প্রযুক্তিনির্ভর নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়ই হোক আগামীর প্রতিরোধ | Daily AjKaler Kontho

শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: প্রযুক্তিনির্ভর নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়ই হোক আগামীর প্রতিরোধ


আজকালের কন্ঠ ডেস্ক প্রকাশের সময় : মে ২২, ২০২৬, ১০:৫৬ পূর্বাহ্ন
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: প্রযুক্তিনির্ভর নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়ই হোক আগামীর প্রতিরোধ

​ঢাকার মিরপুরের পল্লবী এলাকায় ৭ বছর বয়সী নিষ্পাপ স্কুলছাত্রী রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নির্মম ও পাশবিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আমি গভীর শোক এবং তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছি। সভ্য পৃথিবীর বুকে কোনো শিশুর ওপর এমন আদিম ও বর্বর নির্যাতন কোনো অজুহাতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এই কলঙ্কজনক ও হৃদয়বিদারক ঘটনা আমাদের সামগ্রিক সামাজিক বিবেক এবং সামষ্টিক নৈতিকতাকে প্রচণ্ডভাবে বিদ্ধ করেছে।

​গত বৃহস্পতিবার (২১ মে ২০২৬) রাতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিহত রামিসার পল্লবীর ক্রন্দনরত বাসভবনে সশরীরে উপস্থিত হয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেন। সরকার প্রধানের এই তাৎক্ষণিক উপস্থিতি কেবল একটি শোকার্ত পরিবারের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ নয়, বরং এটি সুশাসনের একটি অনন্য মনস্তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টান্ত। জাতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে শোকাতুর পিতা-মাতা ও স্বজনদের গভীর সমবেদনা জানান এবং পরিবারের পুনর্বাসন ও রামিসার বড় বোনের শিক্ষার সম্পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেন। ভুক্তভোগী পরিবারের উদ্দেশ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দৃঢ় ভাষায় আশ্বস্ত করে বলেন, “ঠিক আছে। আপনাদের একটা ভালো পরিবেশে থাকার বিষয়টি আমি দেখব।” সংকটকালীন মুহূর্তে রাষ্ট্রপ্রধানের এমন প্রত্যক্ষ প্রতিশ্রুতি এবং ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়ানোর এই মানবিক ভঙ্গি রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকদের আস্থা পুনর্গঠনে একটি যুগান্তকারী তাত্ত্বিক নজির স্থাপন করে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও দ্রুততম সময়ে তদন্ত নিশ্চিত করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার যে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন, তা জননিরাপত্তা অক্ষুণ্ণ রাখার ক্ষেত্রে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।

​আজকের এই উত্তর-আধুনিক যুগেও আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সম্পূর্ণ নিরাপদ ও ভীতিহীন পৃথিবী গড়ে তুলতে পারিনি- এটি আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রকাঠামোর জন্য এক পরম গ্লানির বিষয়। এই জনপদে এখনো কিছু বিকৃত মানসিকতাসম্পন্ন হিংস্র হায়েনার অবাধ বিচরণ রয়েছে, যারা নিয়ত অবুঝ শিশুদের মৌলিক মানবাধিকার ও বেঁচে থাকার অধিকারকে ভূলুণ্ঠিত করছে। যে শিশু এখনো মৃত্যুর মর্মার্থও বোঝে না, তাকে এমন বীভৎসতার শিকার হতে দেখা সামাজিক অবক্ষয়ের এক চরম বহিঃপ্রকাশ। তবে এই গভীর অন্ধকারের মাঝেও আশার আলো দেখায় আমাদের সরকারপ্রধানের অনন্য রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা (Political Empathy)। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিষয়টির গুরুত্ব ও সামাজিক প্রভাব গভীরভাবে অনুধাবন করে স্বয়ং ভুক্তভোগী পরিবারের আঙিনায় গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, ক্ষমতার শীর্ষবিন্দু থেকে সাধারণ প্রান্তিক নাগরিকের দুঃখ-কর্দমাক্ত উঠোনে নেমে আসার এই মানবিক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাষ্ট্রকে আরও বেশি কল্যাণমুখী ও জনবান্ধব করে তোলে। এই অনন্য নেতৃত্বের দূরদর্শিতার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।

​এখন সময় এসেছে কেবল অপরাধ-পরবর্তী শাস্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে, অপরাধের মনস্তত্ত্ব ও সুযোগকে গোঁড়া থেকে উপড়ে ফেলার। অপরাধবিজ্ঞানের (Criminology) আধুনিক তত্ত্ব অনুযায়ী, অপরাধের সুযোগ হ্রাস করাই অপরাধ দমনের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। যেভাবে দেশের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও আধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরা ব্যবহারের ফলে চালকরা স্বয়ংক্রিয় মামলার ভয়ে আইন মানতে বাধ্য হচ্ছে, ঠিক একইভাবে নারী ও শিশু সুরক্ষায় আমাদের প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ও কৌশলগত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তিগত নজরদারি অপরাধীর মনে ‘ধরা পড়ার নিশ্চিত ভয়’ তৈরি করে, যা অপরাধ প্রতিরোধে সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক বাধা হিসেবে কাজ করে।

​অপরাধ দমনে এবং একটি নিরাপদ সমাজ বিনির্মাণে আমরা সরকারের কাছে নিম্নলিখিত প্রযুক্তিগত পদক্ষেপগুলোর দ্রুত ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবায়ন প্রত্যাশা করি:

​১. এআই-চালিত স্মার্ট নজরদারি (AI-driven Smart Surveillance):
প্রতিটি পাড়া-মহল্লা ও কৌশলগত পয়েন্টে ফেসিয়াল রিকগনিশন (Facial Recognition) সমৃদ্ধ এআই ক্যামেরা স্থাপন করা, যা কোনো চিহ্নিত অপরাধীর উপস্থিতি বা অস্বাভাবিক সন্দেহজনক আচরণ সনাক্ত করামাত্রই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিকটস্থ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সতর্কবার্তা (Alert) পাঠাবে।

​২. স্মার্ট ট্র্যাকিং ও কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ (Smart Tracking & Central Database):
দেশের তালিকাভুক্ত যৌন অপরাধীদের একটি সমন্বিত কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডেটাবেজ প্রস্তুত করে আধুনিক জিও-ফেন্সিং (Geo-fencing) প্রযুক্তির মাধ্যমে তাদের গতিবিধি সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা।

​৩. জরুরি রেসপন্স অ্যাপ (Emergency Response Application):
নারী ও শিশুদের সুরক্ষায় একটি রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুমোদিত শক্তিশালী এবং ‘ওয়ান-ট্যাপ’ ইমার্জেন্সি মোবাইল অ্যাপ বাধ্যতামূলক করা। বিপদের মুহূর্তে মাত্র একটি ক্লিকেই যেন আক্রান্ত ব্যক্তির লাইভ লোকেশন, অডিও এবং ভিডিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিকটস্থ পুলিশ কন্ট্রোল রুম এবং অভিভাবকের কাছে পৌঁছাতে পারে।

​৪. স্মার্ট স্ট্রিট লাইটিং ও প্যানিক বাটন (Smart Street Lighting & Panic Buttons):
নগরের তুলনামূলক নির্জন বা অন্ধকার গলিগুলোতে আলো-সংবেদনশীল স্মার্ট লাইটিং এবং রাস্তায় নির্দিষ্ট দূরত্ব পর পর দৃশ্যমান ‘প্যানিক বাটন’ স্থাপন করা, যেন সংকটে পড়া যেকোনো নাগরিক তাৎক্ষণিকভাবে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হতে পারেন।

​দেশে বিশেষ করে বড় বড় শহর গুলোতে সনাতন পদ্ধতিতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির এই দ্বান্দ্বিক সমন্বয়ে এমন একটি নিশ্ছিদ্র সামাজিক নিরাপত্তা বলয় (Social Safety Net) গড়ে তোলা হোক, যেন কোনো অপরাধী অপরাধ করার চক্রান্ত করার আগেই রাষ্ট্রীয় নজরদারির অমোঘ ভয়ে থমকে যেতে বাধ্য হয়। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন একটি নিরাপদ, মানবিক ও হায়েনামুক্ত বাংলাদেশে শান্তিতে বেড়ে উঠিতে পারে- মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুদক্ষ নেতৃত্বে এটাই হোক আমাদের যৌথ সামাজিক অঙ্গীকার।​-প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, অপরাধবিজ্ঞানী এবং উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, মোগাদিসু, সোমালিয়া।